(বাঁ দিকে) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জ্ঞানেশ কুমার (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
প্রথম পর্বে তালিকায় ছিল শুধুই বিহার। সে রাজ্যে এসআইআর হওয়ার পরে ভোট হয়ে নতুন সরকার গঠন হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে দেশের ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকা ‘সাফাই’ করতে এই প্রক্রিয়া চালাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। বাকি ১১টি রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া আপাত ভাবে ‘মসৃণ’ হলেও যত জটিলতা এবং বিতর্ক পশ্চিমবঙ্গেই। আতঙ্কে আত্মঘাতী হওয়ার অভিযোগ, প্রশাসনিক টানাপড়েন থেকে রাজনৈতিক আকচাআকচি লাগাতার চলছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে। কেন পশ্চিমবঙ্গেই এত জটিলতা, বিড়ম্বনা, বিতর্ক এবং আকচাআকচি?
ভোট প্রক্রিয়ায় যুক্ত রাজনৈতিক দল থেকে সরকারি আধিকারিক, বিভিন্ন মহল থেকে পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়ে নানা কারণের কথা বলা হচ্ছে।
ভোটার তালিকায় গলদ এবং পরিপার্শ্ব
এসআইআরের প্রথম দফায় পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৫৮ লক্ষের নাম বাদ পড়েছে। যার বৃহদংশ মৃত। স্থানান্তরিত এবং একাধিক কেন্দ্রে নথিভুক্ত থাকার কারণেও অনেক নাম বাদ পড়েছে। সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, এই ধরনের ‘ভূতের বাসা’ কোনও রাজ্যের ভোটার তালিকায় নেই। অনেকের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় এ হেন বেনোজল অনেক বছর ধরেই রয়ে গিয়েছিল। সেই জল ছেঁচে রাজনৈতিক সুবিধা ঘরে তোলা হত। সীমান্তবর্তী রাজ্য হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশের অভিযোগও বিস্তর। যদিও সে বিষয়ে ‘প্রামাণ্য’ কোনও নথি বা তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগ তোলা এবং তা খণ্ডানোর নেপথ্যে যে রাজনীতি রয়েছে, তা স্পষ্ট। ফলে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় বিসমিল্লায় গলদ হয়ে রয়েছে। তাকে ঘিরে যে রাজনীতি, এ রাজ্যের এসআইআর প্রক্রিয়ায় জটিলতা তার অন্যতম কারণ।
সর্বাধিক তথ্যগত অসঙ্গতি
তথ্যগত অসঙ্গতির (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) জন্য পশ্চিমবঙ্গে ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ১১টি রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে কোথাও এই পরিমাণ তথ্যগত অসঙ্গতি দেখা যায়নি। নাম-পদবির যে ধরনের ত্রুটির জন্য এমন অসঙ্গতির আওতায় বহু মানুষকে এই রাজ্যে ফেলা হয়েছে, তা-ও অন্য রাজ্যে হয়নি। ধরা যাক বাবার নামের পদবি ‘মুখোপাধ্যায়’ এবং সন্তানের পদবি ‘মুখার্জি’, তাঁদেরও অসঙ্গতির তালিকায় ফেলা হয়েছে। ডাকা হয়েছে শুনানিতে। অভিযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কেও ‘চিহ্নিত’ করা হয়েছে। যা জটিলতা এবং রাজনৈতিক সংঘাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
কমিশন-রাজ্য সংঘাত
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ সরকার গোড়া থেকে যে ভাবে সংঘাত জারি শুরু করেছে, তা-ও অন্যত্র দেখা যায়নি। যাকে কমিশন বারংবার ‘বাধা’ হিসাবে দেখাতে চেয়েছে। আর রাজ্য সরকার তথা শাসক তৃণমূল দেখাতে চেয়েছে ‘হাতেনাতে ধরা’ হিসাবে। সেই সংঘাতের রেশ ধরেই এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে আদালতে সওয়াল করতে সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির এজলাস পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যে রাজ্যগুলিতে দ্বিতীয় দফায় এসএফআইআর হচ্ছে, তার মধ্যে কেরল (নতুন নাম ‘কেরলম’), তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যও রয়েছে। যেগুলি অ-বিজেপি দল শাসিত। সেখানেও এই ধরনের সংঘাত প্রত্যক্ষ করা যায়নি যা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে।
কম সময়ে বেশি কাজ
কম সময়ের মধ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ‘জটিলতা’ বাড়তে থাকায় সে প্রশ্ন নতুন করে উঠছে। তবে এ-ও প্রণিধানযোগ্য যে, অন্য রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেও এসআইআর প্রক্রিয়া এই সময়ের মধ্যেই শেষ হয়েছে। তা হলে পশ্চিমবঙ্গে এত জটিলতার কারণ কী? এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে যে ধরনের বাস্তবতা রয়েছে, তা অন্য রাজ্য নেই। এখানকার জনবিন্যাস, ভৌগোলিক তারতম্যও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে এত অল্প সময়ে এসআইআর ‘বাস্তবসম্মত’ নয়।
কর্মীসঙ্কট বনাম মাইক্রো অবজ়ার্ভার
এসআইআর প্রক্রিয়া যখন মাঝামাঝি পর্যায়ে, সেই পর্বেই নির্বাচন কমিশনের অভিযোগ ছিল যে, রাজ্য সরকার পর্যাপ্ত পরিমাণ কর্মী না-দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তার পরে কমিশন মাইক্রো অবজ়ার্ভার নিয়োগ করে। ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদে অস্থায়ী কর্মী দিতে চেয়েছিল রাজ্য। কিন্তু কমিশন তাতে আপত্তি জানায়। কমিশনের যুক্তি ছিল, অস্থায়ী কর্মীদের ক্ষেত্রে পদক্ষেপ করা যাবে না। ফলে তাঁদের দায়বদ্ধতাও থাকবে না। রাজ্যের বক্তব্য ছিল, ডাটা এন্ট্রির কাজে অত স্থায়ী কর্মী দিলে সরকারের কাজ লাটে উঠবে! আবার এ-ও ঠিক যে, মাইক্রো অবজ়ার্ভার অন্য কোনও রাজ্যে দেখা যায়নি। তা নিয়ে ময়দানে নামে সরকার এবং শাসকদল। শেষ পর্যন্ত মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের ক্ষমতা খর্ব করে সুপ্রিম কোর্ট। ফলে এ ক্ষেত্রেও সংঘাত জারি থেকেছে।
কী বলছেন নেতারা
সুপ্রিম কোর্টে তৃণমূল এবং রাজ্য সরকারের হয়ে সওয়াল করা আইনজীবী তথা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘অন্য কোনও রাজ্যে কমিশন এই ধরনের প্রতিহিংসামূলক মনোভাব নিয়ে এসআইআর করেনি। কোনও রাজ্যে মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের ময়দানে নামানো হয়নি। নথিগ্রহণের ক্ষেত্রে খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত করেনি। নথি আপলোডের ক্ষেত্রেও নিত্যনতুন বাহানা দেখায়নি কোথাও। কোনও রাজ্যে বৈধ নাগরিকদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে দেখা হয়নি। এই সবই হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। কারণ, এই রাজ্যকে কমিশন টার্গেট করেছে। তাই এই সংঘাত।’’ ব্যারাকপুরের তৃণমূল সাংসদ পার্থ ভৌমিকের যুক্তি ভিন্ন। তাঁর কথায়, ‘‘অন্য রাজ্যে বিরোধীরা সাংগঠনিক ভাবে এই কারসাজি ধরতে পারেনি। যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। তাই কমিশনের এত ক্রোধ রাজ্যের উপর। পশ্চিমবঙ্গে কমিশন একচেটিয়া ভাবে নিজেদের মতো সব করতে পারেনি। সে কারণেই মনে হচ্ছে এখানে এত জটিলতা।’’
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য প্রত্যাশিত ভাবেই রাজ্য সরকার তথা তৃণমূলকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘বাকি যে ১১টি রাজ্যে এসআইআর হচ্ছে, যার মধ্যে ১০টিতে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে, সেখানে কোথাও বিডিও অফিসে আগুন, জাতীয় সড়ক অবরোধ, বিএলএ-দের হুমকি, বিএলও-দের দিয়ে ভুয়ো নথি আপলোডের অভিযোগ নেই। সব আছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেই। এটা পশ্চিমবঙ্গবাসীর লজ্জা যে, সুপ্রিম কোর্টকে বলতে হচ্ছে, বিচারব্যবস্থার আধিকারিকেরা এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।’’
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘‘কমিশন বিজেপির মনোভাব নিয়ে চলছে। আর তৃণমূল সরকারকে ময়দানে নামিয়ে সঙ্গত করেছে। বিচারব্যবস্থাকে যে ভাবে প্রশাসনের উপর বসিয়ে দেওয়া হল, তা সংবিধানের জন্য বিপজ্জনক। এবং এই পথ প্রশস্ত করল বিজেপি-তৃণমূল দু’দল মিলেই।’’