—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
দেশে এলপিজি জ্বালানি সঙ্কটের আবহে কেরোসিন, কয়লা, বায়োমাসের মতো ‘বিকল্প’ জ্বালানি সরবরাহের কথা জানিয়েছেনকেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরী। এ-ও জানিয়েছেন যে এই সঙ্কটকালে এই ধরনের বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার যাতে না-আটকানো হয়, বিভিন্ন রাজ্যের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্র। মন্ত্রীর এই বক্তব্য ঘিরেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। পরিবেশবিজ্ঞানী ও পরিবেশকর্মীদের অনেকেই বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার বদলে দূষিত জ্বালানি ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। এই ধরনের জ্বালানি ব্যবহারের কুপ্রভাব পড়বে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উপরে।
প্রসঙ্গত, এ দেশের বড় শহরগুলিতে বায়ুদূষণ বড় সমস্যা। দিল্লির পরিস্থিতি তো রীতিমতো নাগালের বাইরে চলে যায়। বর্ষা বিদায়ের পর থেকে পুরোদমে বৃষ্টি শুরুর আগে কলকাতার পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক থাকে না। এই পরিস্থিতিতে পথেঘাটে ছোট হোটেল, রেস্তোরাঁ অথবা তুলনামূলক কম আয়ের গৃহস্থ বাড়িতে ঘুঁটে, কয়লা, কেরোসিনের জ্বালানি ব্যবহার হলে তার ধোঁয়া থেকে দূষণ বাড়বে এবং তার প্রভাব পড়বে জনস্বাস্থ্যে। এমনিতেই খাস কলকাতা শহরের পথেঘাটের বহু দোকানে এখনও কয়লার উনুনে রান্না হয়। সেই ধোঁয়ায় পথচলতি মানুষও কম নাকাল হন না।
পরিবেশবিজ্ঞানী স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘কয়লা, বায়োমাস, কেরোসিন কখনই আদর্শ বিকল্প জ্বালানি হতে পারে না। এই ধরনের পরামর্শ আসলে পরিকল্পনাহীনতার প্রমাণ। এলপিজি সঙ্কট হলে বিকল্প কী হতে পারে, তা ভাবা উচিত। দূষিত জ্বালানি ব্যবহার করলে তার প্রভাব পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে পড়বে।’’ তাঁর বক্তব্য, ‘‘এমনিতেই বহু কষ্টে মানুষকে কয়লা, কেরোসিন থেকে এলপিজি ব্যবহারে অভ্যস্ত করা হয়েছিল। এ বার পুরনো অভ্যাস ফিরলে তা ফের বদলানো যাবে তো?’’
যদিও কেন্দ্রীয় সরকারি সূত্রের বক্তব্য, কয়লা, কেরোসিন, বায়োমাসের মতো জ্বালানিকে কখনই এলপিজির স্থায়ী বিকল্প হিসেবে প্রচার করা হয়নি। কিন্তু বর্তমানে যে পরিস্থিতি চলছে তাতে সাময়িক এবং আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবেই ‘বিকল্প’ জ্বালানির কথা বলা হয়েছে। এই ধরনের জ্বালানিতে আপাতত এক মাসের ছাড়ের কথা বলা হয়েছে। ওই সূত্রের বক্তব্য, ‘‘সাময়িক ভাবে দূষণ হয় তো বাড়বে। কিন্তু সঙ্কটকালে এটুকু ছাড় না-দিলে সমাজে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন ছোট দোকান, রেস্তোরাঁর মালিকেরা।’’
এ বিষয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানের শিক্ষক পুনর্বসু চৌধুরী বলছেন, ‘‘হতে পারে এটা সাময়িক বন্দোবস্ত। কিন্তু এলপিজি সরবরাহ যদি দ্রুত স্বাভাবিক না-হয় তা হলে ক্ষতি বাড়বে!’’ তাঁর মতে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে কয়লা বা বায়োমাসের মতো জ্বালানিতে ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘‘ফুয়েল এফিসিয়েন্ট’ চুল্লি ব্যবহার নিয়ে সচেতন করতে হবে। এই ধরনের চুল্লিতে একটি ফ্যান থাকে, যা হাওয়া দিয়ে অক্সিজেনের জোগান বাড়ায় এবং তার ফলে কয়লা, বায়োমাস জ্বালানি পুরোদমে পোড়ে। তার ফলে ধোঁয়ায় কার্বন মনোক্সাইড তুলনায় কম উৎপন্ন হয়। এই ব্যবস্থা দূষণ কমাতে সাহায্য করে। সুন্দরবন-সহ কিছু জায়গায় খাপছাড়া ভাবে এই ধরনের চুল্লি দেওয়া হলেও এ নিয়ে সরকারি স্তরে সার্বিকসচেতনতা দরকার।