বুধবার পুরুলিয়ায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
পুরুলিয়ায় তৃণমূলের খারাপ ফলের জন্য স্থানীয় কয়েক জন নেতাকে দায়ী করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দ্রুত সেই ‘ভুল’ শুধরে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিলেন। তবে বুধবার পুরুলিয়ার কাশীপুর থেকে তৃণমূলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতার আবেদন একটাই— ওই নেতাদের কারণে যেন তৃণমূল থেকে মুখ না-ফিরিয়ে নেন মানুষ। প্রয়োজনে তিনি আগামী এক মাসের মধ্যে আবার পুরুলিয়া যাবেন।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পুরুলিয়ার ৯টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৬টিতেই পরাজিত হয় তৃণমূল। গত লোকসভা নির্বাচনেও পুরুলিয়া কেন্দ্রে জয়ী হয় বিজেপি। লোকসভা নির্বাচনে বিধানসভাভিত্তিক ফলাফলে নজর রাখলে দেখা যায়, চারটি বিধানসভাতেই এগিয়ে ছিল তৃণমূল। ২০১৪ সালে পুরুলিয়া লোকসভা আসনে তৃণমূল শেষ বার জয় পেয়েছিল। সাংসদ হয়েছিলেন বিরবাহা বাস্কে। তার পর লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনে পুরুলিয়া জেলায় ক্রমাগত খারাপ ফল হয়েছে রাজ্যের শাসকদলের। এই আবহে আগামী বিধানসভা ভোটে পুরুলিয়ার ন’টি আসনের ন’টিতেই পাখির চোখ করেছেন মমতা-অভিষেক।
কাশীপুর বিধানসভার লধুড়কার মাঠে ‘রণসংকল্প সভা’ থেকে অভিষেক সেটাই বলেছেন। তিনি জানান, এ বার পুরুলিয়া থেকে সমস্ত আসন তৃণমূলকে পেতে হবে। তা হলেই গোটা রাজ্যে বিজেপি পঞ্চাশের বেশি আসন পাবে না। এই প্রেক্ষিতেই অভিষেকের মুখে শোনা যায় তাঁর দলেরই স্থানীয় নেতাদের একাংশের ‘অযোগ্যতার’ কথা। তিনি সমগ্র পুরুলিয়াবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘‘তৃণমূলের কোনও পদাধিকারী খারাপ আচরণ করলে একডাকে অভিষেককে জানাবেন (ফোন করে)। কিন্তু তাঁদের জন্য তৃণমূল থেকে মুখ ফেরাবেন না— এটা আমার অনুরোধ। আগামী বিধানসভা ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত শক্ত করুন।’’
অভিষেক ঠিক কোন নেতাদের নিয়ে এই পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করেছেন, সেটা পরিষ্কার করেননি। তাঁর এই মন্তব্যের পর্যালোচনা করতে গিয়ে জেলা তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশ জানিয়েছেন, মূলত পঞ্চায়েত এবং পঞ্চায়েত সমিতি স্তরের নেতাদের একাংশকে নিশানা করেছেন তাঁদের ‘যুবরাজ।’ নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের এক নেতার কথায়, ‘‘২০১৮ সালে পঞ্চায়েত ভোটের সময় থেকেই পুরুলিয়ার সংগঠন আলগা হচ্ছিল। তার ফল পোয়াতে হচ্ছে ২০১৯-এর লোকসভা ভোট থেকে।’’ ওই নেতা আরও জানান, স্থানীয় নেতৃত্বের একাংশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছিল। এমনকি, রেশন নিয়েও প্রচুর অভিযোগ ছিল স্থানীয়দের মধ্যে। অবশ্য ওই নেতা আত্মবিশ্বাসী যে, আগামী নির্বাচনে তাঁর দল ভাল ফল করবে। কারণ, ‘রোগ’ ধরে ফেলেছেন অভিষেক তথা শীর্ষ নেতৃত্ব। খোলা মাঠে সেটাই জানান দিয়ে গেলেন নেতা।
বুধবার অভিষেক ভোটের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘‘২০১৯ সালে (লোকসভা ভোটে) বিজেপি প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হয়েছেন। ২০২১ সালে জয়পুরে আমাদের প্রার্থীপদ বাতিল ঘোষণা করা হল। বাকি আটটির মধ্যে বাঘমুন্ডি, বান্দোয়ান আর মানবাজার ছাড়া পাঁচটি বিধানসভায় তৃণমূল পরাজিত হয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে অল্প ব্যবধানে আমরা বাঘমুন্ডিতে প্রত্যাশাজনক করতে পারিনি। পুরুলিয়া শহরে কিছুটা পিছিয়ে থাকায় আবার বিজেপি প্রার্থী জিতেছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোট শতাংশে ন’টির মধ্যে ছ’টিতে তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে।’’ তা-ই অভিষেক প্রত্যয়ী যে, এ বার পুরুলিয়া ‘সবুজময়’ হওয়া খালি সময়ের অপেক্ষা।
পুরুলিয়ার মানুষের দাবিদাওয়া মেটানোর দায় তিনি নিজের কাঁধে নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন অভিষেক। তাঁর কথায়, ‘‘আমি জানি এখানে অনেক ব্লকে অনেক দাবি রয়েছে। আইটিআই, পলিটেকনিক কলেজের দাবি রয়েছে। কোল্ড স্টোরেজের দাবি রয়েছে। আমার কাছে সমস্ত তথ্য আছে। আপনাদের যে যে দাবি রয়েছে তা পূরণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে যাচ্ছি। সকলকে কথা দিচ্ছি, উন্নয়নের মাধ্যমে আপনাদের ভালবাসার ঋণ মেটাব।’’ পুরুলিয়ায় ট্রেন পরিষেবা নিয়ে দীর্ঘ ক্ষোভের কথাও উঠে এসেছে তৃণমূল নেতার ভাষণে। তিনি জানিয়েছেন, ভোটের ফলাফল ঘোষণার তিন মাসের মধ্যে রেল মন্ত্রকে যাবে তৃণমূলের প্রতিনিধিদল। সমস্যা সমাধান করে ছাড়বেনই।