Gautam Deb on TMC

ইতিহাস দেখাচ্ছেন গৌতম,আগামীর পথ খুঁজছেন মানস

রাজ্যে ২০১১ সালে পরিবর্তনের ভোটের সময়েই তৎকালীন তৃণমূলের বিরুদ্ধে কুপন কেলেঙ্কারি-সহ দুর্নীতির নানা অভিযোগে সরব ছিলেন সিপিএম নেতা গৌতম।

সন্দীপন চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ ০৯:১৪
গৌতম দেব।

গৌতম দেব। ফাইল চিত্র।

তৃণমূল কংগ্রেসের ভরা বাজারে তিনি বলেছিলেন, দলটা উল্কার মতো এসেছে। উল্কার বেগেই হারিয়ে যাবে! ইতিহাসে একটা হাইফেন চিহ্নের মতো রয়ে যাবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! রাজ্যে এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর এক মাসের মধ্যে মমতার দল যখন সত্যিই ছিন্নভিন্ন, সেই সময়ে মুখ খুললেন সেই গৌতম দেব। পরামর্শ দিলেন বিজেপির বিরুদ্ধে মাটি কামড়ে বামপন্থীদের লড়াই চালানোর।

রাজ্যে ২০১১ সালে পরিবর্তনের ভোটের সময়েই তৎকালীন তৃণমূলের বিরুদ্ধে কুপন কেলেঙ্কারি-সহ দুর্নীতির নানা অভিযোগে সরব ছিলেন সিপিএম নেতা গৌতম। বামফ্রন্ট সরকার চলে যাওয়ার এক বছরের মধ্যে প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতমকে দলের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিল সিপিএম। সেই সময়ে গৌতমই প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘লিপ্‌স অ্যান্ড বাউন্ড্‌ন্স’ সংস্থার কথা, যাদের ‘ভুঁইফোঁড়’ আখ্যা দিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী পরিবর্তনের পরে দলে বিপুল ভাঙনের মুখে পড়েছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা, দুর্নীতি-সহ নানা অভিযোগে বিদ্ধ অভিষেক। সিআইডি যখন বিধায়কদের সই জালিয়াতির মামলায় রবিবার ফের ভবানী ভবনে অভিষেককে জেরা করছে, সেই সময়েই সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রাক্তন সদস্য গৌতম বলছেন, ‘‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলের এই পরিণতিই হওয়ার কথা। নীতি-আদর্শের রাজনীতি ছিল না, অন্ধ সিপিএম-বিরোধিতাকে পুঁজি করে তৃণমূলের পথ চলা শুরু হয়েছিল। আর তৃণমূল নেত্রী প্রত্যেককে অবিশ্বাস করতেন! সিঙ্গুর নিয়ে বুদ্ধদা’র (প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য) সঙ্গে আলোচনা বা সরকারি কোনও প্রয়োজনে ফোন করলে প্রথমেই প্রশ্ন করতেন, নম্বর কে দিল? তিন বার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মমতা, ইতিহাসে থাকবে। কিন্তু এই রকম একটা গোষ্ঠীর যা পরিণতি হওয়ার কথা, তা-ই হয়েছে!’’

তৃণমূল সরকারে আসার পরে আবাসন কেলেঙ্কারির ফাইল খোলার কথা বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতমকে সিআইডি জিজ্ঞাসাবাদের দিন তাঁকে নিয়ে মিছিল করে গিয়ে ভবানী ভবন ঘিরে বসেছিলেন সিপিএমের নেতা-কর্মীরা। অভিষেকের জেরার সময়ের ছবির সঙ্গে সে দিনের তুলনা টানছেন অনেকেই। আর গৌতমের কথায়, ‘‘আমাদেরটা দল। প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করতে জানে। এ বারও মমতাকে অনেক মানুষ ভোট দিয়েছেন। কিন্তু বিরোধী রাজনীতি করবেন কী, উনি তো নিজের দল কী ভাবে বাঁচাবেন ভাবছেন! আগে উনি যা খুশি করেছেন, এখন বিজেপি খেলছে ওঁর দলটা নিয়ে!’’

বেশি উড়লে যে দ্রুত পতন হবে, রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারকেও সে আপ্তবাক্য মনে করিয়ে দিতে চাইছেন ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা গৌতম। তাঁর বক্তব্য, ‘‘বিজেপি সরকার সবে এসেছে। এসেই বুলডোজ়ার নিয়ে নেমে পড়েছে, আরও নানা কিছু করছে। এখনও কিছু বলার সময় আসেনি। তবে বাড়াবাড়ি করলে তার ফল মানুষই বুঝিয়ে দেবেন। বামপন্থীদের এখন মাটি কামড়ে লড়াই চালাতে হবে, আরও বেশি মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। আগামী পঞ্চায়েত ভোটে লড়াইয়ের জন্য তৈরি হতে হবে।’’ নতুন মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে বাম আমলের প্রাক্তন মন্ত্রীর মন্তব্য, ‘‘শুভেন্দু অধিকারী কংগ্রেস রাজনীতি থেকে উঠে এসে অনেক দূর এসেছেন। উনি সব রকম চেষ্টা করবেন। তবে আরএসএস-পরিচালিত রাজনীতিতে কখন কী হবে, দেখতে হবে। আর এই আরএসএস-বিজেপির দক্ষিণপন্থী রাজনীতির মোকাবিলায় রুখে দাঁড়াব আমরা বামপন্থীরাই।’’

পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ে বসে তৃণমূলে মোহভঙ্গের কথা বলছেন সদ্যপ্রাক্তন মন্ত্রী ও আর এক বর্ষীয়ান রাজনীতিক মানস ভুঁইয়াও। তৃণমূলের সদস্যপদ ছেড়ে দেওয়ার পরে করণীয় নিয়ে ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে কথা বলছেন। মানসের কথায়, ‘‘এত বছরের রাজনীতি ও সামাজিক জীবনের পরে চুপ করে তো বসে থাকা যায় না। যাঁরা সঙ্গে আছেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করছি।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘তৃণমূলে থেকে শুধু কেন্দ্রের সঙ্গে ঝগড়া আর চিৎকার করে গেলাম! সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কথা ভাবলামই না। রাজ্যের স্বার্থে কেন্দ্রের সঙ্গে কোনও আলেচনার সুযোগ ছিল না, এখানে মন্ত্রী বা আমলারাও মতামত দিতে ভয় পেতেন। এগুলো ভাবতে হচ্ছেই।’’ কিন্তু এখন কেন? নিজেই প্রশ্ন তুলে মানসের জবাব, ‘‘পদত্যাগ করে এগুলো বলছি, কারণ আগে বলার কোনও সুযোগ ছিল না!’’

আরও পড়ুন