Mamata Banerjee

‘কোনও প্রোটোকল ভাঙা হয়নি’! রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদীকে অসম্মানের অভিযোগ নিয়ে অবস্থান জানিয়ে ব্যাখ্যাও দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা

রাষ্ট্রপতির উত্তরবঙ্গ সফর এবং তাঁর মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। রাষ্ট্রপতিকে ‘অসম্মান’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদীও। এ বার সেই অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যাখ্যা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ ২২:৫৩
(বাঁ দিকে) রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।

রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সফরে কোনও প্রোটোকলই ভাঙেনি জেলা প্রশাসন। অভিযোগ উড়িয়ে এমনটাই জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে তিনি এ-ও বুঝিয়ে দেন, রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত বা বিদায় জানাতে কারা উপস্থিত থাকবেন, তা দু’পক্ষের আলোচনার মাধ্যমেই স্থির হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সচিবালয় এবং নবান্নের মধ্যে নথি চালাচালির তথ্যও প্রকাশ্যে এনেছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী এ-ও জানান, রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে অনুমোদিত ‘লাইনআপ’ অনুযায়ীই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁকে স্বাগত এবং বিদায় জানানোর সময়ে উপস্থিত ছিলেন। ওই ‘লাইনআপ’-এ মুখ্যমন্ত্রীর নাম ছিল না।

Advertisement

রাষ্ট্রপতির উত্তরবঙ্গ সফর এবং তাঁর মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। রাষ্ট্রপতিকে ‘অসম্মান’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও। এই অভিযোগের বিরুদ্ধে এ বার ব্যাখ্যা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। রাষ্ট্রপতির এই সফর সংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সচিবালয় এবং নবান্নের মধ্যে কিছু নথি চালাচালিও প্রকাশ্যে এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই নথি দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাষ্ট্রপতির এই সফরে তাঁকে স্বাগত বা বিদায় জানানোর জন্য তাঁর থাকার কথা ছিল না। প্রশাসনের তরফে শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব, দার্জিলিঙের জেলাশাসক মণীশ মিশ্র এবং শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার সি সুধাকরের থাকার কথা ছিল। বিমানবন্দরে তাঁরা রাষ্ট্রপতিকে স্বাগতও জানান।

মুখ্যমন্ত্রী এ-ও জানান, শনিবারের অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছিল একটি বেসরকারি সংস্থা। আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কাউন্সিল নামে এক সংগঠন শিলিগুড়িতে নবম আন্তর্জাতিক আদিবাসী সাঁওতাল সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। সেখানে তারা রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানায়। সমাজমাধ্যমে মমতা এ-ও জানান, আয়োজকদের তরফে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের তরফে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে লিখিত ভাবে জানানো হয়েছিল। ফোন করেও এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়।

মমতা আরও লেখেন, গত ৫ মার্চ (বৃহস্পতিবার) রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের প্রতিনিধিদল এলাকা পরিদর্শন করে। তখনও ব্যবস্থাপনার অভাব সম্পর্ক জানানো হয়েছিল। তার পরেও নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়। মুখ্যমন্ত্রী জানান, জেলা প্রশাসনের তরফে কোনও প্রোটোকল ভাঙা হয়নি। রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে এবং বিদায় জানানোর সময়ে কারা থাকবেন, তা আগে থেকেই স্থির হয়ে ছিল এবং রাষ্ট্রপতির সচিবালয় থেকেই তাতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সেই তালিকায় কোথাওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নাম ছিল না।

ওয়াকিবহাল প্রশাসনিক আধিকারিকদের মতে, রাষ্ট্রপতি কলকাতায় এলে প্রোটোকল অনুয়ায়ী রাজ্যপালের তাঁকে স্বাগত জানাতে যাওয়াটাই দস্তুর। মুখ্যমন্ত্রী অথবা মন্ত্রিসভার কোনও সিনিয়র সদস্যেরও যাওয়াই রেওয়াজ। রাষ্ট্রপতি কোনও মফস্‌সল শহরে এলেও রাজ্যপালের তাঁকে স্বাগত জানাতে যাওয়াই প্রচলিত রীতি। সঙ্গে কোনও মন্ত্রীও থাকতে পারেন। এ ক্ষেত্রে শিলিগুড়ির মেয়রকে পাঠানো হয়েছিল। পদমর্যাদায় তিনি মন্ত্রীর সমতুল বলে মনে করা হয়। তবে এই প্রোটোকল কোনও বিধি নয়। এটি একটি রেওয়াজ। মুখ্যমন্ত্রীর সমাজমাধ্যম পোস্টেও আভাস রয়েছে যে, কারা রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে বা বিদায় জানাতে যাবেন, তা পরস্পরের অনুমোদন সাপেক্ষেই ঠিক হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে মন্ত্রিসভার কেউ উপস্থিত নেই, এমন ঘটনা সাম্প্রতিক অতীতে ঘটেছে, এমনটা মনে করতে পারছেন‌‌ না অনেকেই।

রাষ্ট্রপতি মুর্মু এমন এক দিনে পশ্চিমবঙ্গ সফরে আসেন, যখন মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় সরকার, বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে ধর্মতলায় ধর্না কর্মসূচিতে বসেছেন। আবার রাজ্যপাল পদেও সদ্য পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারের ব্যাখ্যা, রাষ্ট্রপতি সফরের জন্য যেমন প্রোটোকল রয়েছে, তা মানা হয়েছে। তবে প্রশাসনিক আধিকারিকদের একাংশের মতে, শনিবার রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানানোর সময়ে এক জন মন্ত্রী থাকলে এই সমস্যা তৈরি হত না। মন্ত্রী না থাকাতেই এই জলঘোলা হচ্ছে।

গোটা বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে নতুন সংঘাত শুরু করে গিয়েছে তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে। সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং। রাষ্ট্রপতির অপমান করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মোদী। প্রথমে ইংরেজিতে, তার পরে বাংলায় এবং পরে অলচিকি লিপিতেও এই ঘটনার নিন্দা জানান তিনি। বস্তুত, রাষ্ট্রপতি মুর্মু সাঁওতাল সমাজের প্রতিনিধি। সে ক্ষেত্রে অলচিকি লিপিতে পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রীর এই ‘নিন্দাবার্তা’ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, রাষ্ট্রপতি মুর্মুকে ঘিরে এই বিষয়টিকে সার্বিক ভাবে সাঁওতাল সমাজের অবমাননা বলে দেখাতে চাইছে বিজেপি শিবির। তিন ভাষাতেই একই পোস্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তার মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ একটি বাক্য হল, “জনজাতি সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা রাষ্ট্রপতি যে যন্ত্রণা এবং উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেছেন, তা ভারতবাসীর মনকে কাঁদিয়ে তুলেছে।”

বিতর্কের সূত্রপাত রাষ্ট্রপতি মুর্মুর এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। শিলিগুড়িতে আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কনফারেন্সে যোগ দিতে এসেছিলেন তিনি। সেখানে ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রকাশ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘আমিও বাংলার মেয়ে। আমাকে বাংলায় আসতেই দেওয়া হয় না। মমতাদি আমার ছোট বোন। জানি না, আমার উপর কী রাগ। যাই হোক… কোনও অভিযোগ নেই। কোনও ক্ষোভ নেই। উনি ভাল থাকুন, আপনারাও ভাল থাকুন।”

রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্যের পরে ধর্মতলার ধর্নাম়ঞ্চ থেকেই প্রতিক্রিয়া দেন মমতা। রাষ্ট্রপতির মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়েও বিজেপিকেই নিশানা করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমার বলতে লজ্জা করছে। মাননীয়া রাষ্ট্রপতিকে আমরা সম্মান করি। তাঁকে দিয়েও পলিটিক্স বেচতে পাঠানো হয়েছে! বিজেপির এজেন্ডা বেচতে পাঠানো হয়েছে!’’

Advertisement
আরও পড়ুন