আরও একটি জলপথ বন্ধের হুমকি দিল ইরান। ফাইল চিত্র।
হরমুজ় প্রণালীর পর এ বার পশ্চিম এশিয়ার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধের হুমকি দিল ইরান। ইরানের বাহিনী রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর এক সূত্রকে উদ্ধৃত করে সে দেশের তাসনিম নিউজ় এজেন্সি বলেছে, ‘‘ইরানের দ্বীপগুলিতে অথবা ইরান ভূখণ্ডের কোথাও যদি শত্রুপক্ষ হামলা চালানোর চেষ্টা করে কিংবা ইরানের বিরুদ্ধে যদি কোনও রকম পদক্ষেপ করার চেষ্টা করে, তা হলে এ বার হরমুজ়ের মতো আরও একটি জলপথ বন্ধ দেব।’’ ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল খার্গ দ্বীপকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে ইরান যে তাদের পরিকল্পনাকে সফল হতে দেবে না, সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছে। খার্গের দিকে চোখ তুলে তাকালে, পশ্চিম এশিয়ার আরও একটি জলপথকে অবরুদ্ধ করে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
পাশাপাশি এই হুমকিও দেওয়া হয়েছে, যদি ওই জলপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তা হলে শত্রুপক্ষের জন্য সেটা হবে বড় চমক। শুধু তা-ই নয়, যদি ইরানকে ওই পথ বাছতে বাধ্য করা হয়, তা হলে শত্রুপক্ষকে বড় মাসুল গুনতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসি। পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হল বাব-এল-মান্দেব। এই সরু জলপথ যদি ইরান অবরুদ্ধ করে, তা হলে পশ্চিম এশিয়া তো বটেই, বিশ্বের অনেক দেশেই তার প্রভাব পড়বে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের খার্গ দ্বীপে ফের হামলা হলে, বাব-এল-মান্দেব প্রণালীও অবরুদ্ধ করে দেওয়া হবে। ইরানের এই হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক মহলে শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
লোহিত এবং এডেন উপসাগরের সংযোগরক্ষাকারী বাব এল মান্দেবের দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ যথাক্রমে ১৩০ এবং ৪০ কিলোমিটার। তবে কোনও কোনও জায়গায় এই প্রণালী মাত্র ৩০-৩৩ কিলোমিটার চওড়া। এর উপর ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বেশি। বাব এল মান্দেবের উল্টো দিকে রয়েছে ‘আফ্রিকার শিং’ বা ‘হর্ন অফ অফ্রিকা’। এককথায় সরু সামুদ্রিক জলপথটি আরব উপদ্বীপ থেকে জিবুতি, ইরিট্রিয়া এবং সোমালিয়াকে পৃথক করেছে। লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যে একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে কাজ করে এই প্রণালী।
বর্তমানে দিনে প্রায় ৮৮ লক্ষ ব্যারেল খনিজ তেল পরিবহণ হয় বাব এল মান্দেবের করিডর দিয়ে। পাশাপাশি, ওই পথে চলাচল করে বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০-১২ শতাংশ পণ্য। সামরিক সংঘাতের আবহে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তরল সোনার দর অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে। তবে হরমুজ়ের মতো এই প্রণালীতে ইরানের সরাসরি কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিরা এই অঞ্চলে যথেষ্ট সক্রিয়। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, হুথিদের কাজে লাগিয়ে এই জলপথকেও অবরুদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে ইরান। হরমুজ় অবরুদ্ধ হওয়ায় বিশ্ব বাজারে যে ভাবে প্রভাব পড়েছে, তার সঙ্গে বাব-এল-মান্দেবকেও যদি অবরুদ্ধ করে দিতে পারে ইরান, তা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের আধাসরকারি সংবাদসংস্থা ফার্স নিউজ় এজেন্সি জানিয়েছে, হুথিরা ইতিমধ্যেই পশ্চিম এশিয়ার সামরিক সংঘাতে যোগ দেওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। বাব-এল-মান্দেবকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তেহরানকে সহযোগিতার বার্তাও দেওয়া হয়েছিল হুথির তরফে। এ বার সেই জলপথকেই অবরুদ্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিল ইরান। ইরানের আধাসামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মহম্মদ বাঘের ঘালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল তাঁদের খার্গ দ্বীপকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। পড়শি দেশগুলিকে সঙ্গে নিয়ে এই কাজ করার চেষ্টা চালাতে পারে তারা। শত্রুপক্ষের এই পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করতে তাঁদের সেনাও প্রস্তুত। যদি খার্গ দ্বীপের দিকে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল চোখ তুলে তাকায়, তা হলে পশ্চিম এশিয়ার আরও এক গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অবরুদ্ধ করে দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, হরমুজ় প্রণালী থেকে ৪৮৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে খার্গ দ্বীপ। ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে তা ২৬ কিলোমিটার দূরে। আকারে ছোট হলেও এই দ্বীপটি ইরানের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের পরিকাঠামোর দিক থেকে। ইরানের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই রফতানির আগে প্রথমে এই দ্বীপে আসে। পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ড থেকে পাঠানো হয় এই দ্বীপে। ইরানের মূল ভূখণ্ড লাগোয়া সমুদ্র অগভীর। সেই তুলনায় খার্গ দ্বীপটি গভীর সমুদ্রের কাছাকাছি। ফলে এই দ্বীপ থেকে তেল বোঝাই করাই সুবিধাজনক হয় বড় ট্যাঙ্কারগুলির কাছে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে এই খার্গ দ্বীপের ৯০টি জায়গায় হামলা চালায় ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা।