(বাঁ দিকে) আলি লারিজানি। ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডান দিকে)। — ফাইল চিত্র।
ইরানের রাজনীতিতে কট্টরপন্থী এবং মধ্যপন্থীদের মধ্যে সেতুর কাজ করতেন তিনি। সে দেশের নিরাপত্তার দায়িত্বও সামলেছেন দীর্ঘ দিন। ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার হামলার মুখে সুনিপুণ ভাবে সেই দায়িত্ব সামলেছিলেন। সেই আলি লারিজানির মৃত্যুতে ইরানের রাশ এখন সম্পূর্ণ ভাবে চলে গেল কট্টরপন্থী শাসকদের হাতে, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এই পরিস্থিতিতে কি আরও দীর্ঘ হবে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত! কূটনৈতিক পথে যুদ্ধ থামাতে হলে ইরানে কার সঙ্গে কথা বলবে আমেরিকা, রয়েছে সেই প্রশ্নও। কারণ, নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনেই যে আপাতত সেই পথে হাঁটছেন না, তা একপ্রকার স্পষ্ট।
ইরানের প্রশাসনে দীর্ঘ দিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন লারিজানি। প্রয়াত আয়াতোল্লা আলি খামেইনির সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল তাঁর। আবার একই সঙ্গে প্রশাসন, ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড, মধ্যমপন্থীদের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন তিনি। শুধু দেশে নয়, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। ইরানে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার হামলার দিন কয়েক আগে রাশিয়া সফরে গেছিলেন লারিজানি।
এ হেন লারিজানির মৃত্যুতে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। তাঁদের মতে, লারিজানি বেঁচে থাকলে তিনি মোজতবা প্রশাসনকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে যুদ্ধে ইতি টানতে রাজি করাতে পারতেন। অন্য দিকে, ট্রাম্প প্রশাসনকেও সমঝোতার টেবিলে বসাতে রাজি করাতে পারতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে সেই সম্ভাবনা এখন কমে গেল বলেই মনে করা হচ্ছে। এই নিয়ে ট্রাম্প যদিও সরাসরি কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
তবে কেউ কেউ মনে করছেন, ইজ়রায়েল ইচ্ছা করেই লারিজানিকে নিশানা করেছে। ইরানের যে রাজনীতিকেরা কূটনৈতিক পথে সংঘাতের সমাধানের চেষ্টা করতে পারেন, তাঁদেরই নিশানা করছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রশাসন। এমনটাই বলছেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের বিদেশ নীতি সংক্রান্ত বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর এলি গেরানমায়ে। তিনি পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা প্রকল্পের শীর্ষপদে রয়েছেন। ইজ়রায়েল সরকার স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে, এখনই যুদ্ধে ইতি তারা চাইছে না। সরকারের এক মুখপাত্র জানান, তাঁদের উদ্দেশ্য ইরান থেকে আয়াতোল্লা শাসন উৎখাত করা। আর সেই কাজটাই তারা করেছে। প্রসঙ্গত, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে ক্রমেই প্রভাব বাড়ছিল লারিজানির। ইজ়রায়েলের একটি সূত্রের দাবি, সে জন্যই তাঁকে হত্যা করেছে ইজ়রায়েল।
যুদ্ধে ইতি চাইছে না ইরানের কট্টরপন্থী পক্ষও। লারিজানির হত্যার পরে তারা ইতিমধ্যে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে। মোজ়তবাও আগেই জানিয়েছেন, যুদ্ধে ইতি টানা নিয়ে এখনই কিছু ভাবছেন না তাঁরা। তাঁর বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। প্রসঙ্গত, এই মোজ়তবার হাতে ক্ষমতা যাক, চাননি লারিজানি। সূত্রের খবর, লারিজানি মনে করতেন, খামেইনির মৃত্যুর পরে পুত্র মোজতবার হাতে ক্ষমতা গেলে তা হবে ইসলামিক রিপাবলিকের নীতির পরিপন্থী। বংশপরম্পরায় ক্ষমতার হস্তান্তরকে স্বীকৃতি দেয় না সেই নীতি। এ বার সেই লারিজানির মৃত্যুতে মোজতবা এবং কট্টরপন্থীদের হাতেই পুরোপুরি ইরানের ক্ষমতা চলে গেল বলে মনে করছেন কেউ কেউ। তাঁদের আশঙ্কা, এই ক্ষেত্রে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধও দীর্ঘায়িত হবে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের ডিরেক্টর আলি ভায়েজ় বলেন, ‘‘যুদ্ধ এবং রাজনীতির মধ্যে যাঁরা সংযোগ করতে পারতেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম এক নেতাকে হারাল ইরান।’’ এর পর ট্রাম্প চাইলেও কি ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক পথে সমঝোতা সম্ভব হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।