Iran War

ইজ়রায়েলের ‘আয়রন ডোম’ কি আদৌ দুর্ভেদ্য? পর পর ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের হানা প্রশ্ন তুলল আকাশ প্রতিরক্ষা নিয়ে

ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বাহিনী মূলত তিন স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে— ‘আয়রন ডোম’, ‘ডেভিড্‌স স্লিং অ্যান্ড অ্যারো’ এবং আমেরিকার ‘থাড’ সিস্টেম।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২৬ ২১:৪৫
Missiles attack by Iran pierce Israel’s air defenses, raising doubts about interceptors

ইজ়রায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। ছবি: সংগৃহীত।

গত সাড়ে তিন সপ্তাহের যুদ্ধ বেআব্রু করে দিয়েছে সত্যিটা। ইরানের একের ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ আছড়ে পড়ছে ইজ়রায়েলের মাটিতে। আর সেই সঙ্গেই তেল আভিভের বহুচর্চিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ বাড়াচ্ছে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মনে।

Advertisement

বস্তুত, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সেনার আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর আস্থা নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে ইজ়য়ায়েলের বাসিন্দাদের বড় অংশের মনেই। শনিবার রাতে প্রায় তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দু’টি ঘটনায় ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আরাদ ও ডিমোনার দু’টি অসামরিক এলাকায় আঘাত হানে। ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত খবরে দাবি, এর ফলে ফলে বেশ কিছু বাড়ি ভেঙেছে। নেতানিয়াহু সরকার জানিয়েছে, অন্তত ১১৫ জন আহত হয়েছেন। যাঁদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা গুরুতর।

কী ভুল হয়েছে তা এখনও ব্যাখ্যা করেনি ইজ়রায়েলি সেনা। কিন্তু জোড়া এই সফল হামলা প্রশ্ন তুলেছে—ইজ়রায়েল সেনা কি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে পড়ছে? পাশাপাশি এমন উদ্বেগও তৈরি হয়েছে যে দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীকে ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর সীমিত ভাবে ব্যবহার করতে হতে পারে। ঘটনাচক্রে, ডিমোনায় ইজরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ একটি পারমাণুকেন্দ্র রয়েছে। সম্ভবত ইরানের নিশানায় ছিল সেটিও। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মঙ্গলবার বলেছেন, ‘‘অতি সুরক্ষিত ডিমোনায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ইজ়রায়েলের ব্যর্থতা একটি মোড় ঘোরানো ঘটনা। ইজ়রায়েলের আকাশ এখন কার্যত প্রতিরক্ষাহীন।’’

এক ইজ়রায়েলি শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, ‘‘ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে যা আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কিছু ক্ষেত্রে পরাস্ত করতে সক্ষম।’’ তিনি জানিয়েছেন, গত বছরের জুন মাসে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছিল। আনুমানিক ৩,০০০ অস্ত্র থেকে কমে ১,৫০০-র নীচে নেমে এসেছিল। সে সময় ইজ়রায়েল এবং মার্কিন সেনা ইরানের অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি ও লঞ্চারগুলোও ধ্বংস করেছিল। কিন্তু ইরান দ্রুত তার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন চালু করে এবং গত ২৮ ফেব্রুয়ারির যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আবার প্রায় ২,৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত করে ফেলে। এখনও সেই কাজ চালাচ্ছে তারা। এর পরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘‘ইজ়রায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করতে পারবে না।”

তবে ইজ়রায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি মঙ্গলবার বলেন, ‘‘যুদ্ধের প্রথম ২৩ দিনে আমাদের সফল ইন্টারসেপশন (ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস) হার প্রায় ৯২ শতাংশ ছিল।’’ কিন্তু রবিবারের ব্যর্থ ইন্টারসেপশনের কারণ তিনি জানাননি। ইজ়রায়েলি বাহিনী মূলত তিন স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে— ‘আয়রন ডোম’, ‘ডেভিড্‌স স্লিং অ্যান্ড অ্যারো’ এবং আমেরিকার ‘থাড’ সিস্টেম।

বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসাবে বিবেচিত এই ব্যবস্থা একাধিক দিক থেকে আসা হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম। প্রতিটি স্তর নির্দিষ্ট ধরনের আক্রমণ মোকাবিলার জন্য তৈরি— স্বল্প-পাল্লার রকেট ও আর্টিলারি শেলের (হাউইৎজ়ারের গোলা) জন্য ‘আয়রন ডোম’, মাঝারি থেকে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য ‘ডেভিড্‌স স্লিং’ এবং অন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য ‘অ্যারো-২’ এবং ‘অ্যারো-৩’। আমেরিকায় নির্মিত ব্যয়বহুল থাড (টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স) সিস্টেমটি একটি ব্যাকআপ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

ইজ়রায়েলের এয়ার অ্যান্ড মিসাইল ডিফেন্স ফোর্সের প্রাক্তন কমান্ডার রান কোখাভ দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ব্যর্থ ইন্টারসেপশনের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত নীতিগত সিদ্ধান্ত— ইজ়রায়েলি কমান্ডারদের রিয়েল টাইমে নির্ধারণ করতে হয় কোন ইন্টারসেপ্টর কোন আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ব্যবহার করা হবে। একটি সাধারণ রকেটের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়বহুল ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর তা কার্যত নষ্ট করা হয়। এ বারের যুদ্ধে যা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাডার ও ইন্টারসেপ্টর সিস্টেমের ভেতরে প্রযুক্তিগত বা প্রকৌশলগত ত্রুটি ঘটতে পারে, অথবা বিভিন্ন সিস্টেমের মধ্যে সংযোগে সমস্যা দেখা দিতে পারে। কোখাভের মতে, তৃতীয় কারণটি পরিসংখ্যানগত। তিনি বলেন, “খুবই উন্নত বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে আমাদের। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ অভেদ্য নয়।” সেই সঙ্গে তাঁর ধারণা, পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতিও ব্যর্থতার এতটি কারণ হতে পারে। তাঁর কথায় ‘‘একটি অ্যারো ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৩০ লক্ষ ডলার। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেভিড্‌স স্লিং ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ৭ লক্ষ ডলার, আর আয়রন ডোমের দাম প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৭০,০০০ ডলার। থাড ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ১.৫ কোটি ডলার। ফলে দেশের আকাশ পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র রাখার খরচ বিপুল।’’

Advertisement
আরও পড়ুন