‘‘একেবারে ছক কষে একটু একটু করে মৃত্যুর অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া... তবে শরীরটাকে পুরোপুরি শেষ করে ফেলার বহু আগেই মেরে ফেলা হয় আত্মাকে।’’
প্যালেস্টাইনের পশ্চিম ভূখণ্ডের এক হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এ কথা বলছিলেন সে দেশের সাংবাদিক মুজাহিদ বানি মুফলে। মাস কয়েক আগে ইজ়রায়েলের জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন তিনি। এক বছর আগের একটা ছবি দেখলে বোঝা যায়, কতটা সুদর্শন ছিলেন। মুখের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিল সপ্রতিভ দু’টো চোখ। এখন সেই চোখে কোনও দীপ্তি নেই। মাথার খুলির বেশ কিছুটা অংশ বাদ গিয়েছে। বিকৃত মুখ আর জীর্ণ চেহারা দেখলে বোঝা দায় এই সেই মুজাহিদ। বয়সটাও যেন এক ধাক্কায় বিশ বছর বেড়ে গিয়েছে। ইজ়রায়েল-বিরোধী খবর করার ‘অপরাধে’ মুজাহিদকে জেল-বন্দি করেছিল বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার। তবে প্রশাসনিক ভাবে কোনও চার্জ গঠন করা সম্ভব হয়নি। কার্যত বিনা অপরাধে তাঁকে জেলে আটকে রাখা হয় ছ’মাস। মুজাহিদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় প্যালেস্টাইনে। ইজ়রায়েলের উপর চাপ দেওয়া শুরু করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও। চাপের মুখে তাঁকে জেল থেকে ছাড়তে বাধ্য হয় নেতানিয়াহু সরকার। কিন্তু তারা এ নিয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি।
এ বছর জানুয়ারি মাসে প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় জেল থেকে ছাড়া পান মুজাহিদ। তখনই তাঁকে চেনা দায়। কিন্তু এর দু’দিন পরেই তাঁর মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়। ধরা পড়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। এর পর চার মাসেরও বেশি কোমায় ছিলেন মুজাহিদ। তাঁকে বাঁচাতে অস্ত্রোপচার করে বাদ দিতে হয় মাথার খুলির একাংশ। জুন মাসেই জ্ঞান ফিরেছে তাঁর। কথা বলছেন, তবে কণ্ঠস্বর ক্ষীণ। গলার কাছে চামড়া ঝুলছে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই জানিয়েছেন, কী ভাবে দিনের পর দিন খেতে দেওয়া হয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘এক টুকরো রুটিও স্বপ্নের মতো ছিল। একটু ঠান্ডা জল পেলে মনে হত ঈশ্বরের পরম আশীর্বাদ।’’
‘প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজ়নার সোসাইটি’ নামে একটি বন্দিদের অধিকার সংক্রান্ত সংগঠনের দাবি, ইজ়রায়েলের জেলখানাগুলো আসলে মৃত্যু-কল। তাদের অভিযোগ, মুজাহিদের উপর যে ভাবে অত্যাচার চালানো হয়েছে, ঠিক এই পন্থাতেই হাজার হাজার প্যালেস্টাইনি বন্দিকে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। নির্মম ভাবে মারধর, তার পর বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা, মানসিক ভাবে ক্রমাগত ভয় দেখানো, দিনের পর দিন অভুক্ত রেখে দেওয়া, এমনকি প্রাকৃতিক কাজগুলি করার জন্য যে ন্যূনতম গোপনীয়তা প্রয়োজন, সেই মর্যাদাটুকু পর্যন্ত দেওয়া হয় না। আর এই সব শাস্তি দেওয়ার জন্য কোনও রকম অপরাধ প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে না ইজ়রায়েল কর্তৃপক্ষের।
মুজাহিদকে গ্রেফতার করা হয়েছিল ইজ়রায়েলের বিশেষ ‘প্রশাসনিক আটক নীতি’তে। এই আইনি ব্যবস্থায় কোনও চার্জ গঠন কিংবা বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই কোনও ব্যক্তিকে অনির্দিষ্ট কাল জেলে ঢুকিয়ে রাখতে পারে ইজ়রায়েল। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ‘প্রশাসনিক আটক নীতি’তে অন্তত ৩৩২৪ জন প্যালেস্টাইনি বিনা বিচারে ইজ়রায়েলের জেলে বন্দি রয়েছেন। ‘দেশের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক’— এই অভিযোগে আরও ৮০৪৫ জন প্যালেস্টাইনিকে জেলে আটকে রেখেছে ইজ়রায়েল, যাঁদের আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া তো দূর অস্ত্, কোনও দিন শুনানিই হয়নি।