Bangladesh Situation

আঘাত হজম করেই তৈরি হয়েছে সংহতি, আসছে ভোট

মৌলবাদী তাণ্ডবকারীদের বন্ধনীতে জামায়েতে ইসলামীকে সরাসরি বসিয়ে দেওয়া খুবই কঠিন— এমনটাই জানাচ্ছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ঢাকায় নির্বাচনের প্রচারে জামায়েতে উদারতা দেখিয়েছে।

অগ্নি রায়
শেষ আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:১২

—প্রতীকী চিত্র।

এখনও ভাঙা ইটের টুকরো, স্টোন চিপ, বালি, সিমেন্টের গুঁড়োর স্তূপ গেটের মুখে জড়ো করে রাখা। অথবা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকেই যেন গুঁড়ো করে পাহাড়ের মতো সাজানো হয়েছে। সন্ধ্যা নেমেছে অদূরে কাওরান বাজারে, রাতের সওদা, পণ্যবাহী ট্রাকের মিছিল, রিকশা, ঠেলা, টেম্পো, অটোর ক্যাচর ম্যাচরে— জীবন যে রকম!

‘‘কত লোক যে সেদিন স্রেফ লুটপাট করতে এসেছিল, যাঁরা ছিলেন তাঁরাই জানেন’’, বলছেন এক মাস আগে হামলা এবং সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া দুই সংবাদপত্র, ‘প্রথম আলো’ আর ‘ডেলি স্টার’-এর সাংবাদিক, কর্মীরা। নিরাপত্তার প্রশ্নটা এতটাই দগদগে যে নাম প্রকাশ করে কথা বলতে সঙ্গত কারণেই রাজি নন তাঁরা। আগুন-কালো ধোঁয়া আর আতঙ্কে কাঁপতে থাকা রাতের শিফটে কাজ করা সাংবাদিকরা আশ্রয় নিয়েছিলেন ছাদে। সেনা উদ্ধার না করলে, তাঁরা হয়তো আজ কথা বলার জায়গায় থাকতেন না।

ডেলি স্টারের এক সাংবাদিকের কথায়, ‘‘যেহেতু এখন দুর্বল সরকার, তাই অরাজকতা করে জোট বাঁধার সুযোগ পাচ্ছে উগ্র মৌলবাদী অংশ যাদের বাড়বাড়ন্ত ঘটেছে গত এক বছরে। আমাদের উপর আঘাত হানার অর্থ কৌশলগত। ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্রমুখিনতা এবং বাকস্বাধীনতার প্রতীককে গুঁড়িয়ে দিলে সমাজে অন্ধকার নামবে, ভয় বাড়বে। বয়ানের লড়াই চলছে এখন। এক দিকে বিএনপি নেতা তারেক রহমান দেশে ফিরে ভারসাম্য, গণতন্ত্র, সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে জাতি গঠনের কথা বলছেন। অন্য দিকে জোটবদ্ধ হচ্ছে আনসারুল্লা বাংলা, হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ, হিজবুত তাহরীর মতো দল। জামায়েতের একটা অংশ গণতন্ত্রপন্থী হলেও একটা গভীর অংশ রয়েছে যারা ‘ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ স্লোগানের পক্ষে। বাইরের দেশ থেকে অর্থও আসে। তবে এ কথাও বলতে হয় যে, এই অংশ সংখ্যালঘু।’’

প্রথম আলো-র এক দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদকের কথায়, ‘‘গণতন্ত্রের প্রতীক গুঁড়িয়ে নির্বাচন বানচাল করাই মূল উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে করি। একই সঙ্গে ছায়ানট, ডেলি স্টার, প্রথম আলোর দফতরগুলিতে হামলা করা হয়েছে এই বার্তা দিতেই— প্রতিষ্ঠানকে, সরকারকে ভেঙে দেওয়া গেল। তবে এ ক্ষেত্রে এ কথা ঠিক, আমরা সেফটি ভালভ-এর মতো কাজ করেছি, দেশের এই মুহূর্তের সমাজ-রাজনীতিতে। আঘাত হজম করেছি। আমরা আক্রান্ত হওয়ার পর গোটা দেশে সহমত তৈরি হয়েছে সংহতির পক্ষে। গোটা বিশ্বের সমাজমাধ্যমে নিন্দা হয়েছে, বহু রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এসে আমাদের অফিসে সমমর্মিতা জানিয়ে গিয়েছেন, দেশের মানুষও প্রতিবাদে গর্জে উঠেছেন। এর ফলে আমাদের যাই হোক, ভোটটা যে ঠিক সময়ে হবে, অন্তত সেটা নিশ্চিত হয়েছে।’’

এই মৌলবাদী তাণ্ডবকারীদের বন্ধনীতে জামায়েতে ইসলামীকে সরাসরি বসিয়ে দেওয়া খুবই কঠিন— এমনটাই জানাচ্ছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ঢাকায় নির্বাচনের প্রচারে জামায়েতে উদারতা দেখিয়েছে। এক শীর্ষ নেতার ছবি প্রচার করা হয়েছে, যাঁর এক দিকে চাকমা নেতা, অন্য দিকে সহজ সুতির শাড়ি পরা একটি ছাত্রী। যেন তিনি ছায়ানটে গান গেয়ে এলেন এই মাত্র! আবার ঢাকায় প্রবেশের সময় বিমানবন্দরের একটি বইয়ের দোকানের সুলভা ব্যাপটিস্ট-এর (নাম পরিবর্তিত) চোখে যা আতঙ্ক দেখেছি তাই বা অগ্রাহ্য করি কী করে আজকের বাংলাদেশের ভাষ্যে? ‘‘জামায়েতে বলে এক, করে আর এক। ভোটের আগে উদারতা দেখাচ্ছে, জিতে এলে রাস্তায় বেরোতে পারব না আমরা। এখনই মেয়েকে বলতে হচ্ছে কলেজ থেকে দিনমানে বাড়ি ফিরতে, রাতের ঢাকাকে বিশ্বাস নেই আর। এর পর রুজি রোজগারের কী হবে, সে কথা অন্য। এখনই তো মালিক দোকান ছোট করে দিয়েছে, লোকে নাকি বই পড়ছে না আর।’’

একটা বিষয় আজকের বাংলাদেশের বয়ানে বারবার ফিরে আসতে দেখলাম সর্বত্র। ভারতে যত হিন্দুত্বের চাপ বাড়ছে, সংখ্যালঘুর উপর পীড়নের সংবাদ প্রকাশ্যে আসছে, সীমান্তের এ পারে ততই পাল্টা বয়ান ও সক্রিয়তা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ মহল, থিঙ্ক ট্যাঙ্কের কর্তাব্যক্তি এবং সাংবাদিকরা আরও একটি কথা বলছেন। আওয়ামী লীগ এবং ভারতকে একই বন্ধনীতে দেখার প্রবণতা আরও বাড়ছে কারণ, ‘ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ নিয়ে সুর চড়াচ্ছেন খোদ শেখ হাসিনা এবং তাঁর নেতারা। হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে, সে এক রকম কথা। কিন্তু ওঁদের বক্তব্য, ‘‘বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে অন্য দেশের মাটি থেকে ধারাবাহিক বক্তৃতা দেওয়া যদি ভারত বন্ধ না করে, সরকারে যে-ই আসুক, সম্পর্ক ঘোরালোই থাকবে।’’ ইসলামি শক্তি আরও জেগে ওঠার সুযোগ পেয়েছে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে মুস্তাফিজুরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর। পানের দোকান থেকে মাছের বাজার, আলোচনায় বারবার উঠে আসছে এই ক্রিকেটারের প্রতি ‘ভারতের আচরণের’ প্রসঙ্গ।

ভারত-বিরোধিতার স্রোত, উগ্র ইসলামি সংগঠনের চোরাগোপ্তা হিংসা, তারেক রহমান ফেরার পর উজ্জীবিত বিএনপি-র দীর্ঘ দিনের অনভ্যাস কাটিয়ে ভোট প্রচারে নামা, জামায়েতের বহু মুখ, ছাত্রদের না মেটা ক্ষোভ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং বেহাল বাণিজ্যের ক্ষোভে একই ভাবে পীড়িত যুবসমাজ— এই সবের মধ্যেও আসন্ন নির্বাচনের প্রতি আমজনতার আগ্রহ (রাস্তার মোড়ে মোড়ে, পাঁচতারা হোটেলের লবিতে, ঘিঞ্জি বসতিতে আলোচনা শুধুমাত্র আসন্ন ভোট এবং দেশের রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ নিয়ে)— সব মিলিয়ে মিশিয়ে বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি ঘনিয়ে আসছে।

(শেষ)

আরও পড়ুন