তিনি নিজেই ৭ মার্চ ১৯৭১ তার ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন, “রক্তের দাগ এখনও শুকায়নি।” আরও বলেছিলেন, “আপনারা রক্ত দিয়ে আমাকে ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত করে এনেছিলেন। সে দিন এই রেসকোর্সে আমি বলেছিলাম, রক্তের ঋণ আমি রক্ত দিয়ে শোধ করব; মনে আছে? আজও আমি রক্ত দিয়েই রক্তের ঋণ শোধ করতে প্রস্তুত।” হ্যাঁ, সে দিন ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যে দিয়েই নিরস্ত্র বাঙালি হয়ে উঠেছিল সশস্ত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সেই আহ্বান— “এ বারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এ বারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।” স্ফুলিঙ্গের মতোই ছড়িয়ে পড়েছিল দেশজুড়ে। বাঙালি তার হাত ধরেই স্পর্শ করেছিল স্বাধীন একটি দেশের মাটি।

মাত্র ৪ বছর। এর মধ্যেই ষড়যন্ত্রের শেকড় পৌঁছে গেল অনেক গহিনে। এক দিকে বিদেশি মদত আর অন্য দিকে দেশের মাঝে পাকিস্তানপন্থীদের মদতের সঙ্গে উগ্র বামপন্থীদের খতমের রাজনীতি। একই সঙ্গে দেশের মাটিতে চলছে পাকিস্তানি সংস্থার ভয়াল তৎপরতা। তারা চায় বাংলাদেশের গতি বদলে দিতে, আর সেই চাওয়ার সবচেয়ে শক্ত প্রতিপক্ষের নাম শেখ মুজিবুর রহমান। সে কারণেই সদ্য স্বাধীন দেশটির জন্ম হল যাঁর হাত ধরে, তাঁকেই হত্যার ছক কষল ঘাতকেরা। দেশি ও বিদেশি যৌথ ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট নৃংশস ভাবে খুন হলেন। শুধু তিনিই নন, ঢাকা শহরের ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও দশ বছরের শিশু শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামালও নিহত হন ঘাতকের বুলেটে।

সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল উচ্চাভিলাষী সদস্য ১৯৭৫-এর ১৫ অগস্ট ভোর রাতে বাংলাদেশের স্থপতিকে পরিবার-সহ হত্যা করে। সে দিন সেই নির্মম হত্যাকাণ্ড থেকে বিদেশে থাকাতে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। এই দিনে প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধুর বেশ কয়েক জন স্বজন এবং রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলউদ্দিন আহমেদ ও কর্মরত কয়েক জন নিরাপত্তা কর্মকর্তা, কর্মচারী।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গেই যে চেতনাকে ধারণ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, তার একদম উল্টো দিকে পথচলা শুরু হয় সদ্য স্বাধীন দেশটির। প্রশাসন থেকে রাজনীতি, সব জায়গায় পাকিস্তানি ভাবধারার শুরু হয় জয়জয়কার। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশ বেতারের নাম পাল্টে হয় রেডিও বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধে যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ছিল রণধ্বনি, সেটি বদলে পাকিস্তান জিন্দাবাদের সুরে নতুন স্লোগান আসে— বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের আপরাধের ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধী জেল থেকে বেরিয়ে আসে এক বছরের মধ্যেই। উল্টো দিকে মুক্তিযোদ্ধা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ যাঁদের স্বপ্ন, তাঁদের স্থান হতে থাকে কারাগার।

আরও পড়ুন: বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় ছবি উন্মুক্ত হল ঢাকায়

একই সঙ্গে ১৫ অগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক থেকেও বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে দেওয়ার কাজ শুরু হয়। আওয়ামি লিগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরে চলে নির্যাতন, জেল, জুলুম।

বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় ছবি উন্মুক্ত হল ঢাকায়

১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্টের পর থেকে স্বামী, সন্তান-সহ ছয় বছর প্রতিকূল পরিবেশে নির্বাসিত প্রবাস জীবন কাটিয়ে ১৯৮১ সালের ১৯ মে দেশে ফিরতে সক্ষম হন তাঁর বড় মেয়ে শেখ হাসিনা। তার দুই শিশুসন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে লন্ডনে ছোট বোন শেখ রেহানার কাছে রেখে এসেছিলেন বাংলাদেশে।

সেই রবিবার সকাল থেকেই কালবৈশাখীর প্রবল ঝোড়ো হাওয়ার বেগ ছিল ঘণ্টায় ৬৫ মাইল। তবু ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়েই সে দিন বিমানবন্দরমুখী হয়েছিল লাখো মানুষ। মুষলধারার বৃষ্টি তাদের সরাতে পারেনি পথ থেকে। সাড়ে ছয় বছর পর দেশের মাটিতে পা রেখেই শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত পথে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির জনকের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই।”

দেশে ফেরার দিনেই শেখ হাসিনা ছুটে গিয়েছিলেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সড়কের সেই বাড়িতে, যেখানে ঘাতকরা হত্যা করেছিল তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-সহ পুরো পরিবারকে। স্বজনের রক্তে ভেজা সেই বাড়িতে জিয়াউর রহমানের সরকার সে দিন ঢুকতে দেয়নি শেখ হাসিনাকে। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া পড়ে ফিরতে হয়েছিল তাঁকে।

হত্যাকাণ্ডের পর বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার না করে সেই সময়ের রাষ্ট্র তাদের রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিল। বাংলাদেশের সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। এই অধ্যাদেশে এক ধরনের আইনি সুরক্ষা দিয়েই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের পথ বন্ধ করা হয়েছিল। এই হত্যাকারীদের বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছিল।

১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অধ্যাদেশটি জারির পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেন। সে সময় বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল সায়েম জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল সায়েমকে পদত্যাগ করিয়ে রাষ্ট্রপতি হন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই বিতর্কিত নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। সেই সংসদেই ১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ-সহ চার বছর সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছিল।

১৯৯৬ সালে সংসদ নির্বাচনে আওয়ামি লিগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের হাতে ন্যস্ত করতে ১৯৯৬ সালের ১৪ নভেম্বর সংসদে ইনডেমিনিটি আইন বাতিল করা হয়৷ জাতির জনকের ঘাতকদের বিচারের পথের দেখা মেলে।

আরও পড়ুন: আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের গ্রেফতারে নিন্দা অ্যামনেস্টির

১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর আবাসিক একান্ত সহকারি এএফএম মোহিতুল ইসলাম ১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট সংঘটিত নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় একটি এফআইআর দায়ের করেন৷ ৩ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং তারা এ মামলার তদন্ত শুরু করে। ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি সিআইডি এই মামলায় ২০ জনকে অভিযুক্ত করে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চার্জশিট দাখিল করে৷ ১৯৯৭ সালের ১ মার্চ ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আইনগত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর বিচারকার্যের জন্য মামলাটি ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠান। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর মামলার রায়ে বিচারক কাজি গোলাম রসুল ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন৷ তবে, ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকার গঠন করলে আবারও থমকে দাঁড়ায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার।

খোশমেজাজে বঙ্গবন্ধু

২০০৮ সালে আওয়ামি লিগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠন করার পর আবারও গতি আসে মামলাটিতে। উচ্চ আদালতে ২৯ দিন শুনানির পর ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর রায়ের তারিখ নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামির দায়ের করা আপিল আবেদন খারিজ করে দেন৷ রায়ে পঁচাত্তরের ১৫ অগস্ট সপরিবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা মামলায় ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে উচ্চ আদালত। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের মধ্যে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, আর্টিলারি মুহিউদ্দিন আহমদ, বজলুল হুদা এবং ল্যান্সার এ কে এম মহিউদ্দিনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

অন্য দিকে দীর্ঘ দিনেও দেশে আনা সম্ভব হয়নি বঙ্গবন্ধুর পলাতক ৬ খুনিকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পলাতক থাকায় খুনি লেফ্টেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) খোন্দকার আবদুর রশিদ, ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুল মাজেদ, লেফ্টেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) নূর চৌধুরী, মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) এএম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) শরফুদ্দিন আহমেদ ডালিম এবং রিসালদার (অবসরপ্রাপ্ত) মোসলেম উদ্দিনের ফাঁসির রায় এখনও কার্যকর করা যায়নি। কূটনৈতিক ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, খুনিরা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, লিবিয়া অথবা কেনিয়ায়, পাকিস্তান এবং ভারতে।

১৫ অগস্টের বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও তার পরবর্তী সরকারগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে হত্যার কারণ। যারা বাংলাদেশের অভ্যুদয় চায়নি, যারা চায়নি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে, যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চিন ও মার্কিন ভূমিকার সমর্থন করেছে, সে দিন তারা একত্রিত হয়েছিল। সে কারণেই বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার মাত্র ১৬ দিন পরেই ১৯৭৫ এর ৩১ অগস্ট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু চিন বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোরতর বিরোধী সৌদি আরব বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরপরই বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। ১৫ অগস্ট পাকিস্তান রেডিও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের খবর জানানোর পাশাপাশি প্রচার করেছিল, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নাম বদলে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ হয়েছে।

এই কয়েকটি বিষয়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাঙালির একটি নিজস্ব অসাম্প্রদায়িক দেশ আর সেই দেশটির জনক কাদের চোখের কাঁটা হয়েছিলেন। কারা সে দিন ব্যক্তি মুজিবের উচ্চতা আর বাঙালিদের একটি দেশ মেনে নিতে পারেনি? কারা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর উল্লসিত হয়েছে? এই দুই প্রশ্নের উত্তরের মাঝে রয়ে গিয়েছে সবটুকু ইতিহাস আর ঘাতক ও ঘাতকদের মদতদাতাদের স্বরূপ।