রেল-পরিকাঠামো ঢেলে সাজতে পাঁচ বছরে সাড়ে ৮ লক্ষ কোটি টাকা লগ্নির কথা এ বারই বাজেটে বলেছিলেন রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু। মাস না-গড়াতেই তার প্রায় ২০% জোগাড়ও করে ফেললেন তিনি। বুধবার রেলের সঙ্গে সমঝোতাপত্র সই করল এলআইসি (ভারতীয় জীবনবিমা নিগম)। জানাল, পাঁচ বছরে রেলের পরিকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন প্রকল্পে দেড় লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে তারা।

রেলের ইতিহাসে এটি বৃহত্তম লগ্নি। শুধু তা-ই নয়, এই বিপুল অঙ্ক একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থার কাছ থেকে দীর্ঘ (৩০ বছর) মেয়াদে পাচ্ছে তারা। প্রথম পাঁচ বছরে ধার শোধ করতে হবে না। গুনতে হবে না সুদও। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই সমঝোতাপত্র সইয়ের পরে রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভুর প্রতিক্রিয়া, ‘‘সকলেই জিজ্ঞাসা করছিলেন টাকা আসবে কোথা থেকে? এই যে, টাকা এখানে। তা-ও আবার মধু-সহ। কারণ যে সুদের হারে তা পাওয়া যাচ্ছে, রেল এবং এলআইসি, উভয়ের পক্ষেই তা ভাল।’’ বিমা সংস্থাটির এক পদস্থ কর্তার দাবি, সাধারণত, ১০ বছরের বন্ডে কেন্দ্র যে ‘ইল্ড’ দেয়, এ ক্ষেত্রে রেল দেবে তার থেকে ১০ বেসিস পয়েন্ট বেশি।

এই বন্ড (ঋণপত্র) ইস্যু করবে আইআরএফসি (ইন্ডিয়ান রেলওয়েজ ফিনান্স কর্পোরেশন)-সহ রেলের কয়েকটি শাখা সংস্থা। প্রতি বছর গড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকার বন্ড কিনবে এলআইসি। সমঝোতা চুক্তির সময় উপস্থিত অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেন, ‘‘দেশে ব্যবসার মানচিত্রে এলআইসি আক্ষরিক অর্থেই দৈত্য। কী ভাবে এত বড় একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা দেশ গড়ার কাজে সামিল হতে পারে, এই পদক্ষেপ তার উজ্জ্বল উদাহরণ।’’

এ বার রেল বাজেটে নতুন ট্রেন ছিল না। নতুন প্রকল্প ছিল না। ছিল আর্থিক ভাবে ‘বেলাইন’ হতে বসা রেলকে ফের লাইনে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার। কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন ছিল, ধুঁকতে থাকা রেলের চাকায় গতি ফেরাতে পাঁচ বছরে যে বিপুল লগ্নির কথা প্রভু বলছেন, তা আসবে কোথা থেকে? এমনকী তাঁরা কটাক্ষ করেছিলেন যে, এ সবই প্রভুর মায়া!

কিন্তু এ দিন সমঝোতাপত্র সইয়ের পরে অনেকেই বলছেন, রেলে এলআইসি-র লগ্নি টেনে এনে এক ঢিলে তিন পাখি মারলেন প্রভু—

(১) এক লপ্তে প্রয়োজনীয় লগ্নির ২০% জোগাড় করা গেল। তা-ও আবার কম সুদে ও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য।

(২) বাজেটে প্রভু জানিয়েছিলেন, নতুন লাইন বসানো, গেজ পরিবর্তন, বিদ্যুৎ সংযোগের মতো পরিকাঠামোর জন্য এ বছর প্রয়োজন হবে ৯৪, ০০০ কোটি টাকা। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, এলআইসি-ও টাকা ঢালবে ওই ধরনের পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে। যে পরিকাঠামো ও যাত্রী পরিষেবাকে এ বার রেল বাজেটে পাখির চোখ করেছিলেন নরেন্দ্র মোদী।

(৩) বিদেশি বিনিয়োগকারী ও দেশীয় বেসরকারি সংস্থার সামনে রেলে টাকা ঢালার দরজা খুলে দেওয়ার পরেও লগ্নি সে ভাবে আসেনি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এলআইসি টাকা ঢালার পরে সেই ছবি ধীরে হলেও বদলানোর সম্ভাবনা।

কেন এলআইসি-র লগ্নি এমন চুম্বক হতে পারে?

অর্থ মন্ত্রকের মুখ্য উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যন সাম্প্রতিক অতীতে বারবার বলেছেন, অর্থনীতিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করাতে শুধু সংস্কারের মাধ্যমে বেসরকারি লগ্নির দরজা খুললে চলবে না। আগে পরিকাঠামোয় টাকা ঢালতে হবে সরকারকে। তবেই তা দেখে লগ্নি করতে এগিয়ে আসবে বেসরকারি সংস্থাগুলি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একই যুক্তি প্রযোজ্য রেলের বেলাতেও। এলআইসি-র মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে সেখানে লগ্নি করতে দেখলে, টাকা ঢালতে এগিয়ে আসবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও।

অনেকের মতে, শুধু প্রভু নয়, এলআইসি-র লগ্নি রেলে আসায় কাজ সহজ হল জেটলিরও। কারণ—

(১) অর্থনীতিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করাতে পরিকাঠামোয় জোর দিচ্ছে মোদী-সরকার। বিভিন্ন মহল থেকেও বলা হয়েছে, বাজপেয়ী সরকারের আমলে পরিকাঠামো গড়তে যেমন সড়ক নির্মাণে জোর দেওয়া হয়েছিল, মোদী-জমানায় তেমনই গুরুত্ব পাবে রেল। এ দিন সেই বার্তা জোরালো হল। এবং সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রইল জেটলির মন্ত্রকের।

(২) রেলের জন্য এই অর্থের সংস্থান করতে কোষাগার থেকে এক পয়সাও দিতে হল না জেটলিকে। ফলে রাজকোষ ঘাটতি নিয়ে মাথাব্যথা বাড়ল না। বরং টাকা এল এলআইসি-র ঘর থেকে। প্রায় ১৫ লক্ষ কোটি টাকা তহবিলের উপর বসে রয়েছে যারা। তা ছাড়া, আগামী দিনেও রেল যত লগ্নি জোগাড় করতে পারবে, তত কমবে তার বাজেট-নির্ভরতা। অর্থমন্ত্রীর পক্ষে যা সুখবর।

তবে এ দিনও রেল বাজেটের সমালোচনা করেছে তৃণমূল। সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের অভিযোগ, ‘‘এ বার মেট্রো রেলে সে ভাবে বরাদ্দ নেই। কার্যত কিছুই দেওয়া হয়নি রাজ্যকে। জুটেছে শুধু বঞ্চনা।’’