Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৮ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

বৈদ্যুতিন বই ব্যবসায় পাখির চোখ এখন আঞ্চলিক ভাষা

ইন্দ্রজিৎ অধিকারী
কলকাতা ০৬ মার্চ ২০১৪ ০৮:২৯
সুরজিৎ সাহা, শান্তনু চৌধুরী

সুরজিৎ সাহা, শান্তনু চৌধুরী

প্রযুক্তির যাত্রা অমর। তা না ভূগোলের সীমানায় আটকায়, না ভাষার দেওয়ালে। পশ্চিমী দুনিয়ার প্রযুক্তির ঝড় তাই অজান্তেই এ দেশেও বদলে দেয় জীবনযাত্রা। বই পড়ার ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটবে আঁচ করে ‘ই বুক’ বা বৈদ্যুতিন বইয়ের ব্যবসায় নেমেছে সুইফট বুকস। বাংলা-সহ দেশের প্রধান আঞ্চলিক ভাষাগুলির বিপুল সংখ্যক জনপ্রিয় বইকে মুঠোবন্দি ফোনের স্ক্রিনে তুলে আনতে কোমর বেঁধেছে তারা।

ই বুক কাগজে ছাপা নয়। তার বদলে তা কেনা ও পড়া যায় ডেস্কটপ-ল্যাপটপ-ট্যাবলেট-স্মার্টফোনে। মূল বইয়ের মতো একই মলাট। প্রায় একই রকম ছবি আর পাতার নকশা। শুধু বইয়ের বদলে হাতে ধরা থাকে পছন্দের যন্ত্রটি। শহরের এক চিলতে ফ্ল্যাটে বই রাখার জায়গা বাড়ন্ত। সেখানে ই-বুকের সুবিধা, কয়েক হাজার বই সেঁধিয়ে যেতে পারে হাতে ধরা মোবাইলের পেটে। পশ্চিমী দুনিয়া, এমনকী ভারতেও ইংরেজি ই বুকের বিক্রি বাড়ছে ক্রমশ। তার কারণ:

• মনে হলেই যে-কোনও জায়গায় বসে মুহূর্তে পছন্দের বই কিনে ফেলার সুবিধা

Advertisement

• একটি মোবাইল বা ট্যাবলেটেই কয়েক হাজার বই পুরে রাখার বন্দোবস্ত

• ছাপা বইয়ের তুলনায় কম দাম

সুইফটের দাবি, উপদেষ্টা সংস্থা ফরেস্টার-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২-র শেষেও মার্কিন মুলুকে ই-বুকের বাজার ছিল ৮০ কোটি ডলারের। কিন্তু যে-গতিতে তা বাড়ছে, তাতে ২০১৫ সালেই পৌঁছে যাবে ৫০০ কোটি ডলারে। এই মূহূর্তে ভারতে মোট বই বাজারের ১% ই বুকের দখলে। কিন্তু দু’তিন বছরে প্রতি বারই তা ৩-৫ গুণ বাড়বে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্ট মহল।

বাংলা এবং অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় সাহিত্য এত সমৃদ্ধ হলেও ই-বুকের তেমন প্রচলন নেই। যে কারণে সম্ভাবনাও প্রচুর। সেই বাজারকে পাখির চোখ করেই ১৩ বছর চাকরির পর আইবিএম ছেড়েছেন শান্তনু চৌধুরী। ২০১২-র জুনে আর এক বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার সুরজিৎ সাহার সঙ্গে হাত মিলিয়ে তৈরি করেছেন সুইফট বুকস। তথ্যপ্রযুক্তি বহুজাতিকের মোটা মাইনে ছেড়ে হঠাৎ ‘আবোল-তাবোল’ কেন? শান্তনুবাবুর উত্তর, “আমরা বাঙালিরা বইমেলা বলতে পাগল। সেখানে হাতের গ্যাজেটে কয়েকশো বই থাকা মানে তো বছরভর বইমেলার আনন্দ।” জানাচ্ছেন, ছোট থেকেই বইয়ের নেশা ছিল। সেই নেশা থেকেই এই ব্যবসায় ঝাঁপ।

আর ব্যবসায়িক সম্ভাবনা? ‘বিস্তর’, বলছেন শান্তনুবাবু। তাঁর দাবি, এই সম্ভাবনা খুঁটিয়ে দেখেছেন বলে ইংরেজি নয়, নজর দিয়েছেন আঞ্চলিক ভাষায়। তাঁর কথায়, “ইংরেজিতে প্রতিযোগিতা যথেষ্ট। সেখানে আঞ্চলিক ভাষা প্রায় ধূ ধূ মাঠ।” নিজের ভাষার গল্প-উপন্যাসের বই হাতে পেতে অনেক সময়েই মুখিয়ে থাকেন অনাবাসী ভারতীয়রা। শান্তনুবাবুর কথায়, বিলেতে দু’দশক কাটিয়েও শুধু শার্লক হোমসে বাঙালির খিদে মিটবে? না কি মনে পড়বে ফেলুদা আর ব্যোমকেশের কথা? অথচ দেখুন ওই সমস্ত বই কিনতে হলে তাঁরা দেশে আসার জন্য অপেক্ষা করেন। ই বুক সেই সমস্যা পুরোপুরি মিটিয়ে ফেলতে পারবে বলেই তাঁর দাবি।

সুইফট বুকসের দুই কর্তার কথায়, পাঠ্যক্রমের বই ধরলে ভারতে প্রতি বছর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৯০ হাজার। ব্যবসার অঙ্ক ১০-১৫ হাজার কোটি টাকা। যার একটা বিরাট অংশ আঞ্চলিক ভাষার। ফি বছর তা প্রায় ৩০% হারে বাড়ছে। ১৯,০০০ প্রকাশক। যাঁদের ৭০-৮০% ছোট-মাঝারি। ইচ্ছে থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তির ই-বুক প্রকাশের সাধ্য অনেকের নেই। সে কারণেই সুইফটের প্রযুক্তি ও ব্যবসার মডেল প্রকাশকদের কাছে আকর্ষণীয় ঠেকছে বলে শান্তনুবাবুদের দাবি।

আর প্রযুক্তির টেক্কা কেন তাঁদের আস্তিনে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শান্তনুবাবুর দাবি, সুইফট বুকসের ই-প্রকাশনা ইউনিকোড ভিত্তিক। অর্থাৎ অ্যাপলের আইওএস সফটওয়্যারে তা যেমন পড়া যাবে, ঠিক তেমনটাই যাবে গুগ্লের অ্যান্ড্রয়েডে। ট্যাবলেটে পাতার যে-বিন্যাস দেখা যাবে, ঠিক তেমনই উঠে আসবে স্মার্টফোনে। অবিকল আসল বইয়ের মতো। তার উপর হরফ ছোট-বড় করা কিংবা পেজ-মার্কের সুবিধা তো আছেই।

আর প্রকাশকেরা? তাঁদের সাড়া কেমন?

দুই কর্তাই মেনে নিচ্ছেন, ই-বুক থেকে আদৌ ক’পয়সার ব্যবসা হবে, তা নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারেননি প্রকাশকেরা। ফলে ব্যবসার ধাঁচ বদলাতে হয়েছে সুইফটকে। শান্তনুবাবু জানাচ্ছেন, “প্রকাশকের লগ্নি চাইছি না। বরং তার বদলে চুক্তি করছি সরাসরি বই বিক্রির টাকা ভাগ করে নেওয়ার। ধরা যাক, প্রকাশক ‘ক’ তাঁর ‘খ’ বইটিকে ই-বুক করাতে রাজি। সে ক্ষেত্রে খরচ আমাদেরই। পরে তা সংস্থার ওয়েবসাইট কিংবা মোবাইলের অ্যাপ মারফত বিক্রি হলে, সে টাকার মোটা অংশ পাবেন প্রকাশক। বাকি আমাদের। বিদেশে অ্যামাজন-এর মতো প্ল্যাটফর্মে বই বিক্রি হলে, ৭০% পান প্রকাশক বা লেখক। বাকি ৩০% অ্যামাজন। প্রায় সেই মডেলই নিয়েছি আমরা।” সুইফটের দাবি, বাংলা, অসমিয়া, হিন্দি, মরাঠি-সহ বিভিন্ন প্রকাশকের সঙ্গে কিছু চুক্তি হয়েছে।

কিন্তু মোবাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘গেম’ খেলতে অভ্যস্ত আজকের প্রজন্ম সেই একই মোবাইলে আদৌ পড়বে ‘রাজকাহিনী, ‘আম আঁটির ভেঁপু’, বাঁটুল কিংবা হযবরল? শান্তনুবাবুর মতে, “এর উত্তর দেবে সময়ই। তবে একই গ্যাজেটে পাশাপাশি থাকার জন্যই হয়তো পড়বে। বিশেষত ক্রমাগত নিজেদের শিকড় খুঁজে চলা অনাবাসীরা।”

আরও পড়ুন

Advertisement