অর্থনীতির আয়তন কী ভাবে বাড়ছে, ক্ষমতায় এসেই তা মাপার ফিতে বদলে দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু এখন সরকারি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, সেই নতুন মাপকাঠিতেও বৃদ্ধির হারে মোদী জমানাকে হেলায় টেক্কা দিয়ে গিয়েছে মনমোহন সিংহের দশ বছর।

কংগ্রেস-সহ বিরোধীদের দাবি, ইউপিএ সরকারের দশ বছরে বৃদ্ধির গড় হার যেখানে ৮ শতাংশের উপরে ছিল, সেখানে মোদী জমানায় এখনও পর্যন্ত তা মোটে ৭.৩%। সেই ইউপিএ আমল, যার নীতিপঙ্গুত্ব এবং তার জেরে থমকে যাওয়া বৃদ্ধির হার নিয়ে মনমোহন সিংহকে নিয়মিত কটাক্ষ করতেন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী মোদী।

ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়েছে ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল কমিশনের এক রিপোর্টে। জুলাইয়ে তৈরি ওই রিপোর্ট সম্প্রতি নিজেদের ওয়েবসাইটে তুলেছে তারা। বৃদ্ধিতে পিছিয়ে থাকার ছবি ফুটে উঠেছে সেখানেই। অস্বস্তি ঢাকতে সরকারি সূত্র বলছে, কথা ছিল নতুন মাপকাঠিতে পুরনো বছরের জিডিপি হিসেব হওয়ার পরে আগে তা বিশেষজ্ঞ কমিটিতে আলোচনা হবে। ইঙ্গিত স্পষ্ট— এ ক্ষেত্রে তা হয়নি।

সংখ্যা-তত্ত্ব

• ক্ষমতায় এসেই ২০১৫ সালে জিডিপি হিসেব করার পদ্ধতি বদলায় নরেন্দ্র মোদী সরকার। সেই সঙ্গে পাল্টে যায় ভিত্তিবর্ষও।

• সেই নতুন মাপকাঠিতেও দশ বছরের ইউপিএ আমলে বৃদ্ধির গড় হার (৮.১%) মোদী জমানার (৭.৩%) তুলনায় বেশি।

• ১০% ছাপানো বৃদ্ধির মাইলফলকও ছোঁয়া গিয়েছে শুধু মনমোহন জমানাতেই (২০০৬-০৭)।

প্রশ্ন-বাণ

• প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে ইউপিএ সরকারকে নীতিপঙ্গুত্ব নিয়ে নাগাড়ে আক্রমণ করতেন মোদী। দাবি করতেন, বৃদ্ধির হার থমকে গিয়েছে সেই কারণেই। তা হলে তাঁর নিজের সময়ে বৃদ্ধি আরও পিছলে গেল কেন?

• ভোট প্রচারে ফি বছর ৮-১০ শতাংশ বৃদ্ধির স্বপ্ন ফেরি করতেন মোদী। কিন্তু গত চার বছরে তা হল কোথায়?

• বৃদ্ধির হার সম্ভাবনার ধারেকাছে না পৌঁছনোয় অর্থনীতি ডানা মেলতে পারছে না বলে মনমোহনকে বিঁধতেন মোদী। তাহলে এখন কাঠগড়ায় কে?

• মাঝে ২০০৮ সালের বিশ্বজোড়া মন্দার ভয়াল ধাক্কা সামলেও যদি মনমোহন জমানায় গড় বৃদ্ধি ৮% হয়, তবে মোদীর আমলে তা কম কেন? বিশেষত যেখানে গত চার বছরে তুলনায় অনেক কম ঝড়ঝাপ্টা সামাল দিতে হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতিকে!

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মোদী সরকার জানিয়েছিল, এত দিন বৃদ্ধির হার হিসেব করতে যে জিডিপি (মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন) নেওয়া হত, তা বার করা হত উৎপাদন খরচের ভিত্তিতে। কিন্তু তার বদলে বাজার দরের ভিত্তিতে হিসেব করা জিডিপি দিয়ে বৃদ্ধি মাপবে কেন্দ্র। যাতে সুবিধা হয় বাকি বিশ্বের সঙ্গে তার তুলনায়।

বদলে দেওয়া হয়েছিল জিডিপি হিসেবের ভিত্তিবর্ষও। আগেকার ২০০৪-০৫ আর্থিক বছরের পরিবর্তে তা করা শুরু হয় ২০১১-১২ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরে। শুধু তা-ই নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রের যে তথ্য সংগ্রহ করে জিডিপির মাপ করা হয়, বদল এসেছিল তার বেলাতেও। কেন্দ্র তখনই জানিয়েছিল, এই নতুন মাপকাঠিতে পুরনো বছরগুলির জিডিপি এবং বৃদ্ধির হারও পরে হিসেব করা হবে। যাতে তা নিয়ে কথা বলা যায় বিশেষজ্ঞ কমিটিতে। সেই হিসেবই এখন বেরিয়ে এসেছে বলে অনেকের ধারণা।

তবে কার্যত সরকারের ‘অজান্তে’ এই তথ্য সামনে আসা নিয়েও চিমটি কাটতে ছাড়ছেন না বিরোধীরা। এক বিরোধী নেতা বলছিলেন, মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টার পদে এখন কেউ নেই। দীর্ঘ দিন খালি পড়ে রয়েছে মুখ্য পরিসংখ্যানবিদের (চিফ স্ট্যাটিস্টিশিয়ান) পদও। তাই এমন ‘গোপন তথ্য’ যে বেরিয়ে পড়বে, তাতে আর আশ্চর্য কী?