×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৯ জুন ২০২১ ই-পেপার

ব্যাঙ্কে বজ্র আঁটুনি, সঙ্গে নীরব গেরো

প্রজ্ঞানন্দ চৌধুরী
কলকাতা ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০৩:২৯
হানা: পিএনবি-র অভিযোগের ভিত্তিতে গয়নার শোরুমে তল্লাশি ইডি-র। শুক্রবার ঠানেতে। ছবি: পিটিআই।

হানা: পিএনবি-র অভিযোগের ভিত্তিতে গয়নার শোরুমে তল্লাশি ইডি-র। শুক্রবার ঠানেতে। ছবি: পিটিআই।

খাতায়-কলমে দেখলে নিয়মের কোনও খামতি নেই। যিনি ধার নিচ্ছেন, তাঁর যাবতীয় কাগজপত্তর, ঠিকানা, বৃত্তান্ত খুঁটিয়ে দেখার দস্তুর আছে। ঋণ মোটা অঙ্কের হলে, বহু স্তরে তার উপর নজরদারির বন্দোবস্ত আছে। এমনকী এ নিয়ে এক ব্যাঙ্কের সঙ্গে অন্য ব্যাঙ্কের উপর মহলের কর্তাদের কথা বলে নেওয়ার পদ্ধতি আছে। কিন্তু পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের বিতর্ক সেই বজ্র আঁটুনির নিঃশব্দ (নীরব) গেরো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বলে মানছেন খোদ ব্যাঙ্কিং বিশেষজ্ঞরাই।

তাঁদের বক্তব্য, ব্যাঙ্কে লেনদেনে নজর রাখার এত ব্যবস্থা। কিন্তু তার ফাঁক গলে যে ভাবে ১১,৩৪৬ কোটি টাকার প্রতারণা ঘটেছে, তাতে এই প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। তাঁদের প্রশ্ন, তবে কি নজরদারির কোনও ব্যবস্থাই কাজ করেনি? না কি তা দেখেও না দেখার ভান করা হয়েছিল? ১১ হাজার কোটিরও বেশি অঙ্কের লেনদেন কী ভাবে এক-দু’জন জুনিয়র অফিসারের ভরসায় ছেড়ে রাখা হল, তা বুঝতে পারছেন না তাঁরা।

ইউকো ব্যাঙ্কের প্রাক্তন এগ্‌জিকিউটিভ ডিরেক্টর বি কে দত্ত যেমন বলছেন, ‘‘পিএনবিতে ওই কেলেঙ্কারি যাঁরা করেছেন, তাঁরা হয় বড় প্রতারক, নইলে আন্তর্জাতিক লেনদেনে অজ্ঞ। যা-ই হোক, এ আসলে, বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো।’’

Advertisement

ইউনিয়ন ব্যাঙ্কের প্রাক্তন সিএমডি দেবব্রত সরকার বলেন, ‘‘ভারতে ব্যাঙ্কিংয়ে নজরদারির ব্যবস্থা যথেষ্ট মজবুত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পুরো বিষয়টিতে নজরদারিতে ঘাটতি ছিল।’’ একই অভিযোগ এ দিন করেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কও।

ইউনাইটেড ব্যাঙ্কের প্রাক্তন সিএমডি ভাস্কর সেন বলেন, ‘‘পিএনবিতে ২০১১ সাল থেকে শুরু করে এত দিন এ ধরনের লেনদেন সকলের নজর এড়িয়ে চলল কী ভাবে, তা স্পষ্ট নয়।’’ পিএনবির শীর্ষ কর্তা অবশ্য বৃহস্পতিবারই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই ধরনের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে তাঁরা সক্ষম। এ বিষয়ে দায়িত্ব থেকে কোনও ভাবে একচুল না সরারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাঁরা।

প্রতি বছর অডিট সংস্থাকে দিয়ে ব্যাঙ্কের প্রতি শাখায় লেনদেন খতিয়ে দেখা হয়। ব্যাঙ্কের পরিভাষায় যাকে বলা হয় লং ফর্ম অডিট রিভিউ (এলএফএআর)। বি কে দত্ত বলেন, ‘‘দেখতে হবে পিএনবির ওই শাখা এলএফএআরের আওতায় ছিল কি না। অডিট হয়ে থাকলে, তা তাদের চোখ এড়িয়ে গেল কী ভাবে?’’ একই প্রশ্ন তাঁর ‘সুইফ্‌ট মেসেজ’ তিনটি পর্যায়ে যাচাই হওয়া নিয়েও।

তা ছাড়া, এই মুহূর্তে দেশের সমস্ত ব্যাঙ্কেই কোর ব্যাঙ্কিং চালু রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএনবির ‘সুইফ্‌ট’ লেনদেন কোর ব্যাঙ্কিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। একই কথা বলেছেন ভাস্করবাবুও। সেই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘‘১১ হাজার কোটিরও বেশি অঙ্কের লেনদেন কী করে এক জন জুনিয়র অফিসার এবং এক জন অ্যাসিস্ট্যান্টের দায়িত্বে রাখা হয়েছিল, সেটা ভেবেও আমরা বিস্মিত।’’

যা হয়েছে

• সিবিআইয়ের অভিযোগ, ২০১১ সালে বিরাট অঙ্কের টাকা মেটানোর গ্যারান্টি (লেটার অব আন্ডারটেকিং) ব্যাঙ্ক অফিসারদের সঙ্গে যোগসাজশে হাতিয়ে নেন নীরব ও তাঁর সংস্থা

• আঙুল মূলত পিএনবির দুই অফিসারের দিকে

• সেই নথি দেখিয়ে দফায় দফায় বেশ কয়েক বার মোটা অঙ্কের কারবার অন্যান্য ভারতীয় ব্যাঙ্কের বিদেশি শাখার সঙ্গে

• জানুয়ারিতে ফের একই কৌশলে নীরব ও তাঁর আত্মীয়ের সংস্থা গ্যারান্টি নিতে আসে পিএনবির কাছে। তখন নজরে আসে প্রতারণা

খটকা যেখানে

• এ ধরনের বড় অঙ্কের লেনদেনে গরমিল ধরতে একাধিক স্তরে বহু ভাবে নজরদারি থাকার কথা। পিএনবিতে তা কি ছিল না?

• লেটার অব আন্ডারটেকিং দেওয়া নিয়ে অভিযোগ উঠছে কয়েক জন অফিসারের বিরুদ্ধে। কিন্তু এ রকম লেনদেন গুটিকয় অফিসারের উপর নির্ভর করে হয় কি? তা আবার তাঁরা জুনিয়র হলে সেটি কী ভাবে সম্ভব?

• এত বার এত মোটা অঙ্কের লেনদেনের ‘গ্যারান্টি’ কর্তৃপক্ষের চোখ এড়াল কী ভাবে?

• ব্যাঙ্কের প্রতি শাখায় ফি বছর হিসেব পরীক্ষা (অডিট) হয়। সেখানে গলদ ধরা পড়ল না কেন?

• ‘সুইফ্‌ট মেসেজ’ (এক ব্যাঙ্ক অন্য ব্যাঙ্ককে টাকা দেওয়ার জন্য যে ভাবে বার্তা পাঠায়) পাঠানোর আগে তিন পর্যায়ে তা খতিয়ে দেখা হয়। এ ক্ষেত্রে তা হয়েছিল কি?

• একটি ব্যাঙ্ক আর একটিকে লেটার অব আন্ডারটেকিং বা ক্রেডিট পাঠালে, দ্বিতীয়টি প্রথমটির কাছে তার সত্যতা, বন্ধক আছে কি না ইত্যাদি জানতে চায়। সেই খতিয়ে দেখা কি তবে এ ক্ষেত্রে হয়নি?

Advertisement