মোতায়েন একশোর বেশি পুলিশের মধ্যে তখন হেলমেট ছিল না একমাত্র তাঁরই মাথায়। আর আধলা ইটটা গিয়ে পড়ল সেই ডিসি (সেন্ট্রাল) দেবেন্দ্রপ্রকাশ সিংহের খালি মাথাতেই। সঙ্গে সঙ্গে মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত। বুধবার দুপুরে পুলিশ যখন কলকাতা পুরসভার সামনে রাজ্য বিজেপি-র ব্যবসায়ী শাখার বিক্ষোভ কর্মসূচির উচ্ছৃৃঙ্খল হয়ে যাওয়া সামাল দিতে চেষ্টা করছে, সেই সময়েই এই ঘটনা। জখম ডিসি-কে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যেও সহকর্মীদের প্রশ্ন, হেলমেট ছাড়া ডিসি কেন বিক্ষোভ-কর্মসূচি সামাল দিতে গেলেন? লালবাজারের এক শীর্ষকর্তার কথায়, “ওই সময়ে হেলমেট না পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে ডিসি (সেন্ট্রাল) মোটেই উচিত কাজ করেননি। এই ধরনের কাজে পুলিশের যে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (এসওপি) আছে, তিনি স্পষ্ট তা অগ্রাহ্য করেছেন।”

ঘটনাস্থলে কলকাতা পুলিশের এক পদস্থ কর্তার দাবি, “ডিসি গোড়া থেকে হেলমেট পরেই ছিলেন। বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে মাইকে কিছু বলার সময়ে তিনি সবে হেলমেটটা খুলেছিলেন। তখনই ইটের টুকরো ডিসি-র মাথায় এসে পড়ে।” তবে লালবাজারের এক শীর্ষ অফিসারের বক্তব্য, “আমাদের কাছে খবর, পুরভবনের সামনে মোতায়েন পুলিশ বাহিনীর মধ্যে একমাত্র ডিসি (সেন্ট্রাল)-ই হেলমেট পরেননি, নিজের মাথা বাঁচানোর প্রয়োজনীয় সুরক্ষার বন্দোবস্ত তাঁর ছিল না।” 

কলকাতা পুলিশের অফিসারদের একটা বড় অংশের মতে, অনর্থক এই ধরনের বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে কয়েক জন অফিসার যেচে শুধু নিজেরই বিপদ ডেকে আনেন না, অধস্তন সহকর্মীদেরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেন। কারণ, ডিসি পদমর্যাদার এক জন অফিসার এ ভাবে রক্তাক্ত হলে অধস্তন পুলিশকর্মীদের অনেকেই তাঁকে নিয়ে স্বভাবতই ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং বিক্ষোভকারীদের সম্ভাব্য হামলার মুখে তাঁদের পড়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। বিশেষত এ দিনের ঘটনার ক্ষেত্রে ডিসি দেবেন্দ্রপ্রকাশ সিংহই যখন পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।

২৬/১১-র জঙ্গি হামলার সময়ে জঙ্গিদের গুলিতে প্রাণ হারাতে হয়েছিল তিন আইপিএস অফিসার হেমন্ত কারকারে, বিজয় সালাসকর ও অশোক কামটে-কে। পরবর্তী কালে গোয়েন্দা-তথ্য থেকে জানা যায়, পাক সন্ত্রাসবাদী আজমল কসব যখন কালাশনিকভ থেকে গুলিবৃষ্টি করছে, সেই সময়ে উপযুক্ত বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট না পরেই ওই তিন জন তার মোকাবিলা করতে গিয়ে নিহত হন। ওই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ জুড়ে অনেক শহরেই পুলিশকর্মীদের জন্য উন্নত মানের বুলেট প্রুফ জ্যাকেট কেনা হয় এবং গুলি চলছে, এমন পরিস্থিতিতে সেগুলো পরে তবেই মোকাবিলা করতে যাওয়া বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়েছে।

চোট পাওয়ার পরে হেলমেট পরলেন তিনি।

পুরসভার সামনে বিক্ষোভ মোকাবিলায় হেলমেট না পরার জন্য কি ডিসি (সেন্ট্রাল)-কে কারণ দর্শাতে বলা হবে? লালবাজারের এক শীর্ষ অফিসার অবশ্য বলেন, “না, এমন কিছু করা হবে না। ডিসি (সেন্ট্রাল) যুক্তি দিতেই পারেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, তিনি হেলমেট পরারই অবকাশ পাননি।”

পুলিশ জানায়, একগুচ্ছ দাবি নিয়ে এ দিন পুর অভিযান করে বিজেপি-র ট্রেডার্স সেল। দুপুর আড়াইটে নাগাদ কলেজ স্কোয়ার থেকে সেই মিছিল আসে পুরভবনে। পুরসভার মূল গেটের সামনে বিজেপি-র সমর্থকেরা তাঁদের দাবি-দাওয়া নিয়ে বসে পড়েন। তখনও পর্যন্ত সব কিছু ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু এর পরই বিজেপি-র এক দল সমর্থক পুরসভার গেট ছেড়ে চলে আসেন এস এন ব্যানার্জি রোডের দিকে। অভিযোগ, সেখানে আচমকা ৩০-৩৫ জনের একটি দল রাস্তায় বসে পড়ে স্লোগান দিতে শুরু করেন। যার জেরে প্রায় আধঘণ্টার উপর ওই রাস্তায় যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এস এন ব্যানার্জি রোডে সারি দিয়ে গাড়ি ও বাস দাঁড়িয়ে পড়ায় যানজট শুরু হয়। যদিও বিজেপি নেতৃত্ব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, পুলিশ লাঠিচার্জ করার পর তাঁরা রাস্তায় বসেছেন।

ওই সময়ে ডিসি সেন্ট্রাল দেবেন্দ্র প্রকাশ সিংহের নেতৃত্বে পুলিশ আধিকারিকেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিজেপি সমর্থকদের অবরোধ তুলে নিতে অনুরোধ করেন। প্রায় আধঘণ্টা ধরে তাঁরা বিজেপি সমর্থকদের বোঝানোর চেষ্টা করলেও তাঁরা রাস্তা ছাড়তে রাজি হননি বলে অভিযোগ। তখনই ডিসি সেন্ট্রাল পুলিশকর্মীদের নির্দেশ দেন অবরোধ তুলে দিতে। পুলিশ অবরোধ তুলতে গেলে ইট এসে পড়ে ডিসি সেন্ট্রালের মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে শুরু করে। পুলিশের ও বিজেপি সমর্থকদের হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। ইট পড়তে থাকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বিশাল বাহিনী। বিজেপি সমর্থকদের রাস্তা থেকে তুলে দেওয়ার জন্য পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। এ দিনের ঘটনায় দু’পক্ষেরই বেশ কয়েক জন করে আহত হন বলে দাবি। পরে পুলিশ ১২ জন বিজেপি সমর্থককে গ্রেফতার করে।

বিক্ষোভকারীদের লাঠি নিয়ে তাড়া পুলিশের। বুধবার।

তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া, “কলকাতার বুকে পুরসভার সামনে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে বিজেপি উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করল। এক জন আধিকারিকের মাথা ফাটাল। এই ধরনের রাজনীতির তীব্র ভাষায় নিন্দা করছি। জনসমর্থন হারিয়ে শুধুমাত্র সংবাদমাধ্যমে ভেসে ওঠার তাগিদে এই ধরনের আচরণ করল বিজেপি কর্মীরা।” বিজেপির রাজ্য সভাপতি বা অন্য কারও নামোল্লেখ না করে পার্থবাবুর কটাক্ষ, “এর পিছনে ইন্ধন জোগাচ্ছেন সেই সব নেতারা, যাঁরা জীবনে কোনও দিন ভোটে জয়ী হয়ে আসতে পারেননি।”

বিজেপির রাজ্য সভাপতি রাহুল সিংহর প্রতিক্রিয়া, “বিনা প্ররোচনায় পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। আমাদের বহু কর্মী এবং সাধারণ পথচারীরা জখম হয়েছেন। আমরা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তবে ডিসি সেন্ট্রাল আহত হওয়ায় আমরা দুঃখিত। পুলিশকে আক্রমণ করার কোনও উদ্দেশ্যই আমাদের ছিল না।”

 

—নিজস্ব চিত্র।