সপ্তাহ শেষে বাড়ি ফেরার জন্য ধর্মতলা থেকে মিনিবাসে চেপেছিলেন চণ্ডীতলা থানা এলাকার কুমিরমোড়ার বাসিন্দা, বছর একচল্লিশের শেখ আলফাজ হোসেন। কিন্তু স্ট্র্যান্ড রোডে ওই মিনিবাসের সঙ্গে একটি বাসের সংঘর্ষে গুরুতর জখম হন আলফাজ। স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে দেখা যায়, আলফাজ হাঁটতে পারছেন না। চিকিৎসকেরা এক্স-রে করে জানান, তাঁর হাঁটুর নীচে একটি হাড় পুরো ভেঙে গিয়েছে।

পরে খবর পেয়ে আলফাজের সহকর্মীরা হাসপাতালে পৌঁছে জানতে পারেন, চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, পায়ের হাড় টুকরো হয়ে যাওয়ায় অস্ত্রোপচার ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু তার জন্য ভর্তি করতে হবে। অথচ, ওই হাসপাতালে কোনও শয্যাও খালি নেই। তাই অন্য কোনও হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে ওই যুবককে।

দুর্ঘটনার দু’ঘণ্টা পরে জরুরি বিভাগ থেকে এ কথা শুনে রীতিমতো হতাশ হয়ে পড়েন আলফাজ ও তাঁর সহকর্মীরা। পায়ের ওই অবস্থা নিয়ে আলফাজ অন্য হাসপাতালে যাবেনই বা কী করে? জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের বারবার এ কথাই বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন তাঁর সহকর্মীরা। কিন্তু চিকিৎসকদের একটাই উত্তর, ‘‘কিছু করার নেই। এখানে কোনও বেড খালি নেই। চাইলে আপনারা রোগীকে বাড়িও নিয়ে যেতে পারেন। পরে এসে আউটডোরে দেখাবেন!’’

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

আলফাজের সহকর্মী বাসুদেব সাহার দাবি, তিনি বারবার চিকিৎসকদের অনুরোধ করেছিলেন, ওই রাতটুকুর জন্য একটা ব্যবস্থা করে দিতে। যাঁতে এসএসকেএমেই থাকতে পারেন আলফাজ। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি বলেই তাঁর অভিযোগ। বাসুদেব বলেন, ‘‘পুলিশ দুর্ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পরেও যদি ভর্তি না নেয় এবং অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে, তা হলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ কী করে ভর্তি হবে?’’ ওই রাতে প্রায় ১২টা পর্যন্ত এসএসকেএমের জরুরি বিভাগের ট্রলিতেই বসে থাকেন আলফাজ। আর তাঁর বাড়ির লোকজন এক বার নীলরতন সরকার তো এক বার কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হত্যে দিতে ছোটেন। কিন্তু কোথাও কোনও শয্যা মেলেনি। শেষে রাত তিনটে নাগাদ কোথাও ভর্তির আশা না দেখে আলফাজ এক আত্মীয়ের সঙ্গে আরামবাগে গিয়ে পরিচিত এক জনের নার্সিংহোমে ভর্তি হন। এসএসকেএমের সুপার রঘুনাথ মিশ্র এ বিষয়ে বলেন, ‘‘এ ধরনের রোগী এলে সাধারণত ভর্তি নিয়ে নেওয়া হয়। সে দিন কী হয়েছিল, আমার জানা নেই।’’

তবে সরকারি এই পদ্ধতি নিয়ে আলফাজ হতাশ। মঙ্গলবার ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁর অভিযোগ, ‘‘সরকারি কোথাও জায়গা নেই শুনে রাত তিনটে নাগাদ আত্মীয়ের সঙ্গে অ্যাম্বুল্যান্সে করে আরামবাগে এসেছি। কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালে ভরসা পাইনি।’’ শুধু আলফাজ নন, পরিসংখ্যান বলছে, যে কোনও দুর্ঘটনার পরেই জখম ব্যক্তিকে সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পরে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু হয়ে গেলেই শুরু হয় রোগীর পরিবারের আসল লড়াই। আর সেটা হাসপাতালের শয্যা নিয়ে। এক হাসপাতালে না পেলে আর এক হাসপাতাল। সেখানেও না হলে অন্য কোথাও। ঘুরেই যেতে হয়। কোথাও জায়গা না মিললে শেষে বেসরকারি হাসপাতাল। নয়তো ভর্তির টানাপড়েনে অনেক সময়ে রাস্তাতেই মৃত্যু হয় জখম ব্যক্তির। 

সরকারি চিকিৎসকদের দাবি, এই মুহূর্তে কলকাতার সব ক’টি সরকারি হাসপাতালেই রোগীর চাপ খুব বেশি। ফলে জখম কোনও রোগীকে আনা হলে সবার আগে তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে শয্যা খালি থাকলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ওয়ার্ডে। খালি না থাকলে রেফার করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি হাসপাতালে দুর্ঘটনাগ্রস্তদের জন্য আলাদা কোনও স্থায়ী ব্যবস্থা রাখা হয় না কেন? স্বাস্থ্য ভবন জানাচ্ছে, দুর্ঘটনায় জখমদের জন্যই বিভিন্ন হাসপাতালে তৈরি করা হচ্ছে ট্রমা কেয়ার সেন্টার। এসএসকেএমে ওই সেন্টার প্রায় তৈরি। তাড়াতাড়িই সেটি খুলে দেওয়া হবে। প্রায় ২০০ জন রোগী সেখানে চিকিৎসা পাবেন।