• 3
  • কুন্তক চট্টোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

স্ত্রী-শক্তির হাতে দশভুজার আগমনি

  • 3

এক কারিগরের ভাইঝি হওয়ায় তাঁর কাছে মিষ্টি খাওয়ার বায়না জুড়েছিলেন পিয়ালি সাধুখাঁ। কিন্তু ‘মেয়ে হয়েছে’, তাই মিষ্টি খাওয়াননি ওই কারিগর। সেই কথাটাই কানে বেজেছিল পুজো ময়দানের নবীন শিল্পী পিয়ালির। তা থেকেই এ বার তিনি জন্ম দিয়েছেন নতুন থিমের। অর্জুনপুরের আমরা সবাই ক্লাবে তুলে ধরছেন ‘ঘরের মেয়ে’ দুর্গাকে। প্রতিমাও সেখানে ছোট্ট মেয়ের ধাঁচে।

গত বছরই পুজো ময়দানে হাজির হয়েছেন কলাভবনের প্রাক্তন ছাত্রী পিয়ালি। তাঁর ভাবনা ঘিরে এ বছর মুখে-মুখে ঘুরছে তাঁর নাম। একুশ শতকেও কন্যাসন্তান নিয়ে এমন ধারণা যে রয়ে গিয়েছে, তা মালুম হয়েছে ওই কারিগরের কথাতেই। ‘‘সেই ধারণাকে বদলাতে দুর্গা পুজোর থেকে ভাল মঞ্চ আর কী হতে পারে,’’ বলছেন এক পুজোকর্তা। তবে কৃতিত্ব একা নিতে নারাজ পিয়ালি বলছেন, ‘‘শুধু আমি নই, সঙ্গে রয়েছেন সৌমিক চক্রবর্তী, প্রদীপ পাত্র নামে আরও দুই শিল্পী।’’ বেহালা নতুন সঙ্ঘ ও রূপচাঁদ মুখার্জি লেনের পুজোতেও প্রতিমা গড়ছেন পিয়ালিরা।

এ বার পুজোয় নামী পুরুষ শিল্পীদের পাশাপাশি তাল ঠুকছেন কিছু মহিলাও। কেউ বট্যানিতে স্নাতকোত্তর, কেউ বাণিজ্যের ছাত্রী! কোথাও পুরুষ শিল্পীর দলের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছেন এক নারী। কোথাও আবার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন স্বামী-স্ত্রী।

বট্যানির ছাত্রী অদিতি চক্রবর্তী পুজোর ময়দানে এসেছেন শিল্পকে ভালবেসে। চন্দননগরের মেয়ে অদিতির পুজোয় হাতেখড়ি সেখানকারই জগদ্ধাত্রী পুজোয়। ২০১৩-য় কলকাতা আসেন বড়িশা তরুণ তীর্থ ক্লাবের হাত ধরে। ২০১৪-য় সাজিয়ে তোলেন তরুণ তীর্থ, ওয়েলিংটন ব্যবসায়ী সমিতির মণ্ডপও।

এ বার অদিতির কাজের তালিকায় তরুণ তীর্থের বদলে সন্তোষপুর লেক পল্লি, ওয়েলিংটনের পুজো। লেক পল্লির পুজোয় তিনি তুলে আনছেন রাজস্থানের মান্ডানা, কর্নাটকের চিত্তারা শিল্প। প্রতিমাও লোকশিল্পের আদলে। টানা কয়েক বছর ‘ইনস্টলেশন’ দেখানোর পরে গত বছর থেকেই লোকশিল্পের দিকে ঝুঁকেছিল লেক পল্লি। এ বার সেটাকে আরও ছড়িয়ে দিচ্ছেন অদিতি। ওয়েলিংটন ব্যবসায়ী সমিতিতেও তাঁর হাতিয়ার গুজরাতের লোকশিল্প।

বাণিজ্যে শিক্ষার পাশাপাশি সুদীপ্তা দাসের আগ্রহ ছিল শিল্পেও। রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার ডিগ্রিও। এ বার প্রথম মাঠে নেমেছেন তিনি। গড়িয়াহাটের কাছে ফাল্গুনী সঙ্ঘে তুলে ধরছেন বাঁশের শিল্প। পুজোকর্তাদের অনেকেই বলছেন, নবীন এই শিল্পী কিন্তু গড়িয়াহাটের ভিড় টানতেই পারেন।

পুজোয় সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচিতি জাঁদরেল শিল্পী হিসেবে। কিন্তু তাঁর ওয়ার্কশপের আসল ‘শক্তি’ স্ত্রী অঙ্কিতা। সরকারি কর্মচারী সুব্রত পুজোর কাজে তত সময় দিতে পারেন না। তাঁর স্বীকারোক্তি, ‘‘ওয়ার্কশপে কে কী কাজ করবে, তা পুরোটাই দেখে অঙ্কিতা। ও নিজে স্বয়ংসম্পূর্ণা।’’

এই তালিকায় রয়েছেন রাখী মুখোপাধ্যায় বা সুমি মজুমদারের মতো আরও অনেকে। স্বামী সন্দীপ মুখোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণাতেই পুজো ময়দানে এসেছিলেন রাখী। স্বামী-স্ত্রী মিলে সাত বছর ধরে উৎসব কাপে লড়াই করছেন। মুকুন্দপুর সর্বজনীন, বেলেঘাটা কিশোর সঙ্ঘে রাখীর কাজ লোকের নজর কেড়েছে। এ বার বেলেঘাটা সিআইটি রোডে শান্তির থিমে রাখী তুলে আনছেন গুজরাতি শিল্পকে। ফড়িয়াপুকুরের থিম ‘চেনা-অচেনা’। এমন ভাবেই স্বামী শুভদীপ মজুমদারের সঙ্গে পুজোয় জুড়ে রয়েছেন সুমি মজুমদার। গত বছর সেলিমপুর পল্লির পরে এ বার তাঁদের হাতে রূপ পাচ্ছে বেলতলা শক্তি সঙ্ঘ। সেখানে দেখা যাবে বালিদ্বীপের হিন্দু সংস্কৃতি।

শিল্পী সনাতন দিন্দার দলেও কার্যত ‘সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড’ এক নারী, পাঞ্চালি বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতোই আর এক উদাহরণ লীনা কেজরীবাল। তিনি রয়েছেন শহরের আর এক নামী শিল্পী সুশান্ত পালের দলে। বেহালা ফ্রেন্ডস ক্লাবে সুশান্ত ফোটোগ্রাফির ব্যবহার করছেন। পেশায় ফোটোগ্রাফার লীনা এ বারই প্রথম পুজোর কাজ করছেন। কলকাতার কোনও পুজোয় সরাসরি না থেকেও এ বছর উৎসব কাপে চর্চা চলছে শিল্পী শুভমিতা দিন্দার নাম নিয়েও। তাঁর তৈরি ফাইবার গ্লাসের প্রতিমা পাড়ি দিচ্ছে সুদূর কানাডায়।

পুজোর বাজারে মহিলা শিল্পী নতুন নন। শিল্পী শানু লাহিড়ী বকুলবাগানের পুজোকে সাজিয়ে তুলেছেন। পুজো ময়দানে দেখা গিয়েছে সরকারি আর্ট কলেজের কয়েক জন শিক্ষিকাকেও।

কিন্তু এ ভাবে একঝাঁক মহিলা শিল্পী পেশাদারি ঢঙে নামী-দামি ক্লাবের কাজ করছেন, এটা কিন্তু নতুন চল।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন