বড় কাচের জারে অর্ধেক ভর্তি জল। তাতে মেশানো কালি। সেই কালি-জলে ডুবে আছে কয়েকটি কলম। এটা হল আইসিইউ।

এর পরে ওদের ওই আইসিইউ থেকে বার করে চিকিৎসা শুরু করা হবে। কোনও জীব নয়, অজীবের এমন চিকিৎসা শুনে চোখ কপালে উঠতেই পারে কারও কারও। তবে এ শহর দেখেছে জুতোর হাসপাতাল। তাই ভিন্ন ধারার এই হাসপাতাল প্রথম, এমনটা নয়। শহরের পেন সংগ্রাহকদের স্মৃতি বলছে, এমন কলমের হাসপাতাল এ শহরে একাধিক ছিল। বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে যার বেশির ভাগের ঝাঁপ নেমে গিয়েছে। অথবা ভাগ বসিয়েছে অন্য ব্যবসা।

তাদের মধ্যে তিন প্রজন্মের ব্যবসায়ী মহম্মদ ইমতিয়াজের পরিবার এখনও চালাচ্ছে কলমের হাসপাতাল। ধর্মতলার এস এন ব্যানার্জি রোডের ফুটপাতে জামাকাপড়ের পসরা ঘিরে যে হইচই তারই এক ফাঁকে চলে হাসপাতালটি। এসপ্লানেড মেট্রোর চার নম্বর গেটের কাছেই রয়েছে ‘পেন হাসপাতাল’। ‘চিকিৎসক’ ইমতিয়াজ জানাচ্ছেন, তাঁর দাদু সামসুদ্দিন ৮০ বছর আগে শুরু করেন এই হাসপাতাল। এর পরে বাবা মহম্মদ সুলতানের হাত ধরে ইমতিয়াজ ও তাঁর ভাই মহম্মদ রিয়াজ চালাচ্ছেন এটি।। 

বিবর্ণ হয়ে যাওয়া হাসপাতালে খদ্দেরের প্রতীক্ষায় বসে ইমতিয়াজ বলেন, “আমাদের কাজ কালি-কলম বা নিব নিয়ে। এখন কালি-কলমে কত জন লেখেন বলুন তো! বেশির ভাগই তো এক বার ব্যবহার করেই ফেলে দেওয়া যায় এমন কলম ব্যবহার করেন। কিছু মানুষ এখনও আছেন, যাঁরা কালি-কলমে লেখেন। তাঁরাই আসেন বিকল কলম সারাতে। কেউ আবার পুরনো কলম কিনে নিয়ে যান।” কম্পিউটার, মোবাইলের দৌলতে লেখার জন্য কালি-কলমের ব্যবহার সীমিত। তবু হাসপাতাল বন্ধ করে অন্য কারবারে নামেননি তাঁরা। এমনটাই দাবি সামসুদ্দিনের বংশধরদের। 

কলম সারানোর জন্য এখানে হরেক মাপের যন্ত্র রয়েছে। সে সবে পরিবেষ্টিত হয়ে মনোযোগী রিয়াজ ও ইমতিয়াজ বিকল হওয়া কোনও কলমকে গরম করে, কোনওটিকে জলে ডুবিয়ে সারাচ্ছিলেন। তারই ফাঁকে উঠে গিয়ে কাচের আলমারির দরজা খুলে ফেললেন ‘ডাক্তারবাবু’। রোগমুক্তির প্রতীক্ষায় থরে থরে সেখানে রাখা হরেক কলম। তালিকায় রয়েছে উইলসন, পার্কার, শেফার, ম ব্লাঁ-র মতো কলম। ‘‘এই সবে নানা অসুখ বাসা বেঁধেছে। কোনও কোনওটি বেশ পুরনো। দাদু, ঠাকুর্দার বিয়েতে উপহার পাওয়া কলমও আছে। রোগের ধরন কী? ‘‘সে কি আর দু’-তিন রকমের রোগ!’’ হেসে বললেন ইমতিয়াজ। জানালেন, কোনও কালি-কলমের নিব নষ্ট হয়েছে, তো কোনও কলমের চ্যানেল খারাপ হয়ে গিয়েছে, অথবা কলমের টিউব বদলাতে হবে, কোনও কলমে ওয়াশার পাল্টাতে হবে অথবা কোনও কলম এমন জ্যাম হয়েছে যে খোলাই যাচ্ছে না। সবের ওষুধ মেলে সেখানে। ‘‘সেটা আশির দশকের কোনও এক সময়। এক ডাক্তারি ছাত্র হন্তদন্ত হয়ে এলেন। সামনেই পরীক্ষা। হাত থেকে পড়ে প্রিয় কলমের নিব ভেঙে গিয়েছে। চ্যানেল দিয়ে কালি যাচ্ছে না। এ দিকে অন্য কলমে পরীক্ষা তিনি দেবেন না। কয়েক ঘণ্টা সময় চেয়ে সারিয়ে দিয়েছিলাম।’’— ইমতিয়াজের স্মৃতিচারণে উঠে এল। 

এক সময়ে শহরে কলম সারানোর দোকান ছিল অনেকগুলি। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে সে সবের ঝাঁপ নেমেছে।— জানালেন শহরের কলম সংগ্রাহক সব্যসাচী ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “ধর্মতলায় ছিল ভবেশ চক্রবর্তী নামে এক বাঙালির কলম সারানোর দোকান। সেখানে ভাল কলম সারানো হত। কিরণশঙ্কর রোড, নেতাজি মেট্রো স্টেশনের কাছে, কলেজ স্ট্রিটে রয়েছে কলম সারানোর দোকান। অনেক দোকানই অবশ্য কলম সারানোর পাশাপাশি অন্য ব্যবসায় মন দিয়েছে।” 

হাসপাতাল চালাতে চতুর্থ প্রজন্ম কতটা উৎসাহী? উদাসীন রিয়াজ ও ইমতিয়াজ বলেন, ‘‘সে কথা বলতে পারব না। তবে দু’ভাই শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের মুঠি আগলে রাখব।”