‘আ লট ক্যান হ্যাপেন ওভার কফি!’

এমন একটি বাক্য কি কোনও বাক্‌সিদ্ধ ঋষির মুখ থেকে প্রথম বেরিয়েছিল? কথাটা এখন ঘুরপাক খাচ্ছে নাগরিক বাতাসে। বুধবারের কেজো বিকেলে পার্ক স্ট্রিটের ‘কাফে কফি ডে’ (সিসিডি) দেখে আপাত ভাবে গরমিলের ছিটেফোঁটা চিহ্নও চোখে পড়ল না। সেখানকার আধিকারিকেরা বললেন, ‘‘লোকজন খবরে যা দেখছেন বা শুনছেন, আমরাও সেটুকুই জানি! আমাদের আগে যেমন চলছিল, এখনও তেমনই চলছে।’’ শহর জুড়ে এই কফি চেনের নানা শাখায় নিস্তরঙ্গ স্থিতাবস্থার আবহ। তবু আবডালে ফিসফাস-দীর্ঘশ্বাস এবং আশঙ্কার কাঁটা। সিসিডি-কর্ণধার ভিজি সিদ্ধার্থের রহস্য-মৃত্যুর পটভূমিতে তৈরি হয়েছে প্রশ্নমালার আবর্ত! কফি-কর্তার সাম্রাজ্য কি তলে তলে সত্যিই ঝুরঝুরে হয়ে উঠেছিল? এমন প্রশ্নও ঘনিয়ে উঠছে।

একটি বিষয়ে শুধু কোনও ধন্দ নেই। একুশ শতকের যে কোনও মেজো-সেজো ভারতীয় শহরের দিকচিহ্ন হয়ে উঠেছে এই কফি চেনের দোকান। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে বেঙ্গালুরুতে বসবাস করা এক মহিলা বলছিলেন, ‘‘তখনও আমরা যারা স্টারবাক্সের মতো কফি চেন দেখিনি, প্রথম সিসিডি-দর্শন তাদের কাছে একটা বিস্ময়ের অভিজ্ঞতা হয়ে এসেছিল।’’ কলকাতা ‘কফি হাউসের আড্ডা’র শহর। কিন্তু কফি চেনের নিভৃতি তার কাছে তখনও অজানা। সাবেক কেবিনের পর্দায় ঘেরা অন্তরঙ্গতার রোম্যান্স চেখেছে কলকাতা। কিন্তু কফি চেনগুলি যেন নিয়ে এল সপ্রতিভ সাবালকত্বের বার্তা! পুরনো কেবিন বা চায়ের দোকানগুলি কয়েক যুগ ধরে ছিল পুরুষদের মৌরসিপাট্টা। কফি চেনগুলিই প্রথম একা মেয়েদেরও নিজের মতো সময় কাটানোর পরিসর নিয়ে এল।

সিসিডি-র কর্ণধারের মৃত্যুর সূত্রে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে কফি চেনটির সিকি শতকের পথ চলার নানা স্মৃতি। ‘ওখানেই আমার জীবনসঙ্গীর সঙ্গে প্রথম দেখা’— লিখেছেন জনৈক মধ্যবয়সিনী! পার্ক স্ট্রিটের আউটলেটে একা একা আইরিশ কফিতে চুমুক দিতে দিতে প্রৌঢ়া অধ্যাপিকা এ দিন বললেন, ‘‘১৫-২০ বছর আগে ভাল কফি খাওয়ার সুযোগ কলকাতায় বা গোটা দেশেই ছিল না প্রায়! বিদেশে ভাল জাতের কফি চাখার পরে এই কফি চেনগুলিই যা তৃপ্তি দিল।’’

‘‘কফি চেনের আউটলেট তো ল্যাপটপ খুলে কাজেরও জায়গা!’’— বলছিলেন অভিনেতা-পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘‘এমনিতে কফি চেনের কফি আমার একটু একঘেয়ে লাগে! তার থেকে সিঙ্গল কফি শপগুলোই ভাল! তবে লেক অ্যাভিনিউ বা গল্ফ গার্ডেনের সিসিডি-তে হঠাৎ দরকারে ঢুকে কত কেজো আলোচনায় বসেছি।’’ কফি চেনগুলি সবে জাঁকিয়ে বসার দিনে পাড়ার ‘কার্তিকের চায়ের দোকান’ নিয়ে শোকগাথা গানে বেঁধেছিলেন কবীর সুমন। বারবার 

পুলিশি বুলডোজ়ারে উচ্ছেদ হওয়া কার্তিকের দরমা ঘেরা দোকানঘর অসম যুদ্ধে ঝকঝকে কফি শপের কাছে হেরে যাবে, এটাই তখন ভবিতব্য ধরা হয়েছিল। ভিজি সিদ্ধার্থের ঘটনাটি কিন্তু সেই ছকটাও উল্টে দিয়েছে। পরমব্রত থেকে চেনা-অচেনা কাফেরসিকও এই পরিণতিতে হতবাক! কেউ কেউ গম্ভীর মুখে বলছেন, ‘‘সিসিডি ব্যাঙের ছাতার মতোই শহর জুড়ে গজাচ্ছিল। ওদের মালিকের এমন দশা হবে, কখনও ভাবিনি।’’

কফির পেয়ালা দামে ভারী। কিছু সময়ে তার নামডাকের প্রতি সুবিচারও করতে পারেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। তবু নাগরিক জীবনে সিসিডি গোত্রের কফি চেনের উপযোগিতা নিয়ে দ্বিমত নেই। অঘটনের পরেও আপাতত এই কফি চেন বহাল আছে যথারীতি। তবু কফিগন্ধী চেনা কবিতার মানেও এখন পাল্টে যাচ্ছে। কেন যে লেখা হয়েছিল, ‘কেবল মুঠোয় বন্দি কফির একলা কাপ/ ডিপ্রেশনের বাংলা জানি, মন খারাপ।’