বহু বছর ধরে কাজ করছেন মহম্মদ আলি। কিন্তু কখনও এমনটা হয়নি। উপরের ঘরে আলাদা কন্ট্রোল রুম—কে ঢুকল, কে বেরোল, 

তার প্রতি মুহূর্তের ফুটেজ টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠা! প্রবেশপথের মুখেই তিন-তিনটি সিসি ক্যামেরা। সব মিলিয়ে একদম আলাদা পরিস্থিতি। তাতে অবশ্য আলি খুশি।

‘‘খুব দরকার ছিল বুঝলেন। এখানে এত লোক হয় যে কী বলব! শবে-বরাতেই তো মজসিদ পুরো ভর্তি ছিল।’’— বলছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব আলি। অনেক দিন হল নাখোদা মসজিদের নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করছেন তিনি। এখন তাঁর নতুন ‘সঙ্গী’ সিসি ক্যামেরাগুলি।

মসজিদ সূত্রের খবর, মাস খানেক হল পুরো মসজিদ চত্বর জুড়ে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। মসজিদের সার্বিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও নজরদারির বিষয়টি তো রয়েছেই। কিন্তু মসজিদের ট্রাস্টির সদস্যদের একাংশ জানাচ্ছেন, আসলে সিসি ক্যামেরা লাগানোর এই সময়টি ভীষণ ‘তাৎপর্যপূর্ণ’! কারণ, এটি নির্বাচনের সময়। এমনিতেই প্রতি বছর নির্বাচনে মসজিদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীর আগমন বেড়ে যায়, তাঁদের সঙ্গে-সঙ্গে অনেক অনুগামীও থাকেন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই সাধারণ সময়ে মসজিদ চত্বরে যা ভিড় থাকে, নির্বাচনের সময়ে সে ভিড় কিছুটা বেড়ে যায়। 

কিন্তু ভিড় বাড়ার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল যাঁরা আসছেন, তাঁরা ‘ভিআইপি’। ফলে ভিড়ে অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, তাই এই সিসি ক্যামেরার আয়োজন। তা ছাড়া বেশ কিছু দিন আগে মসজিদের চার তলায় একটি দুর্ঘটনাও ঘটেছিল। এর পর থেকেই মসজিদ চত্বরের সুরক্ষা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলেন কর্তৃপক্ষ। নির্বাচনী মরসুম শুরু হতে না হতেই শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত করা হয়েছে।

বর্তমানে মসজিদের প্রবেশদ্বার, মূল চত্বর, সিঁড়ি তো বটেই, এমনকি, জেনারেটর রুম, গুদাম, দোতলা, তিনতলা-সহ পুরোটাই ক্যামেরার নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। একমাত্র মিনারের তলা বাদ দিয়ে (কারণ, তা বেশির ভাগ সময়ে তালাবন্ধই থাকে) মসজিদ জুড়ে ‘ক্যামেরা-চোখ’! মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছেন, শুধু নমাজ পড়ার সময়টুকু ছাড়া বিনা অনুমতিতে কেউ উপরেও যেতে পারেন না এখন।

অতীতে নাখোদা মসজিদ তৈরি ও পরবর্তীকালে তার সংস্কারের পিছনে গুজরাতের কচ্ছের মেমন সম্প্রদায়ের যে পরিবারগুলির সর্বাধিক অবদান রয়েছে, সেই পরিবারেরই অন্যতম উত্তরসূরি মহম্মদ ইকবাল বলছিলেন, ‘‘নির্বাচনের সময়ে নেতা-নেত্রীরা আসেন মসজিদে। তাঁদের সঙ্গেও অনেকে আসেন। এমনিতেই মসজিদে সারাক্ষণ ভিড় থাকে। নিরাপত্তার সঙ্গে আমরা কোনও আপোস করতে চাইনি। তাই মসজিদ চত্বর জুড়ে ২৪টি সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।’’

তবে রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীরা এলে কী হবে, কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই প্রত্যক্ষ ভাবে নিজেদের 

জড়াতে নারাজ নাখোদা মসজিদ কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের মতো নেতারা আসতেই পারেন। অনেক নেতাদের সঙ্গেই নাখোদা ট্রাস্টির সদস্যদের যথেষ্ট ‘হৃদ্যতা’ও রয়েছে। কিন্তু সেটা ব্যক্তিগত স্তরে। নাখোদা মসজিদের ট্রাস্টির এক সদস্য বলেন, ‘‘নাখোদা মসজিদের কেউ যদি কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনও কথা বলেন বা মত দেন, সেটা তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। আমাদের সঙ্গে সে সবের কোনও যোগই নেই। কারণ, রাজনীতি রাজনীতির জায়গায়। ধর্ম, ধর্মের জায়গায়।’’

বাইরে চড়া রোদ। দু’এক জন তার মধ্যেই জুতো খুলে প্রবেশ করছেন মসজিদে। প্রবেশদ্বারের ছায়ায় চেয়ারের উপরে বসে মহম্মদ আলি বলছিলেন, ‘‘এই যে আগে যেমন জানার উপায় ছিল না কে কখন ঢুকছেন, কে বেরোচ্ছেন, এখন সব ধরা থাকছে। তাই অনেকটাই নিশ্চিন্ত।’’ কথাটুকু বলে ভিতরের দিকে তাকালেন আলি। মসজিদের ভিতরে শান্ত, নিঝুম, ঠান্ডা বিশাল ঘরে তখন অনেকে শুয়ে। নিশ্চিন্তের ঘুম।

শুধু মসজিদের সিসি ক্যামেরার চোখ তখনও ‘সজাগ’!