যাবতীয় বাধার দেওয়াল সত্ত্বেও তাকে ঘিরে জনগণের উদ্দীপনা কমার নামগন্ধ নেই। ছবির প্রদর্শন ঘিরে সব রকম চোখরাঙানি এখন ইতিহাস। সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর ‘পদ্মাবত’ বক্স অফিসে আদায়ের নিরিখে হেসেখেলে ২৫০ কোটির ক্লাবে ঢুকে পড়েছে।

কলকাতা বইমেলার গলিঘুঁজির ভিতরে একটি ছোট স্টলে পর্যন্ত বিতর্কিত এই সিনেমা ঘিরে উচ্ছ্বাসের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে। এ যাত্রা শিকে ছিঁড়েছে এশিয়াটিক সোসাইটির বরাতে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশনা-সচিব রামকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় হাসছেন, ‘‘কী কাণ্ড! মুম্বইয়ের নামী সিনেমার সুবাদে আমাদের বার করা বইটারও কপাল খুলে গেল।’’ বই বলতে এখানে ৫০০ বছরেরও পুরনো মহাকাব্য ‘পদ্মাবত’-এর কথা বলা হচ্ছে। একেলে বলিউডি সংস্করণ ঘিরে তপ্ত রাজনীতির সুবাদে ১৫৪০ সালে লেখা, সুফি কবি মালিক মহম্মদ জ্যায়সির ধ্রুপদী মহাকাব্যের উপরেও আলো এসে পড়েছে। সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর সিনেমাটি জ্যায়সির ‘পদ্মাবত’ থেকেই আহৃত বলে দাবি করা হয়েছে। এশিয়াটিক সোসাইটি-র প্রকাশিত সেই বইয়ের সব কপি এ বার মেলা শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে গিয়েছে। তার পরেও লোকে খোঁজ করছে। বইমেলার শেষ দিনে রামকৃষ্ণবাবু বলছিলেন, ‘‘সিনেমার কল্যাণে পুরনো বই যদি জনপ্রিয় সাহিত্য হয়ে ওঠে, খারাপ বলতে পারব না।’’ এ বার ফের নতুন একটি মুখবন্ধ লিখে বইটি প্রকাশের কথা ভাবছেন তাঁরা।

আওয়াধি-হিন্দিতে লেখা সুফি কবির মহাকাব্য বহু কাঠখড় পুড়িয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ করিয়েছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃপক্ষ। ভাষাতত্ত্ববিদ গ্রিয়ারসন ও আওয়াধি হিন্দি বিশারদ সুধাকর দ্বিবেদী মিলে ১৮৮৯ সালে পদ্মাবত অনুবাদ প্রকল্পে হাত দেন। ২২ বছরে পুরো বইটার কাজই শেষ হয়ে আসছিল। কিন্তু, সুধাকরের মৃত্যুতে ছন্দপতন। উত্তরপ্রদেশের সুফি কবির লেখা মহাকাব্য অনুবাদ তখন থমকে গিয়েছিল। ফের উত্তরপ্রদেশের সুলতানপুরের কমিশনার শিরেফ ‘পদ্মাবত’-এর অনুবাদে উদ্যোগী হন। গ্রিয়ারসনের অনুবাদ-কাজটি তাঁর চেষ্টায় শেষ হয় ১৯৪৩-এ। পরের বছর বইটি বার করে এশিয়াটিক সোসাইটি। ২০১২ সালে সেই অনুবাদই নতুন করে বার করা হয়। কিন্তু ছ’বছরে বিক্রি হচ্ছিল ঢিমেতালে। সারস্বত সমাজের বাইরে বইটি নিয়ে কারও তেমন আগ্রহই ছিল না। বইমেলায় এক ধাক্কায় ছোট স্টলটি খুঁজে বইটির শেষ ৪০ কপি হু হু করে নিঃশেষ।

রামকৃষ্ণবাবু বলছিলেন, ‘‘সিনেমাটি ঘিরে বিতর্কের পটভূমিতে জ্যায়সির ভাবনা-দর্শন নিয়ে আলোচনাসভা আয়োজনের কথা ভাবছিলাম। তার আগেই বইটি ফুরিয়ে গেল।’’ তবে বলিউডের ‘পদ্মাবত’ দেখে তিনিও খুশি নন। সিনেমায় ভিলেন আলাউদ্দিন খিলজির এমন দাপট, জ্যায়সিতে নেই। জ্যায়সির ‘পদ্মাবতী’তে খিলজির সঙ্গে মেবারের যুদ্ধ থাকলেও সুফি ভাবনার আলোকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সুরটি অটুট। সাবেক মহাকাব্যে পণ্ডিতদের কারও কারও নিশ্চিন্তি, বইটা পড়লে আসল কাহিনিটা অন্তত লোকে জানবে।