মেয়েকে আড়ালে রেখেই সব আলোচনা করতে হচ্ছে বাবাকে। রাজাকে অন্য কোথাও রেখে আসার কথা হচ্ছে, তা কোনও ভাবে বুঝলেই প্রবল চিৎকারে কান্না শুরু করছে বছর আটেকের চৈতালী। প্রিয় বন্ধুকে কিছুতেই কাছছাড়া করতে চায় না সে। রাজাকে খাইয়ে দেওয়া, ক্ষতে ওষুধ লাগিয়ে দেওয়া, সবই নিজে হাতে করছে চৈতালী। আর রাস্তা থেকে তুলে আনা অসুস্থ কুকুরকে নিয়ে মেয়ের জেদের সামনেই বিড়ম্বনায় পড়েছেন চৈতালীর বাবা বিমল মণ্ডল!

তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়া চৈতালী আর রাজার পরিচয় মাত্র তিন দিনের। উল্টোডাঙায় কলকাতা সশস্ত্র পুলিশের কার্যালয় ‘ফিফথ ব্যাটেলিয়ন’ সংলগ্ন বস্তিতে গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকান বিমলের। গত শুক্রবার দোকানে বসে বিমল দেখেন, একটি জার্মান স্পিৎজ় কুকুর নিয়ে হেঁটে আসছে মেয়ে। বাবাকে সে বলে, ‘‘এই কুকুরটা সকাল থেকে এখানে ঘুরছিল দেখো। আমি নিয়ে এসেছি। ও ব্যথা পেয়েছে। রক্ত পড়ছে।’’ বিমল দেখেই বোঝেন, অসুস্থ পোষ্যটিকে কেউ রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে গিয়েছেন। ঘাড়ের কাছে এবং কোমরের দিকে কুকুরটির গভীর ঘা রয়েছে। ধুঁকতে থাকা প্রাণীটির দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

বিমলের দোকানেই এর পরে থাকার ব্যবস্থা হয় কুকুরটির। বাড়ি থেকে আনা মলম ঘায়ে লাগিয়ে কুকুরটির প্রাথমিক শুশ্রূষা শুরু করেন বাবা-মেয়ে। তখনই চৈতালী সদ্য পাওয়া ‘বন্ধু’র নাম দেয় রাজা। বিকেলের পরে এলাকার এক পশু চিকিৎসক গিয়ে রাজার চিকিৎসা করে আসেন। সেই থেকে চৈতালীর কাছে রয়েছে রাজা। রাতেও নতুন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়েই সে ঘুমিয়েছে বলে জানাচ্ছেন তার বাবা। শুক্রবার চিকিৎসকের পরামর্শে হালকা খাবার দেওয়া হলেও শনিবার রাজাকে দু’বেলাই মাংস দেওয়া হয়েছে। রবিবার ব্যবস্থা হয়েছে মুরগির ‘লেগ পিস’-এর। তবে এখন বিমলের বড় চিন্তা, নতুন অতিথিকে তাঁরা সঙ্গে রাখবেন কী করে! বিমল বলছেন, ‘‘আমাদের নিজেদেরই থাকার জায়গা নেই। এ দিকে, মেয়ে জেদ ধরেছে। কিন্তু কুকুরটাকে আমরা রাখব কী করে! বিদেশি কুকুর। ওকে রোজ ভালমন্দ খাওয়ানোর মতো টাকা আমাদের নেই।’’

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

বাবা যা-ই বলুন, একরত্তি মেয়ের কথা শুনে অনেকেই বলছেন, এখনও এ শহরে মানবিকতার বীজ রয়েছে। মনোবিদেরা বলছেন, যত্ন নিলে ওরাই হবে ভবিষ্যতের দৃষ্টান্ত! তাঁদের মনে পড়ে যায়, মাস কয়েক আগে এই শহরেই শোরগোল পড়েছিল সরকারি হাসপাতালে ১৬টি কুকুরছানাকে পিটিয়ে মারার ঘটনায়। গ্রেফতার হতে হয়েছিল দুই নার্সিং পড়ুয়াকে। 

রবিবার দুপুরে গিয়ে দেখা গেল, ‘ফিফথ ব্যাটেলিয়ন’ সংলগ্ন ঝুপড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে ছোট্ট ঘরে থাকে চৈতালী। একটি চৌকি এবং একটি আলমারি ছাড়া সেখানে আসবাব বিশেষ নেই। তার মধ্যেই খাটের নীচে রাজার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যদিও দুপুরের ওই সময়ে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে ঝুপড়ির এক ফাঁকা জায়গায়। চৈতালীই পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল সেখানে। রাজা রাজা ডাক শুনে চৌকির তলা থেকে বেরিয়ে এল সে। গায়ের ক্ষত তখনও টাটকা। তবে দু’বেলার শুশ্রূষায় খানিক শ্রী ফিরেছে। বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট মেয়ে বলল, ‘‘রাজা আমার সঙ্গেই থাকবে। আমার সঙ্গে স্কুলে যাবে। জন্মদিনে আমরা কেক কাটব।’’ বন্ধুর নাম রাজা কেন? জবাবে শুধুই হাসি মেয়ের মুখে!

পাশে দাঁড়ানো চৈতালীর বাবা এ বার বলেন, ‘‘আগামী রবিবার মেয়ের জন্মদিন। রাজাকে সে দিন ওর চাই-ই চাই।’’