কলকাতা কি পুরোপুরি ‘বাম-শূন্য’ হয়ে গেল
এই শহরের যে একটা বামপন্থী ভাবমূর্তি ছিল, তা কী ভাবে মিলিয়ে গেল? 
BJP

বদল: শহরে বেড়েছে বিজেপির ভোট। বৃহস্পতিবার, মহাত্মা গাঁধী রোডে সমর্থকেরা। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক

আমাদের চারপাশটা যে বদলে গিয়েছে, সে কথা মুখে মুখেই ঘুরছে। 

তবে ‘চারপাশ’ বলতে ঠিক কী বুঝতে চাই আমরা? 

আলোচনার খাতিরে ধরে নিলাম, নিজের চেনা শহরটা বদলে যাওয়ার কথাই হচ্ছে। এই শহরটার ঠিক কী বদলেছে? অনেকেই আপাত ভাবে বলতে পারেন, লোকগুলি বদলে গিয়েছেন। তা তো ঠিক নয়। শহরবাসীরা তো বদলে যাননি। তবে কি রাজনীতির ভাষা বা ভোটপ্রচারের ধরন বদলেছে? তার জন্যই এমন পরিবর্তন? অনেকেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন, অবাঙালি ভোটারেরা নাকি এ শহরে বিজেপি ভোট বাড়াতে সাহায্য করেছেন। কিন্তু তাঁরা তো রাতারাতি আসেননি। এ শহরে অবাঙালিরা অনেক দিন ধরেই রয়েছেন। থাকবেনও। হঠাৎ তাঁদের দিকে আঙুল তুলে কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। 

তবে এই শহরের যে একটা বামপন্থী ভাবমূর্তি ছিল, তা কী ভাবে মিলিয়ে গেল?   

এ শহরের বহু মানুষের অনুমান, এখানকার সব বাম ভোট চলে গিয়েছে বিজেপি-র দিকে। হয়তো খানিকটা গিয়েছে। কিন্তু তা দিয়ে শহরের মন বোঝা যায় না। মূল প্রশ্ন হচ্ছে এই যে— এ ভাবে বাম ভোট বিজেপি-তে যাওয়া কি একটা স্থায়ী প্রবণতা হয়ে গেল? আগে যাঁরা বাম ভোটার ছিলেন, তাঁরা অনেকেই হয়তো তৃণমূলকে সরানোর জন্য বিজেপি-কে ভোট দিয়েছেন। তবে যত দূর মনে পড়ে বাম নেতারা কেউ প্রকাশ্যে সমর্থকেদের উদ্দেশে বলেননি যে, বিজেপি-কে ভোট দিতে হবে। অর্থাৎ, এমনটা ভাবা যেতেই পারে যে, কিছু বাম ভোটার নিজেদের নিরুপায় ভেবে এ বার বিজেপি-র দিকে ঝুঁকেছেন। তবে বরাবর এমনটা ‘নিরুপায়’ ভাব কিন্তু থাকতে পারে না। শহরটা কি পুরোপুরি ‘বাম-শূন্য’ হয়ে গেল, তা বুঝতে পরের ভোটের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে।  

প্রশ্ন উঠতেই পারে যে বামপন্থীরা তৃণমূলকে ভোট দিতে না চাইলে নোটা-তে দিলেন না কেন? এ প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক নয়। তবেই তো এ ভাবে বদলে যেত না এ শহরের সেই ‘বামপন্থী’ চরিত্রটা। তা হলেও তো বুঝিয়ে দেওয়া যেত যে, এ শহরের একটা অংশ রাজ্যের শাসক দল এবং দেশের শাসক দলের কোনওটিকেই পছন্দ করে না। 

এ ক্ষেত্রে একটা কথা আমাদের সকলের মাথায় রাখা প্রয়োজন যে, শাসক সাধারণত নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে। বামপন্থীরা ৩৪ বছর শাসন করে তার পরে তৃণমূলের কাছে হারল। আসলে কি তৃণমূলের কাছে হেরেছিল, না কি হেরেছিল নিজেদের কাছেই? তাদের কিছু ভুল, কিছু প্রতিশ্রুতি রাখতে না পারা— সবই কাজ করেছে। সে সব যে এখনও অনেকেই ভুলে যাননি। তৃণমূলের ক্ষেত্রেও এখন তেমনই ঘটছে। চমকে-ধমকে করানো ভোট কি কখনও চিরকালীন হয়? তার উপরে যোগ হয়েছে আরও একটা দিক। বামপন্থীরা শ্রেণির কথা বলে, দেশের কথা তো বলে না। এখন চারদিকে দেশপ্রেমের জোয়ার। এ শহরের অনেকেই কিন্তু এ বার ভাবছেন, দেশের কথা আমরাও ভাবব না কেন? তবে কি বামেরা আর বাম থাকলেন না? বিজেপি-তে চলে গেলেন চিরতরে? তা-ও শুধু দেশভক্তি আর শ্রেণি বিভাজনের দ্বন্দ্বের কারণেই? 

সমীকরণটা হয়তো অতটাও সরল নয়। কিছু দিক থাকে, যা দলগত মত এবং বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে। যেমন কর্মসংস্থানের চিন্তা, নিরাপত্তা নিয়ে ভাবনা। মোদী সরকার কি আগের দফায় সবটা দিতে পেরেছিল, তাই জন্য কলকাতাও ঝুঁকল সে দিকে? এ শহর কি টিভি-তে দেখেনি হাজার হাজার কৃষকের সেই মিছিল? তবুও তো চাকরি চাই। অনেকেরই আশা, স্থায়ী সরকার থাকলে কিছু ভাল হবে। আরও একটি দিক খেয়াল রাখতে হবে এ ক্ষেত্রে। অনেকেই বলবেন, বিজেপি-কে মুসলমান সম্প্রদায়ের কোনও মানুষ ভোট দেন না। এ কথা কিন্তু ঠিক না-ও হতে পারে। এক জন মুসলমানও ভোট না দিলে এমন ফল হয় না। বরং খেয়াল রাখা দরকার, সকলেরই সকলকে প্রয়োজন আছে। ফলে কোনও সরকার এসেই সবটা বদলে দিতে পারে না। দেবেও না। সেটা মুসলমান ভোটারেরাও জানেন। বরং তাঁদেরও হয়তো কারও কারও বিশ্বাস অন্য দলের থেকে এ দলের দিকেই ঝুঁকেছে বেশি। সব মিলিয়েই হয়তো এ শহরের বামপন্থী ছবিটা বদলে গিয়েছে। 

তবে এ বদলটা কত দিনের, সেটাই এখন দেখার। কিছু দিন পরেই বিধানসভা নির্বাচন আসছে। কলকাতার ভোটারদের চরিত্রটা সত্যি বদলে গেল, না কি এটা সাময়িক লক্ষণ, তা বলে দেবে সেই নির্বাচনের ফল। 

(লেখক সমাজতত্ত্বের শিক্ষক, মতামত ব্যক্তিগত)

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত