• সোমা মুখোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

‘বেপাত্তা’ ছেলে, ঠাঁইহারা বৃদ্ধা কখনও পথে, কখনও হাসপাতালে

তাঁর ঠিকানা তাই ফুটপাথ!

অথচ সন্তান রয়েছে বৃদ্ধার। ভিন্‌ রাজ্যে থাকা সেই সন্তান অসুস্থ মাকে নিজের কাছে নিয়ে গেলেও কিছু দিন পরে ফের হাওড়াগামী ট্রেনে তুলে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ প্রতিবেশীদের। আর তার পর থেকেই দরজায়-দরজায় ঠোক্কর খাওয়া শুরু। সব মিলিয়ে অশীতিপর এই বৃদ্ধা একটা বড়সড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন সকলকেই— সমাজের আশ্রয়হীন বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা তা হলে কোথায় যাবেন? তবে কি ফুটপাথই তাঁদের একমাত্র আশ্রয়?

কলকাতা হাইকোর্ট একাধিক বার বলেছে। ভারতীয় আইনেও স্পষ্টই বলা রয়েছে— নিজের সন্তান তো বটেই, এমনকী সৎ ছেলেমেয়েকেও বাবা-মায়ের দেখভালের ভার নিতে হবে। তবু সোমবার সন্ধ্যা থেকে পিংপং বলের মতো এক বার হাসপাতালের শয্যা থেকে ফুটপাথ, সেখান থেকে এক ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত বাড়ির কোণ, আবার সেখান থেকে হাসপাতালের শয্যা— এ ভাবেই ঠোক্কর খেয়ে চলেছেন ৭০ বছরের লীনা রায়। এর-তার তাচ্ছিল্য, পোকামাকড়ের কামড়, পেট-জোড়া খিদে আর অসুস্থ শরীর নিয়ে তাঁর এই টানাপড়েন অস্বস্তিতে ফেলছে প্রতিবেশী, পুলিশ, এমনকী হাসপাতাল কর্মীদেরও। সমাধানের পথ জানা নেই কারও। কারণ আশ্রয়হীনেরা যদি হাসপাতালের শয্যা আটকে পড়ে থাকেন, তা হলে ভর্তির সুযোগ হারাবেন অন্য রোগী। দুঃস্থদের জন্য সরকারি হোম রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানেও থাকার ব্যবস্থা সীমিত।

গত কয়েক দশক ধরে টালিগঞ্জের রসা রোড এলাকায় একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন লীনা দেবী। ছেলে বহু বছর ঘরছাড়া। প্রতিবেশীদের দাবি, তিনি কর্মসূত্রে ভিন্‌ রাজ্যে থাকেন। সামান্য সঞ্চয় নিয়ে প্রতিবেশীদের দেখাশোনাতেই কোনও মতে দিন গুজরান হতো লীনাদেবীর। বছরখানেক আগে ডাকঘরে টাকা তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন বৃদ্ধা। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার চেষ্টায় তাঁকে ভর্তি করা হয় বাঙুর হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসায় সেরে উঠলেও কার্যত চলাফেরার ক্ষমতা হারান তিনি। পুলিশ ফরিদাবাদে তাঁর ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্রতিবেশীদের দাবি, ছেলে এসে ডাকঘর ও ব্যাঙ্ক থেকে মায়ের যাবতীয় সঞ্চয় তুলে নেন। তার পরে বাড়ির জিনিসপত্র বিক্রি করে মাকে সঙ্গে করে নিয়ে যান। জানিয়ে যান, মা এ বার থেকে তাঁর কাছেই থাকবেন। ‘মাসিমা’র একটা হিল্লে হল, ভেবে স্বস্তির শ্বাস ন‌েন প্রতিবেশীরাও।

কিন্তু ওই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। চলে যাওয়ার মাস তিনেকের মধ্যেই এক বিকেলে ফের কয়েক জন লোক এসে বৃদ্ধাকে ফের ওই বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে যান। কথা বলে পাড়ার লোকেরা জানতে পারেন, হাওড়া স্টেশনের এক ধারে বৃদ্ধাকে কান্নাকাটি করতে দেখেছিলেন তাঁরা। বৃদ্ধাই তাঁদের জানিয়েছিলেন, ছেলে তাঁকে টিকিট কেটে হাওড়ার ট্রেনে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। কপর্দকশূন্য অবস্থায় স্টেশনে নেমে তাঁর কোথাও যাওয়ার ছিল না। শেষ পর্যন্ত কয়েক জন যাত্রী দয়াপরবশ হয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলে, ঠিকানা জেনে তাঁকে রসা রোডে পৌঁছে দেন।

এর পরে কিছু দিন পাড়ার লোকেদের আশ্রয়েই ছিলেন লীনাদেবী। ফের অসুস্থ হয়ে পড়ায় মাস কয়েক আগে স্থানীয়েরাই যাদবপুর থানায় খবর দেন। তাঁরাই ফের বৃদ্ধাকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সোমবার রাতে হঠাৎই হাসপাতাল থেকে কয়েক জন কর্মী হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির কর্মীদের তত্ত্বাবধানে বৃদ্ধাকে ওই পাড়ার এক ধারে ফেলে রেখে যান। যে বাড়িতে লীনাদেবী ভাড়া থাকতেন, তারই পাশে ‘বিপজ্জনক বাড়ি’ হিসেবে পুরসভার দ্বারা চিহ্নিত একটি বাড়ির একতলায় একটা ভাঙাচোরা জায়গায়, পোকামাকড়ের মধ্যে কোনও মতে কয়েক ঘণ্টা বসেছিলেন বৃদ্ধা। পাড়ার লোকেরাই ফের থানায় খবর দেন। কেন এক জন অসুস্থ বৃদ্ধাকে রাতবিরেতে এ ভাবে রাস্তায় ফেলে দিয়ে যাওয়া হল, তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তাঁরা। পুলিশের কাছে বৃদ্ধার ছেলের যে ফোন নম্বর ছিল, তাতে ফোন করে দেখা যায় সেটি বন্ধ। লীনাদেবী ছেলের ঠিকানা জানাতে না পারায় অন্য কোনও ভাবে যোগাযোগ করা যায়নি।

রাতেই ফের পুলিশ এসে বৃদ্ধাকে আবার বাঙুর হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে যায়। আপাতত সেখানেই ভর্তি রয়েছেন তিনি। প্রশ্ন হল, যদি ফের হাসপাতালেই ভর্তি করা হবে, তা হলে তাঁকে ছুটি দেওয়া হল কেন? হাসপাতালের এক কর্মী বলেন, ‘‘দিদাকে নামাতে এসে আমাদেরও কষ্ট হচ্ছিল। বুঝতেই পারছিলাম, এটা ওঁর বাড়ি নয়। এখানে নামানো আর রাস্তায় ফেলে দেওয়া একই। বিবেক দংশন হচ্ছিল। উনি আবার হাসপাতালে ফিরে আসায় স্বস্তি পেলাম। কিন্তু কত দিন এ ভাবে উনি বেড আটকে থাকতে পারবেন, তা তো জানি না।’’ কর্মীরা জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত হয়েছে এ ভাবে শয্যা আটকে রাখা যাবে না। হাসপাতালের খাতায় যাঁদের ঠিকানা লেখা থাকবে, তাঁদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসা হবে।

এই সিদ্ধান্তের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন বাঙুরের সুপার তাপস ঘোষ। তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, এই মুহূর্তে এখানে এমন ১০০ জন ভর্তি আছেন, যাঁদের বাড়ির লোক ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না। শয্যা আটকে রয়েছে। গুরুতর রোগীকে ঠাঁই দেওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে কেউ যদি নিজের ঠিকানা জানিয়ে স্বেচ্ছায় বাড়ি যেতে চান, তা হলে তাঁকে আমরা বাড়ি পাঠাব না কেন?’’

প্রশ্ন উঠেছে— কোথায় নামানো হচ্ছে, সেখানে আদৌ কেউ রয়েছেন কি না, তা না জেনে স্রেফ নিজেদের এড়ানোর জন্য কি এ ভাবে রাস্তায় ফেলে দেওয়া যায়? নাকি যাঁর পরিবার তাঁর কোনও দায় নেয়নি, হাসপাতালেরও তাঁর উপরে কোনও দায় থাকার কথা নয়? সুপার জানিয়েছেন, বৃদ্ধার বাড়িতে কেউ নেই তা তাঁর জানা ছিল না।

কেন পুলিশের তরফে সমাজকল্যাণ দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বৃদ্ধার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হল না? পুলিশ জানায়, বৃদ্ধা সুস্থ নন, তাই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করাটাই তাদের দায়িত্ব। এর পরে কিছু করার থাকলে সেটা হাসপাতালের করার কথা। সমাজকল্যাণ দফতরের কর্তারাও জানান, হাসপাতালের তরফে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা এ ব্যাপারে বিবেচনা করতে পারেন। কেন হাসপাতাল তা করল না? সুপারের জবাব, ‘‘মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে এই ধরনের রোগীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছি। সমাজকল্যাণ দফতরের সঙ্গেও কথা বলব। তবে ওই বৃদ্ধাকে যে দেখার কেউ নেই, তা জানতাম না। সেই কারণেই এই সমস্যাটা হয়েছে।’’

হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে সবই শুনেছেন লীনাদেবী। কোনও কথা না বলে ফ্যালফেলিয়ে সকলের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন শুধু। বহু বার প্রশ্ন করার পরে জানিয়েছেন, তাঁর কোনও মতামত না নিয়ে, তাঁকে কোনও কিছু না জানিয়েই হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সোমবার। তার পরে তাঁকে ওই পাড়ায় নামিয়ে দেওয়া হয়। বৃদ্ধার কথায়, ‘‘প্রত্যেকের কাছে এই অপমান, এই গঞ্জনা আর সহ্য হয় না। এখন মরলেই আমার সব যন্ত্রণা মিটতে পারে।’’

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন