এমনিতে ফলাহারী মা কালী। তবে এক বারটি কোন টিভি চ্যানেলের আবদারে নুড্‌ল্‌স-চপসুয়ের উপচারের সামনেও ‘পোজ’ দিতে রাজি হয়েছিলেন।

এ কালীপুজোয় এক বোতল সস্তার রামও সেবায় লেগেছে তাঁর।
মায়ের প্রধান সেবক বছর ৬৫-র চেং ইয়ি শেং গম্ভীর মুখে বোঝান, বছরে এই এক বারই! কালীর কারণসেবার রীতিটুকু অন্তত ভালই জানেন চাইনিজ-ইন্ডিয়ান বৃদ্ধ। এ মন্দিরে মাংসের স্পর্শ না ঘটলেও প্রতি কালীপুজোয় সস্তার রাম হুইস্কি নিবেদনে ভাটা নেই।

৬০, ৬৫ না ৮০ বছর কে জানে, কলকাতার চিনেপাড়া ট্যাংরার জীবনচর্যায় অঙ্গাঙ্গী এই পুঁচকে মন্দির। কে, কী ভাবে মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন, সে ইতিহাস অবান্তর। মন্দিরের পৃষ্ঠপোষকেরা বদলে যান কয়েক বছর অন্তর। কলকাতা ছেড়ে বিলেত-আমেরিকা কি কানাডায় পাড়ি জমান অনেকেই। তবু অ্যাসবেস্টসের চাল থেকে পাকাবাড়ি— পুঁচকে মন্দিরটির স্বাস্থ্য দিন দিন খোলতাই হচ্ছে।

বাঙালি বামুন পুরোহিত নিত্যপুজো সারেন। কিন্তু ট্যাংরার চাইনিজ মা কালীর অভিভাবক চিনা পড়শিরাই। মন্দিরের কেয়ারটেকার চেং ইয়ি শেং-এর বউ-মেয়েরা কানাডায়। নিজেও আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন ধাপা এলাকার এই বাসিন্দা বন্ধ ট্যানারির মালিক। যে কোনও কারণেই হোক, কলকাতা ছেড়ে থাকা ঠিক পোষায়নি তাঁর। দশ বছর হল, ফিরে এসে মন্দিরের দেখভালের ভার নিয়েছেন। ‘‘আমার শরীর সুস্থ থাকলে, কারও মেজাজ সহ্য করব না! মন্দিরের কাজের জন্য কাউকে তোয়াজও করব না!’’— কালীপুজোর আগের বিকেলে গজগজ করছিলেন চেন। পাশে রাস্তার কল থেকে বালতি করে জল এনে সাবানগুঁড়ো ছিটিয়ে মন্দির তকতকে করে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন বৃদ্ধ। কালীপুজো বলে কথা! বাঙালির শ্যামাপূজার সন্ধ্যায় এই মন্দিরই আলোর মালায় ঝকমক করবে। চেং সগর্বে বলেন, ‘‘মন্দিরের নিজস্ব ইলেকট্রিক লাইন! এদিক-ওদিক থেকে কারেন্ট টেনে আলো জ্বালানো হয় না!’’ অজস্র চিনা মেয়ে-বউরা এসে লালরঙা ধুপ জ্বালবেন মায়ের উদ্দেশে। মন দিয়ে প্রার্থনা করবেন দাঁড়িয়ে।

চেং নিজে বুদ্ধগয়ায় যান প্রতি বছর। আবার কালীঘাটেও গিয়েছেন। এ তল্লাটের লোকেদের দেখাদেখি মনে মনে যিশুকেও ডাকেন। আবার দুর্গা-শিব-হনুমানজী-বাবা লোকনাথ— সব তাঁর চেনা। মা কালীর প্রতি এত টান কিসের? শুনে মুখ ভেটকে বলেন, ‘‘ধুত্তেরি, গড ইজ গড। নামে কী আসে যায়!’’ মন্দিরের উল্টোদিকে কিম ফা রেস্তোরাঁর মালিকের স্ত্রী শুং ইন তখন মা কালীকে ঢিপ করে নমস্কার ঠুকে যাচ্ছেন। মন্দিরের পাশের বাড়ির বাসিন্দা ফোরিয়া চুং দেখান, ‘‘ওই যে কালীর ছোট মূর্তিটা বছর ৪০ আগে এসেছে। তখন আমার ১৪-১৫ বছর বয়স।’’ এখানে দু’টো কালীমূর্তি, লাল শাড়িতে সাজানো। এ ছাড়া, শিব থেকে হনুমান— সক্কলে রয়েছেন।

স্থানীয় রেস্তোরাঁর দারোয়ান, সোনারপুরের যুবক রামপ্রসাদ মণ্ডল বলেন, ‘‘রীতিমতো জাগ্রত কালী! এলাকার মেয়ে-বউদের মধ্যে জনপ্রিয়।’’ ভাঙা হিন্দি-ইংরেজিতে চেং বলেন, ‘‘স্বপ্নে উনি নিজেই বলেন, ইয়ে করনা হ্যায়, ওহ্ করনা হ্যায়! মন্দিরের কাজও চলতে থাকে।’’ ট্যাংরায় অনেক দূর থেকেও লোকে ঠিক চিনিয়ে দেবে, চিনে কালী মন্দির!

শব্দমুখর কালীপুজোর রাতে চিনা ভক্তদের ভিড়েই অনেক ক্ষণ জেগে থাকেন মা কালী। প্রসাদী রামের বোতলটা থেকে ঘনিষ্ঠজনদের কাউকে তার ভাগ দেন চেং। বাকিটা সঙ্গে করে তাঁর একলা ঘরে ঢুকতে হয়ে যায় প্রায় মাঝরাত। দেওয়ালে মা কালীর ছবির দিকে এক বারটি তাকান চোখ পিটপিটিয়ে। বাকি বোতলটা শেষ হতে সময় লাগে না।

কালীপুজোর রাত বলে কথা! জয় কালী চাইনিজওয়ালি, কলকাত্তাওয়ালি!