গোটা হাওড়া যখন ডেঙ্গিতে কাঁপছে, যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজে নামা ছাড়া যখন আর গতি নেই, তখন আত্মপক্ষ সমর্থনে হাওড়ার পুর কমিশনার যুক্তি দিচ্ছেন, মেডিক্যাল অফিসারের পদ শূন্য পড়ে আছে বলেই নাকি ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণের কাজ ঠিকমতো করা যায়নি।

জেলা স্বাস্থ্য দফতরের রিপোর্টই বলছে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত গোটা জেলায় ডেঙ্গিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২০০। শুধু হাওড়া পুরসভা এলাকাতেই রয়েছেন ১৮০০ জন রোগী। যার মধ্যে উত্তর হাওড়াতেই আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। উত্তর ও দক্ষিণ হাওড়া মিলিয়ে গত দু’মাসে মারা গিয়েছেন মোট চার জন।

হাওড়াবাসীর অভিযোগ, ডেঙ্গি নিয়ে সচেতনতার প্রচার থেকে জঞ্জাল বা নর্দমা সাফাই— এ বছর কোনও কাজই ঠিকমতো হয়নি। যেমন উত্তর হাওড়ার কালী মজুমদার রোড। সেখানে গিয়ে দেখা গেল,পাঁক পরিষ্কার না করায় রাস্তার পাশে বুজে গিয়েছে নর্দমা। জমা জলের উপরে ভাসছে প্লাস্টিক, আবর্জনা, টায়ার। সেখানে কিলবিল করছে লক্ষ লক্ষ মশার লার্ভা। গোটা এলাকা জুড়েই নিকাশির এমন ভয়াবহ অবস্থা। প্রশ্ন উঠেছে, বিভিন্ন এলাকায় এমন হাল কেন? তা হলে কি অতীত থেকে শিক্ষা না নেওয়ার ফলেই হাওড়া পুর এলাকায় এ বছর ডেঙ্গি এমন মারাত্মক আকার নিয়েছে? না কি পুরসভার স্বাস্থ্য দফতরের চরম অবহেলার জন্যই ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না?

হাওড়া শহরে ডেঙ্গি প্রথম দেখা দেয় ২০১৫ সালে। ওই বছর ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের সর্বমঙ্গলা পল্লিতে ওই রোগে আক্রান্ত হন আট জন। মৃত্যুও হয় এক জনের। এর পরেই নড়েচড়ে বসেছিলেন পুরকর্তারা। সেই সময়ে হাওড়া পুরসভার হাতে ডেঙ্গি মোকাবিলার পরিকাঠামো ছিল না বললেই হয়। ওই ঘটনার পরেই নতুন তৃণমূল বোর্ড ক্ষমতায় এসে এই পরিকাঠামো তৈরি করতে উদ্যোগী হয়। নেওয়া হয় দু’জন মেডিক্যাল অফিসার। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমীক্ষার জন্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীকে নিয়োগ করা হয়। তৈরি হয় মশা-দমন বাহিনী। কেনা হয় ধোঁয়া দেওয়ার যন্ত্র।

পুরসভার স্বাস্থ্য দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারদের বক্তব্য, তার পরেও পরবর্তী বছরগুলিতে ডেঙ্গি যে নিয়ন্ত্রণ করা গিয়েছে, তেমনটা বলা যাবে না। কারণ, পরের বছরই প্রায় ১১০০ জন ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হন। তার পরের বছর ২০১৭ সালেও আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৫০। ২০১৮ সালে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় সংখ্যাটা কমে হয় ৮৮০। চলতি বছরে অবশ্য অতীতের সমস্ত রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা।

হাওড়া পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতি বছরই ডেঙ্গির মরসুম শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকে এ নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচার চালানো হয়। যে সাড়ে তিন হাজার মহিলা কর্মী হাওড়া পুরসভার ৬৬টি ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমীক্ষার কাজ করেন, তাঁরাও পুরসভার ১৩টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত রিপোর্ট জমা দেন। কিন্তু অভিযোগ, চলতি বছরে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে পুরসভার তরফে সচেতনতার প্রসারে মিছিল-মিটিং যেমন করা হয়নি, তেমনই সময় মতো বেতন না পাওয়ায় স্বাস্থ্যকর্মীরাও সমীক্ষা করেছেন দায়সারা ভাবে। যার ফলে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজও ঠিকমতো হয়নি। এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিকাশি নালা ও রাস্তার পাশে জমে থাকা আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার না করার অভিযোগ। নিকাশির দুরবস্থার কারণে বৃষ্টির জমা জল আর আবর্জনা এখন মশার প্রজননকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণের কাজে পুরসভার যে গাফিলতি রয়েছে, তা অস্বীকার করেননি পুর কমিশনার বিজিন কৃষ্ণ। তবে তাঁর সাফাই, মেডিক্যাল অফিসারের পদ শূন্য বলেই ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণের কাজে ঠিকমতো নজরদারি চালানো যায়নি। তাঁর কথায়, ‘‘মেডিক্যাল অফিসার না থাকায় স্বাস্থ্য দফতরের উপরে যে সার্বিক নজরদারি প্রয়োজন, তা করা যাচ্ছে না। তার ফলে অনেক গাফিলতি থেকে যাচ্ছে। যাঁর যা দায়িত্ব আছে, তা পালন না করায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।’’

পুর কমিশনার এ কথা বললেও পুরসভার অন্য অফিসারদের মতে, হাওড়া পুরসভার নির্বাচিত বোর্ড থাকলে সামগ্রিক ভাবে এই দুরবস্থা হত না। আসলে পুর কমিশনারের একার পক্ষে ৬৬টা ওয়ার্ডে নজরদারি সম্ভব হচ্ছে না।