তাঁর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ছবি বলে আমি মনে করি।’’— সত্যজিতের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সম্পর্কে বলেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। আর ‘‘কাঞ্চনজঙ্ঘার কাঠামো ছিল একেবারেই চলচ্চিত্রের কাঠামো— যেটা আমার আগের কোনও ছবি সম্বন্ধেই বলা চলে না।’’ বলেছিলেন সত্যজিৎ নিজে। আগামী কাল তাঁর প্রয়াণের সাতাশ বছর পূর্ণ হবে, সামনেই তাঁর ৯৯তম জন্মদিন— ২ মে। এই উপলক্ষে উদ্যোগ-আয়োজনের কথা জানাচ্ছিলেন সন্দীপ রায়: ‘‘বাবার প্রথম রঙিন ছবি ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র চিত্রনাট্যও মৌলিক, এর আগে তাঁর সব ছবিরই অবলম্বন ছিল বিখ্যাত সাহিত্যিকদের কাহিনি, আর এ-ছবির সাহিত্যিক বাবা নিজেই। ১৯৬২-র ১১ মে মুক্তি পেয়েছিল ছবিটা, চিত্রনাট্য প্রকাশ পায় ঠিক দশ বছর পর মিত্র ও ঘোষ থেকে। কাজ চলছে এই মে মাসেই ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ নিয়ে গ্রন্থপ্রকাশের। এতে ছবিটাকে ঘিরে বাবার করা সব কিছুই থাকছে। চিত্রনাট্য, খেরোর খাতা, কসটিউম ডিজ়াইন, মিউজ়িকের ওয়েস্টার্ন নোটেশন, বিজ্ঞাপন, বুকলেট, সর্বোপরি ১২টা টাইটেল কার্ড। এই প্রথম বাবা টাইটেল কার্ডে ছবি আঁকলেন, এর আগের ফিল্মগুলিতে তাঁর ক্যালিগ্রাফি ছিল, এখানে যোগ হল ছবিও। এত খুঁটিনাটি হোমওয়ার্ক বাবা বোধ হয় আগের কোনও ছবিতেই করেননি। প্রতিক্ষণ প্রকাশ করছে বইটি: কাঞ্চনজঙ্ঘা/ চিত্রনাট্য ও প্রস্তুতিপর্ব। সহায়তায় অবশ্যই সত্যজিৎ রায় সোসাইটি।’’ সন্দীপ রায় সম্পাদিত এই বইটিতে থাকছে প্রচুর ছবিও, বাঁ দিকে তেমনই একটিতে সত্যজিতের সঙ্গে অরুণ মুখোপাধ্যায় ও অলকনন্দা রায় (ছবিটি তাঁরই সৌজন্যে)। পরিশিষ্টে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ও ছবি বিশ্বাসকে নিয়ে সত্যজিতের বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার, স্মৃতির সঙ্গে বিজয়া রায়, করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়, এন বিশ্বনাথনেরও স্মৃতিকথন। এবং ছবিটির শেষ প্রতিনিধি অলকনন্দা রায়ের সাক্ষাৎকার (সোমনাথ রায়-কৃত)। অন্য দিকে সত্যজিতের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল অর্ধশতক আগে, ১৯৬৯-এর ৮ মে। সে-ছবি নিয়েই প্রদর্শনী গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায়, ২৭ এপ্রিল বিকেল ৫টায় উদ্বোধন, চলবে ৩০ পর্যন্ত। ‘‘এতে বেশ কিছু ছবি নিমাইকাকার (ঘোষ), ওঁরও ‘গুগাবাবা’ থেকে ছবি তোলা শুরু, পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ফিল্ম ও শুটিং স্টিল-এর সঙ্গে বাবার আঁকা প্রচুর স্কেচ, ইলাস্ট্রেশন থাকছে।’’ জানালেন সন্দীপ। ২৭ এপ্রিল সন্ধে সাড়ে ৬টায় শিশির মঞ্চে সত্যজিৎ স্মারক বক্তৃতা দেবেন তরুণ মজুমদার। আয়োজনে সত্যজিৎ রায় সোসাইটি।

 

কল্পবিজ্ঞান 

বাংলা কল্পবিজ্ঞান চর্চার অন্যতম পুরোধা রণেন ঘোষ ছিলেন একাধারে লেখক, সম্পাদক ও পরে প্রকাশক। অনুবাদও করেছেন অজস্র। লেখার সঙ্গে ছিল বিপুল পড়াশোনা। কল্পবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানচর্চার বেনজির সংগ্রহ তাঁর। জন্ম ১৯৩৬ সালে। পড়াশোনা বেনেপুকুর বিদ্যাপীঠ ও সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। একুশ বছরে বন দফতরে চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু। পরে গুরুত্বপূর্ণ নানা পদে চাকরি। অদ্রীশ বর্ধন সম্পাদিত প্রথম কল্পবিজ্ঞান পত্রিকা ‘আশ্চর্য’য় হাতেখড়ি। ১৯৭১ সালে ‘বিস্ময় সায়েন্স ফিকশন’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন রণেন ঘোষ ও সুজিত ধর। স্বল্পায়ু এই পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পরে অদ্রীশ বর্ধন শুরু করেন ‘ফ্যানট্যাস্টিক’, সহ-সম্পাদক রণেন। ১৯৯৮ সালে শুরু প্রকাশনা— জন্ম নেয় ‘প্রতিশ্রুতি’। ‘মহাকাশের আগন্তুক’, ‘গলন্ত মানুষ’-এর মতো কল্পবিজ্ঞানের পাশাপাশি ‘ব্রহ্মাণ্ড রহস্য’, ‘চাঁদ কি এক মহাকাশযান’, ‘ভ্যাম্পায়ার’ ইত্যাদি বইতে ছড়িয়ে রয়েছে বিবিধ রোমাঞ্চের প্রতি তাঁর অপার মুগ্ধতা। কল্পবিজ্ঞান-ফ্যান্টাসি ওয়েব পত্রিকা ‘কল্পবিশ্ব’-র প্রতি ছিল অসম্ভব স্নেহ। ৭ এপ্রিল প্রয়াত হলেন রণেন ঘোষ।

  

সংস্কৃতি কেন্দ্র

বিশ শতকের বিখ্যাত স্টুডিয়ো-ফটোগ্রাফার চারুচন্দ্র গুহের কনিষ্ঠ পুত্র শ্যামল গুহ বহু টাকার প্রলোভন উপেক্ষা করে, উপরন্তু গাঁটের পয়সা খরচ করে ২০০৪ সালে ঐতিহাসিক সি গুহ স্টুডিয়োকে রূপান্তরিত করেছিলেন বই-চিত্র গ্যালারি ও সভাঘরে, সংস্কৃতি-চর্চার অবাধ কেন্দ্র হিসেবে যা আজ সুপরিচিত। রণেন রায়চৌধুরী, পরেশ ধরের সঙ্গীত-ভাবনা কিংবা রাজেন্দ্রলাল মিত্রের ফটোগ্রাফি-চর্চা, মুকুর সর্বাধিকারীর বহুমুখী সংস্কৃতি-ভাবনা কিংবা নগেন্দ্রনাথ সর্বাধিকারীর ফুটবল-চর্চা, বহু পরিশ্রমে এমন সব বিচিত্র বিষয়ের মালমশলা সংগ্রহ করে রেখেছিলেন শ্যামল গুহ (১৯৩৮-২০১৯)। তাঁরই উৎসাহে ২ জানুয়ারি ‘বেঙ্গল ফটোগ্রাফি ডে’ হিসেবে নিয়মিত পালিত হয়ে চলেছে। চেষ্টা করেছিলেন একটি ফটোগ্রাফি আর্কাইভ তৈরি করতে। তাঁর প্রয়াণে অনেক কাজ অপূর্ণ রয়ে গেল। তাঁরই হাতে গড়া ‘বই-চিত্র কালচারাল সোসাইটি’ ২৪ এপ্রিল বিকেল পাঁচটায় বই-চিত্র সভাঘরে তাঁকে স্মরণ করবে। আলোচনায় অমলেন্দু মিত্র, অরুণ নাগ, আশীষ লাহিড়ী, তুষার চক্রবর্তী, দেবব্রত পাণ্ডা, পুলক চন্দ, প্রবীর মুখোপাধ্যায়, সলিল বিশ্বাস প্রমুখ।

 

দশ কাহন

উপস্থিত বুদ্ধি আর উইট মিলিয়ে তিনি যে হাস্যরস উৎপাদন করেন তা স্বাদে স্বতন্ত্র। তিনি ১৯৯৪ সালে রেডিয়ো জকির কাজ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি সঞ্চালক, টেলিভিশন হোস্ট, অভিনেতা, গায়ক মীর আফসার আলি ওরফে মীর। অন্য জন, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ২০০৩ সাল থেকে তাঁর জাত চিনিয়ে দিয়েছে পর্দা বা মঞ্চে অভিনয় ক্ষমতা, সাবলীল বাচনিক ও নিখুঁত উচ্চারণ এবং সুরেলা কণ্ঠটি। তিনি সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। এ বার এই দুই প্রতিভাধর শিল্পীই তাঁদের জীবনের ওঠাপড়া, সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা— এ রকম দশটি করে গল্প শোনাবেন ২৭ এপ্রিল সন্ধে ৭টায়, আইসিসিআরে ‘বিইং আস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে। শোনা যাবে তাঁদের কণ্ঠে কিছু গান, পড়বেন কবিতাও।

 

স্বপ্নতাড়িত

‘‘বরাবর তেমন ছবিই করেছি যেখানে কেন্দ্রে থাকেন সেই সব প্রান্তিক মানুষ— যাঁরা প্রতিনিয়ত পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িত।’’ নিজের নতুন ছবি ‘সুইমিং থ্রু দ্য ডার্কনেস’ নিয়ে বলছিলেন সুপ্রিয় সেন। সুপ্রিয় সেই বিরল তথ্যচিত্রকার যিনি নিয়ত তথ্য ও কাহিনিচিত্রের সীমারেখা মুছে চলেছেন, তাঁর ছবি গল্পের আদলে বয়ে বেড়ায় কোনও অমোঘ সত্য... ওয়ে ব্যাক হোম, হোপ ডাইস লাস্ট ইন ওয়ার, ওয়াঘা। দেশ-দুনিয়ার বিবিধ সম্মানপ্রাপ্তি সত্ত্বেও সুপ্রিয়কে তাড়িয়ে বেড়ায় অসম্ভবের স্বপ্ন, নতুন ছবিটি তেমনই এক স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার কাহিনি। দৃষ্টিহীন সাঁতারু কানাই চক্রবর্তীর জীবনকাহিনি। ‘‘শুধু যে তাঁর অ্যাচিভমেন্টই আছে তা নয়, তাঁর দৈনন্দিনের ছন্দও তুলে আনার চেষ্টা করেছি এ-ছবিতে। সাঁতারের বাইরেও তিনি গান করেন, কবিতা লেখেন, মাউথ অর্গ্যান বাজান, নিজস্ব এক দর্শনবোধ থেকে কথা বলেন... ’’, মুগ্ধতা সুপ্রিয়র স্বরে। গ্যোটে ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ম্যাক্সমুলার ভবনে দেখানো হবে ২৪ এপ্রিল বিকেল ৫টা ও সন্ধে ৭টায়।   

 

প্রতিবেশী

সম্রাট আকবর তাঁদের সাদরে ডেকে এনে আগরায় বসতি করিয়েছিলেন। কলকাতায় তাঁরা এসে পৌঁছন ইংরেজদেরও আগে। কলকাতার আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী একদা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আজ তাঁদের সংখ্যা শ’খানেকের নীচে নেমে গেলেও সেই সমৃদ্ধির প্রমাণ রয়ে গিয়েছে আর্মেনিয়ান কলেজ, তিনটি গির্জা আর পাঁচটি সমাধিক্ষেত্রে। গ্র্যান্ড হোটেল-সহ আরও অনেক হোটেল আর্মেনীয়দের হাতেই শুরু হয়েছিল। কলকাতার একটা বড় অংশ গড়ে তোলেন তাঁরা— শুধু জে সি গলস্টোনই তৈরি করেন কুইন্স ম্যানসনস, হ্যারিংটন ম্যানসনস, গলস্টোন পার্ক, নিজাম প্যালেসের মতো দর্শনীয় প্রাসাদোপম বাড়ি আর মধ্য ও দক্ষিণ কলকাতায় অন্তত ৩৫০টি বাড়ি। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল নির্মাণ তহবিলে ২৫ হাজার টাকা দেন তিনি। তাঁরই উত্তরসূরি অ্যান্টনি খাচাতুরিয়ান— জন্ম কলকাতায়, পড়াশোনা লন্ডনে, যুক্ত ছিলেন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে, এখন ব্যস্ত এই শহরের ঐতিহ্যকে নানা ভাবে তুলে ধরতে— ২৪ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৫টায় ভিক্টোরিয়ার কনফারেন্স হলে ছবি-সহ বলবেন কলকাতার আর্মেনীয়দের নিয়ে। সে দিনটা ওঁদের ‘শহিদ দিবস’, ১৯১৫-য় এই দিনেই তুরস্কে শুরু হয়েছিল আর্মেনীয়দের গণহত্যা।

 

মহাভারতের ছবি 

কলকাতার ফেরিস কোম্পানির প্রেসে ছাপা অন্নদামঙ্গল (১৮১৬) দিয়ে বাংলা সচিত্র বইয়ের যাত্রা শুরু। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে সংখ্যায় কম থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে বহু বইয়ে ছবি দেখা যায়। ছবি ছাপা ছিল ব্যয়বহুল, একই ব্লক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন বইয়ে অনেক বার ব্যবহার হত। কাঠখোদাই থেকে ধাতুখোদাই, এচিং, লিথোগ্রাফ হয়ে বিশ শতকের গোড়ায় এল হাফটোন ছবি। তবু হাতে কাটা ছাপচিত্র অনেক দিন ধরেই বাংলা বইয়ের সচিত্রকরণে বড় ভূমিকা নিয়েছে। জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য এই সব ছবির সংগ্রহ-সংরক্ষণে সক্রিয়। এ বারে তিনি ১৮৬৬-১৯১৫ সময়কালে প্রকাশিত বিভিন্ন সংস্করণের মহাভারতে মুদ্রিত ছবির সম্ভার হাজির করেছেন দর্শকের সামনে। কালীপ্রসন্ন সিংহ ও বর্ধমান রাজসভার মহাভারত ছাড়াও এখানে দেখা যাবে দে ব্রাদার্স হিন্দু প্রেস এইচ ডি মান্না অ্যান্ড কোম্পানি প্রকাশিত মহাভারতের ছবি। আছে শ্রীমদ্ভাগবত-এর কয়েকটি সংস্করণের ছবিও। যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস, গ্যালারি চারুবাসনায় (সাউথ সিটি মলের বিপরীতে) প্রদর্শনী চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত (৩-৮টা, রবি ও ছুটির দিন বাদে)। মহাভারতের আরও অনেক ছবি নিয়ে জুন মাসে একটি বই প্রকাশেরও পরিকল্পনা করেছেন জ্যোতির্ময়। সঙ্গের ছবিতে ‘ভীষ্মের শরশয্যা’। 

 

পেরিস্তান

ছোট থেকে বড়, বড় থেকে বুড়ো— লীলা মজুমদারের লেখা পড়েননি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। সেই লীলা মজুমদারকে নিয়েই ‘দ্য প্রোডাকশন অব সৌম্য দ্য স্ন্যাপার’ নিবেদিত তথ্যচিত্র ‘পেরিস্তান— দ্য ওয়ার্ল্ড অব লীলা মজুমদার’ মুক্তি পেল ওদের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল-এ। ‘নীলাঞ্জনা এন্টারপ্রাইজ়’ প্রযোজিত প্রায় আধ ঘণ্টার এই তথ্যচিত্রের মূল ভাবনা, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা সৌম্যকান্তি দত্ত। চিত্রগ্রহণ ও সহ-পরিচালনা সৌরদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গীতে তাপস মৌলিক ও অয়ন চট্টোপাধ্যায়। ধারাভাষ্য দিয়েছেন পরিচালক নিজেই। এতে লীলা মজুমদারের সমগ্র জীবন দেখা যাবে। রয়েছে পুত্র রঞ্জন মজুমদার, নবনীতা দেব সেন, সন্দীপ রায়, সৌকর্য ঘোষাল, প্রসাদরঞ্জন রায়-সহ আরও অনেকের সাক্ষাৎকার। লীলা মজুমদারের পাণ্ডুলিপি, দুর্লভ ছবি এবং লীলা মজুমদারের শেষ যাত্রার ফুটেজও দেখা যাবে এই তথ্যচিত্রে। এর শুটিং হয়েছে কলকাতা ও শান্তিনিকেতনে।

 

শুরুর গান

‘জেগে আছি একা...’, অথবা ‘পৃথিবী আমারে চায়...’— তাঁর গাওয়া এই সব কালজয়ী গান বাংলা সঙ্গীতজগতে আলোড়ন তুলেছিল। গায়ক-সুরকার-অভিনেতা সত্য চৌধুরীর জন্ম ১৯১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর কলকাতার গ্রে স্ট্রিটে। পড়াশোনা পদ্মপুকুর ইনস্টিটিউশনে ক্লাস এইট পর্যন্ত, তার পর মিত্র ইনস্টিটিউশন, আশুতোষ কলেজ। বড় হয়েছিলেন এক সাঙ্গীতিক আবহাওয়ায়। তাঁর শিল্পী জীবনের শুরুটা হয়েছিল ত্রিশের দশকে। ১৯৩৬ সালে সাহিত্যিক বিমল মিত্রের কথায় ও অনুপম ঘটকের সুরে তিনি প্রথম রেকর্ড করেন ‘সাঁঝে যখন ওঠে রে চাঁদ’ ও ‘নতুন চাঁদের তিথি এল’— এই দু’টি আধুনিক গান। সম্প্রতি শিল্পীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তাঁর জীবনের প্রথম পর্বে গাওয়া গানের সঙ্কলন ‘আমার স্বপন মাঝে’ (হিন্দুস্থান রেকর্ড) প্রকাশিত হয়েছে। এই স্মারক অ্যালবামটিতে এই প্রথম সঙ্কলিত হল হিন্দুস্থানে গাওয়া তাঁর সেই সব আধুনিক গান, যা তাঁকে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল। সেই সঙ্গে নিবেদিত হয়েছে ১৯৩৩ সালে সুবল দাশগুপ্তের সুরারোপিত ‘কবি জয়দেব’ ছবিতে তাঁর গাওয়া আরও ছ’টি গান।

 

মীরা

তিনি রাজপুত রাজকুমারী। ১৪৯৮ সালে রাজস্থানের অভিজাত হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া মীরাবাই রচনা করে গিয়েছেন বারোশো থেকে তেরোশো ভজন। আর এর প্রত্যেকটিরই মর্মে মর্মে প্রবহমান কৃষ্ণের প্রতি তাঁর প্রেম ও বিরহ গাথা। শোনা যায়, মুঘল সম্রাট আকবর তাঁর ভজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তানসেনকে সঙ্গে নিয়ে মীরার গান শুনতে আসেন। গান শুনে বিভোর হয়ে সম্রাট তাঁর গলার হার খুলে কৃষ্ণের চরণে দান করেন। তখন আকবরের সঙ্গে মীরার শ্বশুরবাড়ি রক্ষণশীল রানা পরিবারের বিরোধ চরমে। এই ঘটনা পরিবার মেনে নেয়নি। ফলস্বরূপ মীরার উপর শুরু হয় অত্যাচার। আর তখনই রানার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন সম্রাট আকবর। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মৃত্যু হয় রানার। মীরা তখন বৃন্দাবনে চলে আসেন। সেখানে কৃষ্ণমন্দির নির্মাণ করে শুরু হয় তাঁর কৃষ্ণ ভজন-সাধন। কিন্তু তখন তাঁর কানে শুধু যুদ্ধ-বিবাদে হতাহতের খবর আসতে থাকে। মীরা সহ্য করতে না পেরে দেহত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন। এক দিন কৃষ্ণমূর্তিকে আলিঙ্গন করে বিলীন হয়ে গেলেন সেই মূর্তিতে। তাঁর দেহ আর খুঁজে পাওয়া গেল না— এই কাহিনিই তুলে ধরেছেন ‘মীরা’ শীর্ষক নৃত্যনাট্যের পরিচালক সুকল্যাণ ভট্টাচার্য। চরিত্রগুলি ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পীরা। প্রযোজনায় ‘সুকল্যাণ ডি এন্তুরাজ়্’ ও বাংলাদেশের নৃত্য সংগঠন ‘নৃত্যাঞ্চল’। বাংলাদেশে ‘মীরা’র প্রথম অনুষ্ঠান হল সম্প্রতি, কলকাতার দর্শকরাও কিছু দিনের মধ্যেই দেখতে পাবেন এই নৃত্যনাট্য। সুকল্যাণের জন্ম কলকাতায় হলেও বড় হয়েছেন কানাডায়। গুরু বিপিন সিংহ ও কলাবতী দেবীর কাছে নৃত্যশিক্ষা করেছেন। নৃত্যপরিচালনা করেছেন ‘আলো’, ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’, ‘হাসন রাজা’, ‘মাটি’-সহ প্রায় ছাব্বিশটি চলচ্চিত্রে।