‘ছুটির দিন, কে আর ভোটের লাইনে দাঁড়ায়’
সারা রাজ্যে কলকাতা উত্তরের ভোটদানের হারই সর্বনিম্ন ছিল গত লোকসভা নির্বাচনে। ২০১৪ সালে রাজ্যে ভোটদানের হার যেখানে ছিল ৮২.২২ শতাংশ, সেখানে উত্তর কলকাতায় সেই হার ছিল ৬৬.৬৮ শতাংশ।
Sleep

নিশ্চিন্তে: বাড়ির রকে শুয়ে বিশ্রাম। সোমবার, হাতিবাগানে। ছবি: স্নেহাশিস ভট্টাচার্য

কলকাতা দক্ষিণ যতই ঝকঝকে হোক, ভোটদানের ক্ষেত্রে আসল ‘শহুরে মানসিকতা’ কিন্তু কলকাতা উত্তরেরই। তা হল, কলকাতা উত্তরের ভোটদানে অনীহা। আন্তর্জাতিক স্তরেও ভোটদানের ক্ষেত্রে যে ‘আর্বান অ্যাপাথি’ দেখা যায়, কলকাতা উত্তরের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে তা শামিল। সংশ্লিষ্ট লোকসভা কেন্দ্রে ভোটদানের হার ধারাবাহিক ভাবে কম কেন, তার বিশ্লেষণ করে এমনই তথ্য পাচ্ছে কলকাতা উত্তর নির্বাচনী জেলা।

উত্তরের ভোটারদের বুথমুখী করতে ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। কিন্তু ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে উদাসীনতার মূল কারণগুলি কী, সেই প্রসঙ্গ এখনও সামনে আসেনি। কলকাতা উত্তর জেলা নির্বাচনী অফিসার দিব্যেন্দু সরকার বলেন, ‘‘দক্ষিণ কলকাতায় আবাসিক এলাকা বেশি, কিন্তু মূল বাণিজ্যিক কেন্দ্র (সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট) তো কলকাতা উত্তরেই। তাই এখানকার মানুষও বেশি সংখ্যায় ভোট-বিমুখ। তবে সেই প্রবণতা পাল্টানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’’

প্রসঙ্গত, সারা রাজ্যে কলকাতা উত্তরের ভোটদানের হারই সর্বনিম্ন ছিল গত লোকসভা নির্বাচনে। ২০১৪ সালে রাজ্যে ভোটদানের হার যেখানে ছিল ৮২.২২ শতাংশ, সেখানে উত্তর কলকাতায় সেই হার ছিল ৬৬.৬৮ শতাংশ।

কিন্তু কেন উত্তর কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের একাংশের এই প্রবণতা?

কে সি দাসের কর্ণধার বাগবাজারের বাসিন্দা ধীমান দাস বলেন, ‘‘ভোট দিয়ে কী হবে, কিছুই তো পাল্টায় না— এমন একটা অনীহা কাজ করে। সে কারণে অনেকেই ভোট দিতে যান না।’’ মোমবাতি ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ওয়াক্স বেস্‌ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন’-এর সেক্রেটারি সমীর দে জোড়াসাঁকোর বাসিন্দা। সমীরবাবু বলছেন, ‘‘আসলে মানুষ রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ! তাই ভোট দিতে চান না।’’

বয়সজনিত কারণেও অনেকে ভোট দিতে যান না বলে মত সুতানুটি পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক গোপীনাথ ঘোষের। তাঁর ব্যাখ্যা, উত্তর কলকাতায় অধিকাংশই পুরনো পাড়া। ফলে বাসিন্দাদের গড় বয়স অনেকটাই বেশি। তাঁদের ভোট সম্পর্কে আগ্রহ স্বাভাবিক ভাবেই কম। আর নতুন প্রজন্ম? গোপীনাথবাবুর কথায়, ‘‘তাঁদের রাজনীতি নিয়ে আলাদা করে কোনও আগ্রহ রয়েছে বলে মনে হয় না!’’

ভোটদানের হার কম হওয়ার কারণ হিসেবে কলকাতা উত্তর নির্বাচনী জেলার বিশ্লেষণে আরও একটি ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। দিব্যেন্দুবাবু বলছেন, ‘‘কলকাতা উত্তরে ‘ফ্লোটিং পপুলেশন’ বেশি। এখানকার ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে, অথচ অনেকেরই বাড়ি অন্য জায়গায়। ফলে ভোটার তালিকায় নাম থাক বা না-ই থাক, ভোটের দিন তাঁরা নিজেদের বাড়ি চলে যান।’’ কলকাতা উত্তরের তৃণমূল প্রার্থী সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবার বক্তব্য, ‘‘উত্তর কলকাতা একটা মিশ্র এলাকা। এখানে মারোয়াড়ি, গুজরাতি-সহ হিন্দিভাষীরা আছেন। মনে রাখতে হবে, কলকাতা উত্তরে বড়বাজারের মতো এলাকা রয়েছে। বাঙালিদের মধ্যে তবু ভোটদানের একটা আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু অ-বাংলাভাষীদের মধ্যে আগ্রহটা কম।’’

অর্থনৈতিক কারণও ভোটদানের অনীহার ক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করে বলে জানাচ্ছেন হাতিবাগান বাজার ব্যবসায়ী সংগঠনের কর্তা রঞ্জন রায়। তিনি বলছেন, ‘‘নিম্নবিত্ত মানুষকে কাজে যেতে হয়। কাজে না গেলে তাঁরা মজুরি পাবেন না। তাই তাঁদের কাছে ভোটের চেয়েও কাজে যাওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ বার রবিবার ছুটির দিন ভোট। দেখা যাক কী হয়।’’

কলকাতা উত্তর নির্বাচনী জেলা সূত্রের খবর, এই লোকসভা কেন্দ্রে বুথের সংখ্যা ১৮৬২। ভোটের দিন যাতে নির্বিঘ্নে সেখানে ভোট দিতে পারেন ভোটারেরা, সেই চেষ্টার কসুর করছে না কলকাতা উত্তর নির্বাচনী জেলা। প্রাক্তন রাজ্যপাল তথা সারদা কমিশনের চেয়ারম্যান শ্যামল সেন অবশ্য বলছেন, ‘‘পরিসংখ্যানের ব্যাপারটা বলতে পারব না। তবে আমার তো ভোটদানের ক্ষেত্রে উৎসাহ কম লাগে না। সকালে ভোট দিতে যাই যখন, তখন তো লম্বা লাইনই থাকে।’’

বাসিন্দাদের একাংশ বলছেন, ঠিকই। কলকাতা উত্তরে যা ভোট পড়ার, ওই সকালেই পড়ে যায়। অনেকে ভোট দিতে গিয়ে লম্বা লাইন দেখে বাড়ি ফিরে আসেন। ভাবেন, পরে যাবেন ভোট দিতে। কিন্তু সেই পরে আর যাওয়া হয়ে ওঠে না! কারণ, শোভাবাজার রাজবাড়ির উত্তরসূরি প্রবাল দেবের কথায়, ‘‘আমি বা অন্য অনেকেই ভোট দেন। কিন্তু অনেকে আবার মনে করেন, এটা একটা ছুটির দিন। কে আর পরে লাইনে গিয়ে দাঁড়ায়। তার থেকে বাড়িতে আরাম করা ভাল। তাই ভোটও কম।’’

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত