লিড-ফতোয়ায় তালিকা তৈরি ‘হেরো’ ওয়ার্ডের
কলকাতা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রের কসবা বিধানসভা আসনের হালও খারাপ ছিল। এলাকার ৬টি ওয়ার্ড নিয়ে কসবা বিধানসভা কেন্দ্র।
TMC

লোকসভা ভোটে নিজেদের ওয়ার্ড থেকে ‘লিড’ দিতেই হবে দলীয় কাউন্সিলরদের। না পারলে কলকাতা পুরসভার ভোটে আর প্রার্থী হওয়ার সুযোগ মিলবে না। দলের অন্দরে এমনই নির্দেশ জারি করেছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। পরের বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালে কলকাতা পুরসভার ভোট। তাই লোকসভা ভোটের আগে দলের এই নিদানে সব চেয়ে বেশি অস্বস্তিতে কলকাতার সেই সব কাউন্সিলরেরা, যাঁরা ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নিজেদের ওয়ার্ডে পিছিয়ে পড়েছিলেন। এখন বুঝেছেন, দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে কোমর বেঁধে নামতে হবে।

ওই তালিকায় রয়েছে কলকাতা দক্ষিণ ও যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের গোটা ২০ ওয়ার্ড। সব চেয়ে শোচনীয় হাল যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের অধীন যাদবপুর বিধানসভা এলাকার। পুরসভার ৯৬, ৯৯, ১০১, ১০২, ১০৩, ১০৪, ১০৫, ১০৬, ১০৯ এবং ১১০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্র। ২০১৫ সালের পুর নির্বাচনে ৯৯, ১০২ এবং ১০৩ ছাড়া বাকি সাতটিতেই জয়ী হন তৃণমূল প্রার্থীরা। জয়ের ব্যবধানও ছিল তিন থেকে চার হাজার বা তারও বেশি। কিন্তু ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল তাদের জেতা সাতটি আসনের কোনওটিতেই এগিয়ে থাকতে পারেনি। পুর ভোটে ১০১ নম্বর ওয়ার্ডে লিড ছিল সাড়ে তিন হাজারের বেশি। পরের বছরের বিধানসভা ভোটে লিড তো ছিলই না, বরং দলীয় প্রার্থী ওই এলাকায় ২৬০০ ভোটে পিছিয়ে ছিলেন। অর্থাৎ, প্রায় ৬৩০০ ভোট কমে যায়। একই ভাবে ৯৬ নম্বর ওয়ার্ডে লিড ছিল চার হাজারের বেশি। ওই এলাকায় পরের বছর দলীয় প্রার্থী পিছিয়ে পড়েন ৫৩৬ ভোটে। ১০৪ নম্বর ওয়ার্ডে ছিল ৪১০০ ভোটের লিড। কিন্তু পরের ভোটে দলীয় প্রার্থী ৬৬৪ ভোটে পিছিয়ে পড়েন। আর ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডে ২৭০০ ভোটের লিড কমে গিয়ে প্রার্থী তিন হাজার ভোটে পিছিয়ে পড়েন। ওই লোকসভা কেন্দ্রের অধীন টালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের কিছু ওয়ার্ডেও ঘটেছিল একই ঘটনা। যে কারণে সে বার যাদবপুরে পরাজিত হয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী মণীশ গুপ্ত।

কলকাতা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রের কসবা বিধানসভা আসনের হালও খারাপ ছিল। এলাকার ৬টি ওয়ার্ড নিয়ে কসবা বিধানসভা কেন্দ্র। এর মধ্যে চারটি ওয়ার্ড (৬৬, ৬৭, ১০৭ এবং ১০৮) তৃণমূলের দখলে। পুর ভোটে লিড ছিল তিন থেকে ৩০ হাজার পর্যন্ত। জেতা দুই ওয়ার্ডের একটিতে চার হাজারের লিড পরের বছর কমে প্রার্থী পিছিয়ে ছিলেন ৯৯০ ভোটে। অন্যটিতে দু’হাজারের লিড থেকে পরের বছর প্রার্থী পিছিয়ে যান ২১০০ ভোটে। এর পাশাপাশি ১০৮ নম্বর ওয়ার্ডে তৃণমূল জিতেছিল প্রায় ২৮০০ ভোটে। বিধানসভায় যা কমে দাঁড়ায় ২০০। শুধু ৬৬ নম্বর ওয়ার্ডে জয়ের ব্যবধান ঠিকঠাক ছিল। অন্য দিকে, বামেদের জেতা দুটো ওয়ার্ড ৯১ এবং ৯২-তে পুরভোটে তৃণমূলের হারের ব্যবধান ছিল প্রায় ৪৭০০। সেটা বেড়ে হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার। কলকাতা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রের ভবানীপুর এবং কলকাতা বন্দর বিধানসভার অধীন ৭০, ৭৯ এবং ৮০-সহ একাধিক ওয়ার্ডেও পিছিয়ে ছিল তৃণমূল।

আজ কোথায় কোথায় ভোট, দেখে নিন

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

তবে বিধানসভার ওই ফলাফল এই ভোটে কোনও প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে করছেন দক্ষিণ কলকাতার একাধিক তৃণমূল কাউন্সিলর। যাদবপুরের এক তৃণমূল কাউন্সিলরের কথায়, ‘‘সে বার বাম ও কংগ্রেসের জোট হয়েছিল। দুটো দল একসঙ্গে লড়ায় বাড়তি কিছুটা ভোট পেয়েছিল। সেই সঙ্গে সারদা আর নারদ-কাণ্ডকে সামনে এনে হাওয়া গরমের চেষ্টা হয়েছিল।’’

ওই কাউন্সিলরের দাবি, একমাত্র যাদবপুরে হারলেও কলকাতার বাকি সব বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের জয় অব্যাহত থাকার ঘটনাই বুঝিয়ে দেয়, শাসক দলের প্রতিই মানুষের বিশ্বাস রয়েছে। তবে দক্ষিণ কলকাতার এক তৃণমূল কাউন্সিলরের কথায়, ‘‘পুর ভোটের সঙ্গে বিধানসভা ভোটের কিছু হেরফের হতেই পারে। তাই বলে চার হাজারে জিতে দু’হাজারে পিছিয়ে পড়া! এটা ভাবার বিষয়।’’ শাসক-বিরোধী ভোট বিজেপি-র ঝুলিতে যাওয়ার আশঙ্কাতেও ভুগছেন তাঁরা। আবার লিড দিতে না পারলে পুর ভোটে প্রার্থী না করার বিষয়টি কর্মিসভায় ঘোষণা করা নিয়েও জলঘোলা হচ্ছে বলে জানান একাধিক কাউন্সিলর। যাদবপুরের এক তৃণমূল কাউন্সিলর বলেন, ‘‘বিষয়টি জানাজানি হতেই দলের কিছু কর্মী, যাঁরা কাউন্সিলরকে পছন্দ করেন না, তাঁরা আলাদা দল পাকাচ্ছেন। ফল খারাপ হলে ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার আশায়।’’ আবার রাসবিহারী কেন্দ্রের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় জানান, তাঁর এলাকার ৯টি ওয়ার্ডের সব ক’টিতেই তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে। অথচ, গত পুর ভোটে ওই বিধানসভার অধীন ৮৬ এবং ৮৭ নম্বর ওয়ার্ড দখল করেছিল বিজেপি। ২০১৬ সালে সেখানে ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে শাসক দল। শোভনদেববাবুর ওই হিসেব অবশ্য নতুন করে ভাবাবে কোনও কোনও কাউন্সিলরকে।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত