পরীক্ষার বাকি আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। সপ্তাহভর প্রস্তুতির সময়ে তো বটেই, পরীক্ষার এক দিন আগেও শব্দদানব রাতভর সঙ্গী হয়ে রইল পড়ুয়াদের। সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের নির্দেশ, রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের হুঁশিয়ারি এবং মুখ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তাতেও লাগাম টানা গেল না বেপরোয়া শব্দের তাণ্ডবে। সোমবার সকাল থেকে শব্দকে জব্দ করতে ময়দানে নামা পুলিশও নাস্তানাবুদ হল সন্ধ্যা হতেই। অভিযোগ, পড়ুয়াদের সপ্তাহভরের যন্ত্রণাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল সরস্বতী পুজোর বিসর্জন ঘিরে শব্দতাণ্ডব।

শীতের মরসুম জুড়ে পাড়ায় পাড়ায় মাইক বাজিয়ে অনুষ্ঠানের অভিযোগ উঠছিল বারংবার। রবিবার সরস্বতী পুজোর দিন থেকে সেই শব্দযন্ত্রণা মাত্রাছাড়া হয়ে দাঁড়ায়। মনে করা হচ্ছিল, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা মেনে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক বা অন্যান্য বোর্ডের পরীক্ষার তিন দিন আগে থেকে প্রকাশ্যে বক্স, মাইক বা ডিজে-র তাণ্ডব বন্ধ হবে। কিন্তু শনি ও রবিবার সরস্বতী পুজো এবং সোমবারও তা ঘিরে বিভিন্ন জায়গায় হওয়া অনুষ্ঠান সেই আশায় জল ঢেলে দিয়েছে। 

মানিকতলার মুরারিপুকুর এলাকায় মাঝরাত পর্যন্ত পাড়া কাঁপিয়ে গানের তাণ্ডব চলেছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। একই অভিযোগ উঠেছে দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডে। সেখানকার এক শপিং মল সংলগ্ন পুজোগুলিতে রাত পর্যন্ত বক্স বাজানো হয়েছে। রবিবারের পরে সোমবারও একই রকম শব্দতাণ্ডব চলেছে দমদমে। রবিবার রাত ২টো পর্যন্ত বহু পড়ুয়া পড়া তো দূরের কথা, ঘুমোতেও পারেননি বলে অভিযোগ। অনুষ্ঠানের আয়োজকদের অবশ্য উৎসাহে কোনও লাগাম নেই।

সোমবার সকালে দমদম পার্কে এক রক্তদান শিবিরের উদ্যোক্তারা পরীক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েই মাইক বাজিয়ে অনুষ্ঠান করেন। এ ছাড়াও দমদম পার্ক থেকে শ্যামনগর মোড় পর্যন্ত শব্দের তাণ্ডবে অতিষ্ঠ অবস্থা হয় পড়ুয়াদের। ছাতাকলে আবার সরস্বতী পুজো উপলক্ষে অনুষ্ঠানে ইতি পড়বে আগামী রবিবার। এ দিন সকালে ছিল বসে আঁকো প্রতিযোগিতা এবং সন্ধ্যায় পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মঙ্গল ও বুধবারও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রয়েছে। ফলে পরীক্ষা চলাকালীনও বক্স বাজার আশঙ্কায় পরীক্ষার্থীরা। স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলর চন্দনরানি পাল বলেন, ‘‘কারও যাতে অসুবিধা না হয়, দেখছি।’’

বেলেঘাটা এলাকার এক পুজোর উদ্যোক্তা বলেন, ‘‘অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা হয়েছিল বহু আগেই। তাই সোমবার সারা দিনের পরে মঙ্গলবার পরীক্ষার সময়টুকু বাদ দিয়ে মাইক বাজবেই।’’ সোমবার রাতেও বিসর্জনের সময়ে বক্স বাজানোয় কোনও লাগাম ছিল না।

এত কিছুর পরেও পুলিশ চুপ কেন? উত্তর কলকাতার মানিকতলা, শ্যামপুকুর ও বড়তলা থানার আধিকারিকেরা জানাচ্ছেন, সোমবার সকাল থেকেই পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে সতর্ক করে এসেছেন তাঁরা। শ্যামপুকুর থানার এক আধিকারিক বলেন, ‘‘আসল সমস্যা হল, সে ভাবে কোনও কড়া আইন নেই। দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের একটি ধারা এবং কলকাতা পুলিশের একটি ধারায় মামলা করা গেলেও ডেকে পাঠিয়ে সতর্ক করা ছাড়া আমাদের বিশেষ কিছু করার থাকে না। সেই কারণেই শব্দে লাগাম টানা যাচ্ছে না।’’ তবে পুলিশের আর একটি সূত্র জানাচ্ছে, সরকারি নির্দেশ অমান্য করা, অর্থাৎ, ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৮৮ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু পুলিশের সক্রিয়তা সে ভাবে চোখে পড়ে না বলে অভিযোগ। একই অভিযোগ উঠেছে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের বিরুদ্ধেও।

রবিবারই দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র জানিয়েছিলেন, তাঁদের মোবাইল টিম রাস্তায় ঘুরছে। চোখে পড়লেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরীক্ষার আগে এই শব্দতাণ্ডব কি দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চোখে পড়েছে? কল্যাণবাবু সোমবার ফোনে শুধু বলেন, ‘‘দিল্লিতে বৈঠকে ব্যস্ত আছি।’’ আর কিছু বলতে চাননি। পড়ুয়াদের শব্দযন্ত্রণার তা হলে কী হবে? লালবাজারের বক্তব্য, পাড়ায় পাড়ায় পুলিশ কড়া হাতে বিষয়টি আটকানোর চেষ্টা করছে। কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (১) জাভেদ শামিমকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি শুধু বলেন, ‘‘থানায় ফোন করে বলুন।’’

আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাসিন্দা, এ বারের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হিমাংশু দত্তের কথায়, ‘‘সবই সহ্য করে নিতে হচ্ছে। পুলিশকে ফোন করলে বলা হয়, থানায় গিয়ে অভিযোগ জানাতে। পরীক্ষার আগে পড়ব, না থানায় যাব?’’ উত্তর নেই কোনও মহলেই।