উস্কোখুস্কো চুল নিয়ে বছর তেরো-চোদ্দোর কিশোরটি ঘুরছিল বালিগঞ্জ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের এ-দিক ও-দিক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকে এ ভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখে রেল পুলিশের সন্দেহ হয়। ছেলেটিকে জিজ্ঞাসাবাদও করে তারা। কিন্তু বাড়ির ঠিকানা বা সেখানে কে রয়েছে— কিছুই বলতে পারেনি সে। ছেলেটিকে উদ্ধার করে হোমে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ করার পরে সে নিজেই জানায়, তার বাড়ি বাংলাদেশে।

বাংলাদেশে ওই কিশোরের ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে পুলিশ ও বেসরকারি এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা জানতে পারে, কেউ বা কারা তাকে ভুলিয়ে নিয়ে এসেছিল পাচার করতে। কিন্তু এ-পারে আনার পরে এ দেশে বা আরবে বিক্রি না-করেই তাকে ফেলে পালায় দুষ্কৃতীরা। কারণ, আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ-স্বাভাবিক মনে হলেও তার মানসিক সমস্যা রয়েছে। তা বুঝতে পেরেই পাচারকারীরা তাকে ফেলে পালায়। কারণ, এমন বাচ্চাকে বিক্রি করলে দাম মিলবে কানাকড়ি!

ও-পার বাংলা থেকে সুস্থ, স্বাভাবিক শিশু পাচারের ঘটনা প্রায় রোজই ঘটছে। কিছু ক্ষেত্রে উদ্ধার করা হলেও অকথ্য নিগ্রহের পরে অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে এই ধরনের বহু শিশুই। তাদের চেয়েও শারীরিক বা মানসিক ভাবে অসুস্থ বাচ্চাদের বহু গুণ লাঞ্ছনা সইতে হচ্ছে পাচারকারীদের হাতে। শিশুকল্যাণের কাজে যুক্ত সংস্থার কর্মীরা জানাচ্ছেন, সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশি শিশুদের এনে প্রথমে তাদের পাচার করা হয় এ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। পরে সেখান থেকে তাদের আরব মুলুকে পাঠানো হয়। কিন্তু মানসিক প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের পাচার-পণ্য করে বিশেষ লাভ হয় না দুষ্কৃতীদের। তাই এই ধরনের বাচ্চাদের এখানে-সেখানে ফেলে পালায় তারা। বিজয় বিশ্বাস (নাম পরিবর্তিত) নামে এই কিশোরের ক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছে বলে মনে করছেন উদ্ধারকারীরা।

কলকাতার চাইল্ডলাইন সূত্রে খবর, ৬ ফেব্রুয়ারি বালিগঞ্জ স্টেশনে ছেলেটিকে দেখে রেল পুলিশ ওই সংস্থায় খবর পাঠায়। সংস্থার লোকেরা ওই কিশোরকে নিয়ে যান কলকাতা শিশুকল্যাণ সমিতির কাছে। সমিতির নির্দেশেই প্রথমে তার স্থান হয় সরকার অনুমোদিত একটি আবাসিক হোমে। মানসিক সমস্যা থাকায় পরে বিজয়কে পাঠানো হয় ‘বোধিপীঠ’-এ।  ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চিকিৎসা চলে ওই কিশোরের। সেই সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যে ছেলেটির ছবি পাঠিয়ে তার বাড়ি ও পরিজনদের খোঁজে নামে ওই বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও পুলিশ। কিন্তু হদিস মেলেনি। ইতিমধ্যে বোধিপীঠে একটু সুস্থ হয়ে বিজয় জানায়, তার বাড়ি বাংলাদেশে। ছবি-সহ তার বিবরণ পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশের এক বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কাছে। তাদের তৎপরতায় কিশোরের বাড়ি ও পরিবারের খোঁজ মেলে।

বাড়ির খোঁজ মিলতেই রাজ্য সরকার গঠিত টাস্ক ফোর্সের মাধ্যমে শুরু হয় কিশোরটিকে বাড়ি পাঠানোর প্রক্রিয়া। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শেষে ৫ ডিসেম্বর ওই কিশোরকে তুলে দেওয়া হয় তার পরিবারের হাতে। কলকাতা চাইল্ডলাইন জানাচ্ছে, গত তিন-চার বছরে তাদের মাধ্যমে ৪৫-৪৬টি বাংলাদেশি কিশোর-কিশোরীকে বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু মানসিক প্রতিবন্ধী বাচ্চারা এক বার পাচারকারীদের খপ্পরে পড়লে বারবার পাচারের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এক পাচারকারী দল যদি ফেলেও পালায় বা তাদের হাত থেকে শিশুটি যদি কোনও ভাবে রেহাই পেয়েও যায়, এ রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা অন্য কোনও পাচারকারী দল তাকে কব্জা করে ফেলে। বিক্রি করে তেমন দাম মিলবে না বুঝেই স্টেশনে বা রাস্তায় তাদের নামানো হয় ভিক্ষার কাজে। এই ধরনের দুষ্কৃতীদের পাল্লায় পড়লে বাংলাদেশি বিজয়কে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হতো বলে মনে করছে চাইল্ডলাইন।