মা-মেয়ের বন্ধনই কলকাতায় ক্যানসার-যুদ্ধে চুল উপহার দেওয়ার মঞ্চের ভিত গড়ে দিল। সেই ভিতে মাত্র সাত বছর বয়সেই অজানা-অপরিচিতদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করল তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। শহরতলির ৪৫ বছরের মা এবং ২০ বছরের তরুণী কন্যা পরস্পরের হাত ধরে সাতসকালে কলকাতার ময়দানে হাজির হলেন। আর শাশুড়ি মায়ের যন্ত্রণা অনুভব করে কেশ দান করলেন চিকিৎসক বৌমা! 

ক্যানসারে কেমোথেরাপির পরে চুল ঝরতে শুরু করলে বহু ক্ষেত্রে তা রোগীদের মনের উপরে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। চিকিৎসকদের মতে, আশপাশের মানুষের বক্র দৃষ্টি, অনভিপ্রেত মন্তব্যে রোগীদের যন্ত্রণা বাড়ে। মনের চাপ কাটানোর জন্য রোগীদের পরচুলা (উইগ) ব্যবহারের পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। তবে কৃত্রিম চুলের মান ভাল হওয়া দরকার। বিপুল চিকিৎসার খরচ বহন করে উন্নতমানের উইগ ব্যবহার করার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয়ের সামর্থ্য অনেক রোগীরই থাকে না। তাঁদের কথা ভেবে, ১২ ইঞ্চি চুল দান করার জন্য রবিবার সকালে কলকাতার ময়দানে রেঞ্জার্স গ্রাউন্ডে হাজির হওয়ার ডাক দিয়েছিল ‘হেয়ার ফর হোপ ইন্ডিয়া’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। সেখানেই চুল দান করলেন এক স্কুলছাত্রী, কলেজপড়ুয়া তরুণী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং এক চিকিৎসক। তাঁদের সেই পদক্ষেপই তুলে ধরল কয়েক জন মা-মেয়ের এক মধুর এবং প্রত্যয়ী সম্পর্ক। আর এই পদক্ষেপের সাক্ষী রইলেন এ দিনের অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি অভিনেতা-মডেল মিলিন্দ সোমান। নিজের হাতে দাতাদের চুল কাটলেন তিনিই।

ভবানীপুরের বাসিন্দা সাত বছরের শিশুকন্যা কাব্য জৈনের কথাই ধরা যাক। এ দিন নিজের কেশগুচ্ছ দানের মঞ্চে সে ছিল কনিষ্ঠতম সদস্য। দিন তিনেক আগে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এই চুল দানের ব্যবস্থার কথা জানতে পারেন কাব্যের মা পেশায় ফ্যাশন ডিজাইনার প্রিয়াঙ্কা জৈন। নিজের ইচ্ছে থাকলেও, নিয়মকানুনের গেরোয় তাঁর পক্ষে চুল দান করা সম্ভব নয়। প্রিয়াঙ্কার কথায়, ‘‘মেয়েকে বললাম, বাবু তোর চুল তো অনেক বড়। 

ক্যানসার রোগী, যাঁদের চুল নেই, তাঁদের জন্য চুল দিবি? মেয়ে শুনে রাজি হয়ে গেল।’’ একরত্তি মেয়ের সিদ্ধান্ত দেখে সকলে যত প্রশংসা করছেন, ততই গর্বিত বোধ করেছেন মা। তিনি বলেন, ‘‘আবাসনে ফিরে সকলকে বলে এসেছে, ও কেন চুল কেটেছে। স্কুলেও বন্ধুদেরও চুল দান করতে বলবে বলছে। 

জানেন, এত লোক দেখেও ও কিন্তু পিছিয়ে আসেনি। চুল যখন কাটা হচ্ছে, তখনও চোখ-মুখে দৃঢ়তা। মেয়ের জন্য খুব গর্ব হচ্ছে। ও যেন এমনই থাকে।’’

সংবাদমাধ্যমে এই অনুষ্ঠানের কথা জেনে কেশ দানের ইচ্ছে হয়েছিল কোন্নগরের বাসিন্দা বছর পঁয়তাল্লিশের পূর্ণিমা ভঞ্জেরও। সেই ইচ্ছের কথা প্রথম জানিয়েছিলেন, মেয়ে দীপান্তিকাকে। সে কথা শুনে চন্দননগর গভর্নমেন্ট কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী দীপান্তিকা নিজের চুল দানের ইচ্ছে প্রকাশ করেন। পূর্ণিমার কথায়, ‘‘স্কেল দিয়ে মেপে দেখলাম, মেয়েরও ১২ ইঞ্চির অনেক বেশি চুল আছে। মেয়ে আব্দার করে বলল, মা আমিও দেব। বললাম, চল দু’জনেই দেব।’’ সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে গিয়ে মানসিক দ্বন্দ্ব কিছুটা হয়েছে বটে। তবে মা-মেয়ের মন সে সবে পাত্তা দেয়নি। পূর্ণিমা বলেন, ‘‘কে কী ভাবে নেবে, সেই ভাবনা এসেছিল। তবে নিজেকে বললাম, তিরিশ বছর এই চুল তো মাথাতেই ছিল। তা যদি অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে পারে, ফোটাক। চুল কাটার পরে যদি কেউ বাঁকা মন্তব্য করেন, তা হলে তার জবাবও তেমন হবে।’’ শনিবার রাতের ঝড়-বৃষ্টিতে অনেক ক্ষণ ট্রেনে আটকে ছিলেন। রাত ১২টা নাগাদ টিউশন থেকে ছোট মেয়ে উপত্যকাকে নিয়ে বাড়ি পৌঁছন। দীপান্তিকার কথায়, ‘‘ইচ্ছেটা বড্ড বেশি ছিল। তাই ভোর সাড়ে ৪টের ব্যান্ডেল লোকাল ধরে বেরিয়ে পড়লাম।’’

এই সম্পর্কের টানেই কেশগুচ্ছ দানের মঞ্চে হাজির হন পেশায় চিকিৎসক আরুণি গর্গও। শাশুড়ি মা ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পরে খুব কাছ থেকে চুল পড়া নিয়ে তাঁর মানসিক যন্ত্রণার সাক্ষী থেকেছেন। সে জন্যই গত এক বছর ধরে সযত্নে চুল আগলে রেখেছিলেন এমন একটি মঞ্চের জন্য। আরুণির কথায়, ‘‘আমার পরিবারের সদস্যেরা চুল বড় করার কারণ জানতেন না। আজ জানার পরে সকলে আশীর্বাদ করেছেন।’’

মা-মেয়ের এই মঞ্চ তৈরি করে দেওয়ার কারিগর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সিইও প্রেমী ম্যাথিউ বলছেন, ‘‘১১টি রাজ্য ঘুরে কলকাতায় এই শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল। একেবারে অন্য রকম অভিজ্ঞতা।’’