হাঁটাপথে দু’টি জায়গার মধ্যে খুব বেশি হলে দশ মিনিটের দূরত্ব। 

৩৯ নম্বর শঙ্কর ঘোষ লেন। বিদ্যাসাগর কলেজের ঠিকানা। যেখানে সম্প্রতি বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা নিয়ে বাংলার রাজনীতি উত্তাল। 

দ্বিতীয় ঠিকানাটি ৪৮এ এবং ৪৮বি কৈলাস বসু স্ট্রিট। ইতিহাসবিদদের মতে, এখানেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রথম বিধবা বিবাহের আয়োজন করেন। পাত্র ছিলেন রামধন তর্কবাগীশের ছেলে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন আর পাত্রী ব্রহ্মানন্দ মুখোপাধ্যায় ও লক্ষ্মীমণি দেবীর মেয়ে দশ বছরের বাল্যবিধবা কালীমতী। বিদ্যাসাগর ছাড়াও বহু বিশিষ্ট মানুষ সেই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন।

বিদ্যাসাগরের বন্ধু রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই বাড়ির ঠিকানা সেই সময়ে ছিল ১২ নম্বর সুকেশ স্ট্রিট। 

ফলে অনেকেরই প্রশ্ন, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রতিবাদে বাঙালি যতটা সরব, ততটা কি আদৌ সক্রিয় তাঁর যুগান্তকারী কর্মকাণ্ডের ইতিহাস সংরক্ষণে? তাঁদের প্রশ্ন, বিদ্যাসাগরের জন্মের দু’শো বছর পার করেও প্রথম বিধবাবিবাহের জায়গাটি চিহ্নিত করে তার সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ বা নিদেনপক্ষে একটি ফলক কেন লাগানো হয় না? 

বিদ্যাসাগর কলেজেরই ইতিহাস বিভাগ থেকে ২০১৮ সালে একটি গবেষণাধর্মী পুস্তক প্রকাশিত হয়েছিল। যার নাম, ‘উনিশ শতক থেকে ৩৯ শঙ্কর ঘোষ লেন-এর প্রতিবেশীরা।’ তাতেই নথিপ্রমাণ দিয়ে দেখানো রয়েছে, সেই সময়ে ১২ নম্বর সুকেশ বা সুকিয়া স্ট্রিটের ঠিকানা বদল হয়ে ঠিক কোন ঠিকানা হয়েছে, তা নিয়ে নানা রকম মত রয়েছে। ফলে এই রকম একটি ঐতিহাসিক জায়গা চিহ্নিত করা প্রয়োজন বলেও তাঁরা জানিয়েছেন। 

এই কলেজের ইতিহাস বিভাগের বর্তমান প্রধান শেখর ভৌমিক জানান, ১৮৫৬, ১৮৭৮, ১৮৯৩, ১৯১৫ ও ২০১৫ সালের স্ট্রিট ডিরেক্টরি ঘেঁটে এবং কৈলাস বসু স্ট্রিট ঘুরে তাঁরা বহু তথ্য পেয়েছেন। দেখা গেছে, ৪৮এ ও ৪৮বি জোড়া বাড়ির পাশাপাশি ৩২এ এবং ৩২বি বাড়িটিও আগেকার ১২ নম্বর সুকেশ স্ট্রিটের পরিবর্তিত ঠিকানার দাবি রাখে। অর্থাৎ, এমনও হতে পারে যে, প্রথম বিধবাবিবাহের স্থান ছিল এখনকার এই ভগ্নস্তূপে পরিণত ৩২এ ও বি ঠিকানার বাড়ি। কিন্তু অভিযোগ, প্রকৃত জায়গা চিহ্নিতকরণের চেষ্টা সরকার, পুরসভা বা হেরিটেজ কমিটি করেনি।

শেখরবাবুর কথায়, ‘‘রাজকৃষ্ণবাবুর সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতেই প্রথম বিধবাবিবাহ হয়েছিল। কিন্তু সেই বাড়ির বর্তমান অবস্থান নিয়ে সংশয় রয়েছে। রাধারমণ মিত্র, শ্রীপান্থেরা লিখেছেন, ৪৮এ এবং ৪৮বি কৈলাস বসু স্ট্রিটের বাড়িই হল সেই বাড়ি। আবার ১৯১৫-র স্ট্রিট ডিরেক্টরির নতুন সংস্করণে ৩২ এ এবং বি নম্বর কৈলাস বসু স্ট্রিটের বাড়িতেই ওই বিয়ে হয়েছিল বলে জয়ন্ত বাগচীর সংযোজন রয়েছে। সম্ভবত প্রথমে রাজকৃষ্ণবাবু এই বাড়িতেই থাকতেন, পরে তাঁর ভদ্রাসন বদল হয়।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘আমরা মনীষীদের মূর্তি ভাঙার প্রতিবাদ করছি কিন্তু ইতিহাস রক্ষার তাগিদ আমাদের নেই।’’

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

বিদ্যাসাগর কলেজের গবেষকেরা জানান, কৈলাস বসু স্ট্রিটেই ৩০এ, ৫০বি/১ এর লাহা বাড়ি সম্বন্ধে পূর্ণচন্দ্র দে কাব্যরত্ন উদ্ভটসাগরে লিখেছেন, ওই বাড়িতেই বিদ্যাসাগরের ‘মেট্রোপলিটন কলেজ’ ও ‘ল ক্লাস’ ছিল। তাঁর বয়ানে—‘১৮৮৬-তে আমি এইখানে ‘ল-ক্লাসে’ পড়িতাম’। আবার ৫২বি কৈলাস বসু স্ট্রিটের বাড়িতে ১৮৬৯-এ বিদ্যাসাগর তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায়কে সংস্কৃত প্রেস ও ডিপজিটারি দান করেন। পরে মতপার্থক্য হওয়ায় নিজের লেখা বইপত্র তুলে নিয়ে ১৮৮৫ সালে এখানে ‘দ্য ক্যালকাটা লাইব্রেরি’ নামে বইয়ের দোকান খোলেন। কিন্তু অভিযোগ, এই সব ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ভবন রক্ষায় কেউ উদ্যোগী হননি।

কলকাতা পুরসভার হেরিটেজ কমিটির প্রাক্তন সদস্য দেবাশিস বসুর কথায়, ‘‘বাম আমলে প্রথম কমিটি তৈরির পরে কলকাতার হেরিটেজ ভবনগুলির যে ক্যাটিগরি বা প্রকার ভাগ করা হয় তার মধ্যে ‘সামাজিক আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ’ ভাগটাই ছিল না। আমরা যে প্রাথমিক তালিকা করেছিলাম সেটিও সম্পূর্ণ ছিল না।’’ তিনি বলেন, ‘‘তিন জন স্থপতিকে বাড়িগুলি চিহ্নিত করতে বলা হয়েছিল। তাঁরা শুধু দক্ষিণের কিছু বাড়ি চিহ্নিত করে কাজ বন্ধ করেন।’’ 

হেরিটেজ কমিটির আহ্বায়কের পদ থেকে গত ডিসেম্বরে অবসর নেওয়া সুব্রত শীল বলেন, ‘‘হেরিটেজ তালিকায় কলকাতার কোন কোন বাড়ি রয়েছে ঠিক জানি না। বিদ্যাসাগর কোথায় বিধবাবিবাহ দিয়েছিলেন বলতে পারব না।’’ এই কমিটির সদস্য ইতিহাসবিদ প্রণব চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘হেরিটেজ কমিটি শুধু বিভিন্ন পুরনো বাড়ি ভাঙা নিয়ে জটিলতা হলে তা দেখে। কোনও বাড়িকে হেরিটেজ ঘোষণা করতে হলে বা কোনও বোর্ড লাগাতে হলে স্থানীয় কাউন্সিলর বা জনপ্রতিনিধিরা যদি আবেদন করেন তবে আমরা দেখি।’’