শহর জুড়ে বাড়ছে টাইপ-১ ডায়াবিটিসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। অথচ সরকারি স্তরে এখনও নথিভুক্তিকরণের কোনও ব্যবস্থাই নেই। যার জেরে সমস্যায় পড়ছেন ভুক্তভোগীরা।

একটি বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ৯৭ হাজার শিশু ডায়াবিটিসে আক্রান্ত। কলকাতার মোট শিশুর ৫ শতাংশ টাইপ-১ ডায়াবিটিসে আক্রান্ত। কিন্তু সরকারি স্তরে তথ্য সংগ্রহের কোনও ব্যবস্থা না থাকার জেরে বিপদ আরও বাড়ছে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।

চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, টাইপ-১ ডায়াবিটিসের জেরে বারবার মূত্রত্যাগ, অতিরিক্ত খিদে, তৃষ্ণা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি যে কোনও ভাইরাল সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে পড়াশোনা, খেলাধুলো-সহ নানান কাজে। এমনকি সর্দি-কাশির সমস্যা বাড়ে। ঋতু পরিবর্তনের সময় বাড়তি ভোগান্তির ঝুঁকিও থাকে। বর্ষা কিংবা শীত শুরুর আগে জ্বর, কাশি, গলা ব্যথার মতো সমস্যা হয়। বারবার সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হলে ফুসফুসের ক্রনিক সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি তৈরি
হয়। টাইপ-১ ডায়াবিটিসের জেরে দেহের প্রতিষেধকগুলি অন্ত্রের স্বাভাবিক ক্রিয়া নষ্ট করে দেয়। পাশাপাশি, রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমতে থাকে। যার জেরে নিয়মিত ইনসুলিন ইঞ্জেকশন ব্যবহার করতে হয়। যাতে দেহে গ্লুকোজের মাত্রা ঠিকমতো থাকে। তবে, প্রতি দিন ইঞ্জেকশন নেওয়া অনেক সময় কম বয়সিদের মানসিক চাপ তৈরি করে। অনেক সময় আত্মবিশ্বাসেও ঘাটতি তৈরি করে।

এ প্রসঙ্গে এন্ডোক্রিনোলজিস্ট তীর্থঙ্কর চৌধুরী বলেন, বেসরকারি হিসেব অনুযায়ী কলকাতার ডায়াবিটিস আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনক। খাদ্যাভাস ও বংশানুক্রমিক সমস্যাকেই মূলত টাইপ ১ ডায়াবিটিস আক্রান্ত হওয়ার কারণ হিসাবে নির্ধারিত করা হয়। কলকাতার ৫ শতাংশ শিশু এই রোগে আক্রান্ত। তাই সব স্তরে দ্রুত ডায়াবিটিসের সতর্কতা ও চিকিৎসা প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন করার প্রয়োজনীয়তা জরুরি। না-হলে নতুন প্রজন্ম সমস্যায় পড়বে। আর এক এন্ডোক্রিনোলজিস্ট নীলাঞ্জন সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘অন্ত্রের স্বাভাবিক কাজের ক্ষমতা কমতে থাকে। কম বয়সেই এ ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত হলে নানা ঝুঁকি তৈরি হয়। আধুনিক খাদ্যাভাস ও জীবনযাপনের ধরনের জেরেই বিপদ বাড়ছে। স্কুল স্তর থেকে সতর্ক হওয়া জরুরি।’’

আরও পড়ুন: দেশসেবার টানেই পূর্ণ শরবতি উৎকর্ষ

বিশেষজ্ঞরা জানান, আধুনিক জীবনযাপন ও খাদ্যাভাসের জেরেই এই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অতিরিক্ত তেলমশলা জাতীয় খাবার দেহের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কাজে বাধা তৈরি করছে। তার উপরে, শহুরে খাদ্যাভাসের কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবারের তালিকাই দীর্ঘ থাকে। শহরের শিশুদের জলখাবারে অধিকাংশক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরিমাণ চকলেট, মিষ্টিজাতীয় খাবারই দেখা যায়। তাই রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তার উপরে অধিকাংশ শহুরে শিশু, কিশোর-কিশোরী খেলাধুলোয় অভ্যস্ত নয়। দিনের অধিকাংশ সময়েই তারা বসে কাজ করে। ভিডিয়ো গেম খেলে কিংবা ইন্টারনেটেই অবসর সময় কাটায় তারা। এই অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জেরেই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

আরও পড়ুন: ভাড়াটে-বাড়িওয়ালার কাজিয়ার মধ্যে ভাতের হাঁড়িতে দগ্ধ শিশু

সরকারি স্তরে এখনও অবশ্য ডায়াবিটিসের তথ্য সংগ্রহে বিশেষ কোনও ব্যবস্থা নেই। যার জেরে দেশের কত সংখ্যক মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত কিংবা কোন কোন খাবার থেকে সমস্যা আরও বাড়ছে সে নিয়ে সচেতনতা প্রসারের কাজ তেমন হচ্ছে না। যার জেরে বিপদ আরও মারাত্মক হবে বলেই আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকেরা। তাঁরা জানান, ‘ডায়াবিটিস ক্যাপিটাল’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পথে ভারত। ডায়াবিটিস আক্রান্তের হিসেবে কলকাতার স্থানও প্রথম সারিতেই। কিন্তু তার পরেও সচেতনতা প্রসারে সরকারি স্তরে বিশেষ ভূমিকা নেই। যার জেরে সর্বস্তরে এ নিয়ে সচেতনতা তৈরি হয়নি। সরকারি স্তরে নথিভুক্তিকরণ প্রক্রিয়া শুরু হলে ডায়াবিটিসের প্রকোপ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি, গণসচেতনতার কাজও সহজ হবে।