‘‘তখন অল্প বয়স। লাফ দিয়ে পড়েছিলাম কাজে। ওখান থেকে একটা ৭২ ইঞ্চি জলের পাইপলাইন গিয়েছিল। মাটির উপরে বসানো মূর্তির চাপটা যাতে সরাসরি মাটির নীচের ওই পাইপলাইনে না পড়ে, সেটা দেখা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল।’’ স্মৃতিচারণা করছিলেন অশীতিপর মনোজকান্তি মজুমদার, কলকাতা পুরসভার প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রাক্তন ইঞ্জিনিয়ার। বলছিলেন, ‘‘পাইপলাইনের দু’পাশে দুটো কংক্রিটের কাঠামো তৈরি করেছিলাম। তার উপরে একটা বিম দেওয়া হয়েছিল।’’

অতঃপর শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে মাটির নীচের ওই বিমের উপরেই পনেরো ফুট এক ইঞ্চি উচ্চতাবিশিষ্ট নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ব্রোঞ্জের মূর্তিটি ১৬ ফুট উঁচু পাদপীঠে স্থাপন করা হয়েছিল। সেই ২৩ জানুয়ারি, ১৯৬৯ সালে। অর্ধ শতাব্দী আগে! প্রসঙ্গত, রাজ্য সরকারের উদ্যোগে রাজভবনের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে নেতাজির প্রথম মূর্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৬৫ সালে। শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের মূর্তিটি হল দ্বিতীয় মূর্তি, যা প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা খরচ করে মুম্বইতে তৈরি করা হয়েছিল। মুম্বই থেকে তিনটি ভাগ করে কলকাতায় আনা হয়েছিল। তারপর ভাস্কর নাগেশ যবলকারের তত্ত্বাবধানেই মূর্তিটি বসানো হয়েছিল শ্যামবাজারের পাঁচমাথায়।

তবে সে মূর্তি জন্মলগ্ন থেকেই বিতর্কিত! ঘটনাপ্রবাহ বলছে, ওখানে ওই মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হবে সে সম্পর্কে প্রথম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। ত্রিগুণা সেন মেয়র থাকাকালীন। তার দু’বছর পরে পরবর্তী মেয়র বিজয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে নিজের নামাঙ্কিত একটি শিলাখণ্ড প্রতিষ্ঠা করে এসেছিলেন। কিন্তু মূর্তি স্থাপনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও দশ-দশটা বছর! শেষ পর্যন্ত যখন ওই মূর্তি স্থাপন করা হল, তত দিনে ওই জায়গায় নেতাজির মূর্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে ২৭টি সভার আয়োজন হয়ে গিয়েছে। পুরসভার ১৬ জন প্রতিনিধিকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল স্পেশাল কমিটি, সেই কমিটির সদস্যেরা মুম্বই গিয়ে শিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত লক্ষ লোকের সমাগমে সুভাষচন্দ্রের ৭৩তম জন্মদিনে ওই মূর্তি উদ্বোধন হয়েছিল। তখন পুরসভার মেয়র ছিলেন গোবিন্দচন্দ্র দে। উদ্বোধনে লিখিত ভাষণ পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাকির হুসেন এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধী। অনুষ্ঠানে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর রেকর্ড করা ভাষণ প্রচার করা হয়েছিল। বাসন্তীদেবী পুরপ্রতিনিধিদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছিলেন, শুধুমাত্র সুভাষচন্দ্রের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না। বরং তাঁর আদর্শ, দেশপ্রেম, কীর্তিকে গ্রহণ করে সুভাষচন্দ্রের পরিকল্পনাকে যেন পুরসভার মাধ্যমে সার্থক করা হয়।

আরও পড়ুন: শীতের রাতে পাঁচিলে ওঁরা কারা!

কিন্তু উদ্বোধনের মুহূর্তেই তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছিল নেতাজির মূর্তির আকৃতি ও কাঠামো নিয়ে। ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘বীরকে নিয়ে ব্যঙ্গ’ শীর্ষক সংবাদে আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা হয়েছিল,—‘... একটা ক্ষুব্ধ গুঞ্জন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে, এ কেমন নেতাজী মূর্তি পৌরসভার? এ ওদের বীরের প্রতি ব্যঙ্গ।’ আরও লেখা হচ্ছে,—‘প্রথমত, এই মূর্তি নেতাজীর অবয়বের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। দ্বিতীয়, এই মূর্তি দেখে দেশের সর্বশ্রেণীর মানুষ হতাশ হয়েছে। তৃতীয়, এতে শৌর্যবীর্যময় নেতাজীর আসল মূর্তিকে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে।’

কিন্তু কেন এই ‘বিপর্যয়’?

সে সময়ের সংবাদপত্র-বই ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, আসলে লেফটেন্যান্ট-জেনারেল স্যার জেমস উট্রামের মূর্তির আদলে এটি গড়া হয়েছিল। এই মূর্তিটিকে উট্রামের মূর্তির ‘অক্ষম অনুকরণ’ও বলছেন অনেকে। ‘পর পর দু’টি বৈঠক মুলতুবি রেখে তাঁরা (নেতাজী স্পেশাল কমিটির কাউন্সিলরেরা) গাড়ি নিয়ে সদলবলে ময়দানে আউটরামের ঘোড়া দেখতে গিয়েছেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন। সাত-আট রকম অ্যাংগেল থেকে ফটো নিয়েছেন, তার পরে সেগুলি নিয়ে বোমবাই গিয়েছেন শিল্পীকে দিতে। সুতরাং ঘোড়াটি আলোচ্য হবে বইকি।’

আলোচনা, বিতর্কের সেই শুরু। যা এখনও চলছে। তবে হালের বিতর্ক মূর্তি নিয়ে নয়, নেতাজি মূর্তি আলোকিত করার উদ্দেশ্যে পুরসভার লাগানো আলো নিয়ে। কারণ, গত বছরই নেতাজি মূর্তিতে লাগানো দু’টি মেটাল হ্যালাইড আলো চুরি হয়ে গিয়েছিল। ফলে আরও একটি ২৩ জানুয়ারি আসার আগে পুর প্রশাসনের একাংশে আলোচনা শুরু হয়েছে, এ বার আর নেতাজির আলো চুরি ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না তো? পুরসভা সূত্রের খবর, প্রতি বছরের মতো এ বছরও ওখানে চারটি মেটাল হ্যালাইড, টুনি আলো-সহ একাধিক আলো লাগানো হবে। এক পদস্থ আধিকারিকের কথায়, ‘‘ভয়ে ভয়েই আলো লাগাতে হবে। এর আগের বার আলো কে নিল, সিসি ক্যামেরাতেও তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। দায়টা তো পুরসভার উপরই পড়বে।’’ আর দু’নম্বর বরোর চেয়ারম্যান সাধন সাহা বলেন, ‘‘গত বছরে আলো চুরির ঘটনার পরে আমরা সতর্ক। পুলিশকেও সে ভাবেই বলেছি আমরা। এখন নেতাজি মূর্তির আলোও যদি চুরি হয়ে যায়, কী আর বলা যাবে!’’