খুনের মামলায় অভিযুক্তের খালাস পাওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু রেড রোড-কাণ্ডে বিচারক যে ভাবে তদন্তকারীদের ত্রুটি উল্লেখ করেছেন, তা ‘বিরল’ ঘটনা বলেই মনে করছেন পুলিশের একাংশ। তাঁরা বলছেন, তদন্তের ত্রুটি অনেক সময়েই উঠে আসে। কিন্তু অভিযোগকারী এবং পুলিশ আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিল বলে বিচারক যে মন্তব্য করেছেন, তেমনটা সচরাচর শোনা যায় না। তবে বিচারকের কয়েকটি পর্যবেক্ষণ নিয়ে ভিন্ন মতও পোষণ করছেন পুলিশের অন্য অংশ।

শুধু তা-ই নয়, এ ক্ষেত্রে একটি দুর্ঘটনাকে কলকাতা পুলিশ জোর করে খুনের চেহারা দিতে চেয়েছিল বলেও মন্তব্য করেছেন কলকাতা নগর ও দায়রা আদালতের বিচারক মৌমিতা ভট্টাচার্য। তাঁর পর্যবেক্ষণ, অভিযোগকারী, পুলিশ, ময়না-তদন্তকারী চিকিৎসক— সবাই মিলে ঘটনাটিকে খুনের রূপ দিতে চেয়েছিলেন। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ট্র্যাফিক বিভাগের ফেটাল স্কোয়াডের (এফএসটিপি) বদলে তড়িঘড়ি গোয়েন্দা বিভাগের হোমিসাইড ও গুন্ডাদমন শাখা কেন তদন্ত করল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। ভবিষ্যতে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। ময়না-তদন্তকারী চিকিৎসকের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাঁর বিরুদ্ধে ‘মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’র কাছে শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন বিচারক। 

২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি সকালে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে তিনটি ব্যারিকেড ভেঙে কুচকাওয়াজের মহড়ার এলাকায় ঢুকে পড়েছিলেন সাম্বিয়া সোহরাব। তাঁর গাড়ির ধাক্কায় মারা যান বায়ুসেনার কর্পোরাল অভিমন্যু গৌড়। সেই ঘটনায় খুনের মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে কলকাতা পুলিশ এবং তদন্তভার সঁপে দেওয়া হয় গোয়েন্দা বিভাগকে। ঘটনার পরে কলকাতা ছেড়ে চম্পট দেওয়া সাম্বিয়াকে পাকড়াও করেন গোয়েন্দারা।

বিচারক বলেছেন, কলকাতা পুলিশ অ্যাক্ট এবং কলকাতা সাবার্বান পুলিশ অ্যাক্ট অনুযায়ী, পথ দুর্ঘটনার তদন্ত করার কথা এফএসটিপি-র। এ ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি গোয়েন্দা বিভাগকে তদন্তভার দেওয়া এবং অভিযুক্তকে পাকড়াও করতে তল্লাশি চালানো নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁর মন্তব্য, কলকাতা পুলিশ উত্তেজিত এবং আবেগতাড়িত হয়ে বিষয়টিকে খুনের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। যার ফলে মৃত ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে, এমন একটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল। 

যদিও রাজ্য পুলিশের এক প্রাক্তন আইজি-র মতে, কোনও ঘটনার গুরুত্ব বিচার করে পুলিশ কমিশনার নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তি বা দলকে তদন্তের ভার দিতেই পারেন। তার মানেই পুলিশ ‘অতিসক্রিয়’, এমনটা ভেবে নেওয়া ঠিক নয়। রেড রোড-কাণ্ডের সময়ে লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগে ছিলেন, এমন এক পুলিশকর্তার মতে, ফোর্ট উইলিয়াম সংলগ্ন এলাকায় একাধিক ব্যারিকেড ভেঙে জওয়ানকে পিষে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে আর পাঁচটা পথ দুর্ঘটনাকে এক করে দেখতে চাননি তাঁরা। ওই ঘটনার পরে অভিযুক্ত যে ভাবে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তা-ও সব ক্ষেত্রে দেখা যায় না। উপরন্তু, সেনার তরফে খুনের অভিযোগও দায়ের করা হয়েছিল। তাই খুনের মামলা রুজু করেই তদন্ত করতে হয়েছে।

ওই পুলিশ আধিকারিকের মন্তব্য, ‘‘সরকারি কৌঁসুলিরা হয়তো এই যুক্তি ঠিক ভাবে আদালতে তুলে ধরতে পারেননি। যার ফলে গোটা বিষয়টি অন্য ভাবে প্রতিভাত হয়েছে।’’ সাম্বিয়া সোহরাবের দুই আইনজীবী অশোক বক্সী এবং ফজলে আহমেদ অবশ্য বলছেন, আদালত যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। ময়না-তদন্তকারী চিকিৎসক অনুমানের উপরে ভিত্তি করে রিপোর্ট দিয়েছিলেন বলে মত তাঁদের।

এই রায় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা-প্রধান প্রবীণ ত্রিপাঠী বলেন, ‘‘আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে যাওয়া হবে।’’