দশ বছর আগের ঘটনার পুনর্তদন্তের আর্জি জানিয়ে তথ্য জানার অধিকার আইনে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তারই প্রেক্ষিতে কলকাতা পুলিশের জবাবপত্রে প্রতিফলিত হয়েছে দু’টি স্বীকারোক্তি। তাতেই সরকারি হাসপাতালের ওষুধ ও চিকিৎসার সরঞ্জাম খোলা বাজারে পাচার হওয়ার তদন্তে গাফিলতির ইঙ্গিত স্পষ্ট বলে অভিযোগ করলেন ওই মামলার অভিযোগকারী।

কলকাতা পুলিশ সূত্রের খবর, ২০০৯ সালের ৩ জুন সার্পেন্টাইন লেনের বাসিন্দা, মামলার অভিযোগকারী জগন্নাথ দত্ত ওরফে টিঙ্কুর তথ্যের ভিত্তিতেই নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওষুধ, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম উদ্ধার করেছিল মুচিপাড়া থানার পুলিশ। চার্জশিট অনুযায়ী, সেই সামগ্রীর মূল্য ছিল এক লক্ষ টাকা। সার্পেন্টাইন লেনেরই বাসিন্দা এক ব্যক্তিকে চুরির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ সূত্রের খবর, পরে ধৃত আরও পাঁচ জন ছিলেন এনআরএসের কর্মী। এক সময়ে ছ’জনেই জামিনে মুক্ত হন। তথ্য জানার অধিকার আইনে আবেদনকারীর চিঠির উত্তরে কলকাতা পুলিশ লিখেছে, সরকারি হাসপাতালের ওষুধ, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম-সহ অন্যান্য চুরি হওয়া সামগ্রী নিয়মিত পেতে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন মূল অভিযুক্ত। উদ্ধার হওয়া সেই সব জিনিসের গায়ে লেখা ছিল, ‘হসপিটাল সাপ্লাই’, ‘নট ফর সেল’। এ গেল প্রথম স্বীকারোক্তি। দ্বিতীয় স্বীকারোক্তি হল, পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণের অভাবে ধৃতেরা ছাড়া পেয়ে যান!

এখানেই ওষুধ-কাণ্ডের তদন্ত ফের শুরু করার ভিত্তি খুঁজে পেয়েছেন মুচিপাড়া থানার কেস নম্বর ১৬২/০৯-এর অভিযোগকারী তথা আরটিআই-এর আবেদনকারী জগন্নাথ দত্ত। তাঁর কথায়, ‘‘প্রমাণের অভাবে ধৃতদের ছাড়া পেয়েছে বলে পুলিশ জানায়। তা হলে প্রকৃত দোষীর খোঁজে কি তদন্ত হয়নি?’’

এত বছর পরে এ নিয়ে চিঠি চালাচালি হচ্ছে জেনে হতবাক মামলায় ধৃত অভিযুক্তেরাও। মূল অভিযুক্ত বলেন, ‘‘একটি ছেলে হসপিটাল সাপ্লাই লেখা জিনিস নিয়ে এসেছিল। বাগড়ি মার্কেট থেকে ওষুধ, চিকিৎসার সরঞ্জাম কেনাবেচা করতাম। সেখান থেকেই হয়তো আমার কথা জানতে পেরেছিল!’’ কিন্তু তাঁর বাড়ি থেকেই তো চুরির সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে বলে চার্জশিটে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘১৮-২০ দিন জেল খেটেছি। আর কিছু বলতে চাই না।’’ 

ধৃত অন্য পাঁচ কর্মীর এক মহিলা এখন অবসরপ্রাপ্ত। আরও এক মহিলা এনআরএসে কর্মরত। তিনি বলেন, ‘‘জন্ম থেকে এই হাসপাতালে আছি। ছোট থেকে দেখেছি মূল অভিযুক্ত ছেলেটিকে আসতে। তাই হয়তো আমার নাম বলেছিল।’’ ধৃত এক পুরুষ কর্মী বলেন, ‘‘মূল অভিযুক্তকে চিনতাম না। আমাকে ফাঁসানো হয়েছিল। পাঁচ বছর ভুগেছি। এ নিয়ে কথা বলতে চাই না।’’ 

জগন্নাথের অভিযোগ, ‘‘২০০৬ সাল থেকে টানা লিখিত অভিযোগ করে ২০০৯ সালে সাফল্য আসে। কিন্তু চক্রের গোড়ায় পৌঁছনো যায়নি। ফলে ২০০৯ সালে এনআরএসের বিষয়টি সামনে এলেও সরকারি হাসপাতালের ওষুধ, স্টেন, পেসমেকার, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম এখনও পাচার হচ্ছে।’’

যদিও অভিযোগ খারিজ করেছেন রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা প্রদীপ মিত্র। মেডিক্যাল কলেজগুলিতে এমন চক্র যে ওঁত পেতে থাকে তা স্বীকার করে বলেন, ‘‘এ সব আগে হত। এখন এক জন স্টোর মেডিক্যাল অফিসার আছেন। ইন্টারনাল অডিটর আছেন। স্টোর ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল থেকে সরঞ্জাম চুরি যাওয়া সহজ নয়!’’ জগন্নাথের পাল্টা দাবি, সম্প্রতি অন্তত তিনটি মেডিক্যাল কলেজের সামগ্রী চুরি গিয়েছে। সে সব বাজেয়াপ্তও হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে প্রদীপবাবু বলেন, ‘‘সরকার একটা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এমন কিছু ঘটলে সেই ব্যবস্থা কার্যকর করার দায়িত্ব মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষগুলির। স্বাস্থ্যভবন কী করবে?’’ পুলিশ জানিয়েছে, আদালত যদি তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেয় তাহলে পুলিশ সেই মতো পদক্ষেপ করবে।