খালের ধার দিয়ে হাঁটতে গেলেই দুর্গন্ধের চোটে নাকে রুমাল চাপা দিতে হয়। কারণ, নর্দমাবাহিত হয়ে ওই খালে এসে পড়ছে আশপাশের বিভিন্ন ছোটখাটো গলির বর্জ্য জল। তাতে মিশে থাকছে ওই এলাকার অবৈধ ট্যানারিগুলির নোংরা জলও। দিনের পর দিন এ ভাবেই দূষিত হয়ে চলেছে ওই খাল। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ এলাকার বাসিন্দারাও।

তিলজলা, তপসিয়া-সহ দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশে রমরমিয়ে চলছে চামড়ার জিনিস তৈরির ওই সমস্ত কারখানা বা ট্যানারি। ট্যানারির দূষণ রুখতে আন্দোলন হয়েছে। পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ওই এলাকার বেশির ভাগ ট্যানারি লেদার কমপ্লেক্সে স্থানান্তরিত হলেও বেশ কিছু ট্যানারি এখনও রয়ে গিয়েছে। গত বছরের বর্ষায় ওই এলাকায় জল জমে যাওয়ায় ট্যানারির জমা বর্জ্যকেই তার জন্য দায়ী করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। প্রশ্ন উঠেছে, দূষণ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সরব হলেও পূর্ব কলকাতার ট্যানারি নিয়ে কতটা সরব তাঁরা? 

ট্যানারির দূষণ যে পরিবেশের ক্ষতি করে, তা অবশ্য এঁরা প্রত্যেকেই মেনে নিচ্ছেন। তবে সামগ্রিক ভাবে পরিবেশ দূষণকেই সুস্থ ও সুন্দর জীবনধারণের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দেখছেন তাঁরা। দক্ষিণ কলকাতার সিপিএম প্রার্থী নন্দিনী মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘প্রচার কর্মসূচিতে তো বটেই, জনপ্রতিনিধি হয়ে লোকসভায় গেলেও শহরের সামগ্রিক দূষণের কথাই বলব। তিলজলা বা তপসিয়া অঞ্চলের ট্যানারি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।’’ তাঁর মতে, শুধু কলকাতাই নয়, সারা বিশ্বেই পরিবেশ দূষণ এক ভয়াবহ সমস্যা। 

এলাকার কংগ্রেস প্রার্থী মিতা চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘ট্যানারির দূষণ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন পৃথক পরিকল্পনার। জনগণ সুযোগ দিলে বিষয়টি লোকসভায় তুলে ধরব। এক জন পরিবেশকর্মী হিসেবেও ট্যানারির দূষণ প্রতিরোধ করা দরকার বলে মনে করি।’’ তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় সরকারকেও এই বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

বিজেপি প্রার্থী চন্দ্র বসুর মতে, ট্যানারির দূষণই এ শহরের সব চেয়ে বড় দূষণ। তাঁর কথায়, ‘‘বিজেপি পরিবেশকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ছাড়া, পরিবেশের উন্নতিকল্পে কেন্দ্রীয় সরকারের অনেকগুলি প্রকল্প রয়েছে। ভোটে জিতলে কলকাতার ট্যানারির দূষণ নিয়ে সরব হব।’’ তৃণমূলের প্রার্থী মালা রায় বলেন, ‘‘বর্তমানে ওই এলাকায় ট্যানারির পরিস্থিতি কী, তা পর্যালোচনা করা দরকার। শহরকে দূষণমুক্ত রাখা আমাদের প্রধান কর্তব্য।’’

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, তিলজলা, তপসিয়া, ট্যাংরা ও পাগলাডাঙা মিলিয়ে ৫৪৩টি ট্যানারি ছিল। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বানতলা চর্মনগরীতে কিছু ট্যানারি সরানো হলেও বাকিগুলি আগের জায়গাতেই রয়ে গিয়েছে। ‘ক্যালকাটা লেদার কমপ্লেক্স’-এর সাধারণ সম্পাদক ইমরান আহমেদ খান বলেন, ‘‘১৯৯৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট শহর থেকে ট্যানারিগুলি সরানোর নির্দেশ দিলেও এখনও পর্যন্ত সব ক’টি ট্যানারি তুলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বর্তমানে তিলজলা-তপসিয়ায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০০টি ট্যানারি রয়েছে। সেগুলি থেকে দূষণও ছড়াচ্ছে।’’ তিনি জানান, জমি নিয়ে সমস্যা থাকায় প্রতিটি ট্যানারিকে তুলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব যায়নি। তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চর্মনগরীতে ওই ট্যানারিগুলিকে সরানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘গত বছর বর্ষার পরেই আমরা এলাকায় বেআইনি ট্যানারি বন্ধ করতে অভিযান চালিয়েছিলাম। বন্ধও করে দেওয়া হয়েছিল কয়েকটি। তাতেও সব সমস্যার সমাধান হয়নি।’’

ট্যানারি থেকে কী ধরনের দূষণ ছড়ায়?

রাজ্য পরিবেশ দফতর ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সমীক্ষা বলছে, ট্যানারির বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা যায় না। তা ছাড়া, ট্যানারির বর্জ্য জলে প্রচুর পরিমাণ অ্যাসিড এবং ক্রোমিয়াম থাকে, যা পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকারক। এই 

ক্রোমিয়াম আশপাশের পুকুর এবং নর্দমায় গিয়ে মেশে। ট্যানারির বয়লার থেকে যে গ্যাস নির্গত হয়, তা-ও পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকারক। পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত বলেন, ‘‘আদালতের নির্দেশের পরেও এখানে যে ভাবে ট্যানারি চলছে, তা বেআইনি। এই জল তপসিয়ার খাল দিয়ে সরাসরি বিদ্যাধরী নদীতে গিয়ে পড়ছে। সেখান থেকে যাচ্ছে সমুদ্রে। এই দূষণ রোধে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়িত করা যায়নি।’’