বাঁধানো ছবির ব্যক্তিকে দেখিয়ে ইশারায় ‘কে’ জানতে চাইতেই সপ্রতিভ একরত্তি ছ’বছুরে।

সোফার হাতলে বসে হাত দিয়ে লম্বা দাড়ি দেখায় শেখ রাজু। তার পরে বাঁ হাত কানে দিয়ে ডান হাত বাড়িয়ে গান গাওয়ার ভঙ্গি করে। দাড়ি আর সঙ্গীতের এই মোক্ষম সংযোগের একটাই অব্যর্থ ইঙ্গিত। আকার-ইঙ্গিতের ভাষা বা ‘ইন্ডিয়ান সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ’ (আইএসএল)-এ অভ্যস্ত শব্দহীন জনতা মুহূর্তে বুঝে যাবে কার কথা বলা হচ্ছে। তিনি ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’!

১৫৯তম জন্মদিনে তাঁকে এ বার নিজেদের ভাষায় উদ্‌যাপন করতে চান রাজুর মা রিনা বেগম, শ্রাবন্তী কয়াল, পারমিতা ঘোষ, সোনিয়া দাস বা সুমন্ত ঘোষেরা। তাঁরা বেশির ভাগই জন্ম থেকে বধির। কেউ আবার একরত্তি বয়সের দুরারোগ্য কোনও অসুখে শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন। তাঁদের কাছে ভাষা মানে কথাহীন ভাষা! হাতের মুদ্রা, ঠোঁটের ভঙ্গি আর চোখের তারার কাঁপনেই সেই ভাষায় রবীন্দ্রনাথ থেকে দেশের ভোটরঙ্গ বা ছোট-ছোট দুঃখসুখের কথা নিজেদের মধ্যে অনর্গল বকে যেতে পারেন তাঁরা।

বাংলা-হিন্দি-তেলুগু ইত্যাদির মতো আইএসএল-কে দেশের ২৩তম সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দিতে এক বছর ধরে জনস্বার্থ মামলা চলছে দিল্লি হাইকোর্টে। জন্মগত বধির পারমিতা-রিনাদের ‘কথা’ তর্জমা করছিলেন ‘সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ’ বিশারদ রজনী বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘‘এ ভাষা রপ্ত করার আগে পর্যন্ত আর পাঁচ জনের মধ্যে থেকেও ওঁরা নিজেদের সামাজিক অস্তিত্বটা বুঝতে পারতেন না। কানে শুনতে না-পারলেও ক্রমশ শিক্ষার মধ্যে দিয়ে লোকের ঠোঁট 

নাড়া বুঝে নেন ওঁরা। অস্ফুটে, জড়ানো জিভে কেউ কেউ অল্পস্বল্প কথাও বলেন। কিন্তু বধিরদের নিজেদের মধ্যে ‘কথা’ বলার সময়ে সাইন ল্যাঙ্গোয়েজই হল ভাষা!’’ 

সেই ভাষায় রবীন্দ্রনাথকে পড়ার বা মেলে ধরার চেষ্টাও বধিররা করে আসছেন সাধ্যমত। রবীন্দ্রগানের সঙ্গে অনেকেই নাচের ছন্দ নিখুঁত ভাবে রপ্ত করেছেন আকার-ইঙ্গিতের ভাষার নির্দেশ মেনেই। কিন্তু এই প্রথম আজ, পঁচিশে বৈশাখ অহীন্দ্র মঞ্চের একটি অনুষ্ঠানে নিজেদের ভাষায় রবীন্দ্র-কবিতা-গল্পের তর্জমা করবেন তাঁরা। বন্ডেল রোডের একটি বাড়িতে মহড়া চলছিল পুরোদমে। ‘বীরপুরুষ’ কবিতাটা অস্ফুটে মুখে উচ্চারণের সঙ্গে-সঙ্গে হাত নেড়েও ‘শোনাচ্ছিলেন’ প্রিয়াঙ্কা ঘোষ। রুদ্ধশ্বাস শ্রোতারা। ‘বীরপুরুষ’ অনেকেরই চেনা কবিতা। নামটা লিখে বোঝালেন শ্রাবন্তী।

বধিরদের দাবায় জাতীয় চ্যাম্পিয়ন তথা সাইন ল্যাঙ্গোয়েজের শিক্ষিকা পারমিতাও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর বক্তৃতাটা ঝালিয়ে নিলেন। তাঁর ‘কথা’-র ফাঁকে-ফাঁকে সবটা বাংলায় তর্জমা করছিলেন রজনী। বঙ্গভঙ্গ রুখতে রবীন্দ্রনাথের রাখিবন্ধনের গল্প শুনিয়ে পারমিতা ‘বললেন’, ‘১৯৪৭-এর দেশভাগের সময়ে কবি থাকলে মনে হয় না দেশটা ভাঙত এ ভাবে!’’ বধিরদের মধ্যে হাততালির রীতি খানিক আলাদা। পারমিতার ‘বলা’ শেষ হতেই সক্কলে একযোগে উপরে হাত তুলে তাঁদের নিজস্ব ভঙ্গিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ডেফ অ্যান্ড ডাম্ব স্কুল’-এর অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রামেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় বলছিলেন, ‘‘ইশারার এই ভাষাটা আরও পোক্ত হয়েছে গত এক দশকে।’’ ৬০০০টি শব্দ নিয়ে ইন্ডিয়ান সাইন ল্যাঙ্গোয়েজের অভিধান সম্প্রতি তৈরি হয়েছে দিল্লির ইন্ডিয়ান সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার-এর উদ্যোগে। আজীবন হুইলচেয়ার বন্দি, দিল্লি স্কুল অব ইকনমিক্সের কৃতী প্রাক্তনী নিপুণ মলহোত্র নিজে বধির নন। কিন্তু বধিরদের ভাষার অধিকারের দাবিতে জনস্বার্থ মামলা লড়ছেন। তাঁর মতে, এই সাঙ্কেতিক ভাষা মূক-বধিরদের আত্মপরিচয়ের অঙ্গ। ‘‘সাইন ল্যাঙ্গোয়েজে সিনেমা তৈরির চেষ্টাও হয়েছে। এই ভাষায় রবীন্দ্রচর্চাও খুব জরুরি’’— বলছেন তিনি। 

বধিরদের ক্রিকেটে তুখোড় সুমন্ত তাঁর দাদা সৌরভকে পাশে নিয়ে মেয়র থেকে পুরকর্তাদের কাছে ছুটেছেন এই ‘পঁচিশে বৈশাখ’ সফল করতে। বাংলাদেশের বধির সংগঠনের বন্ধুরাও সেখানে আসবেন। ব্যারাকপুরের একটি স্কুলে বধিরদের নৃত্যশিক্ষক ছবি নাথ বলছিলেন, ‘‘শুনতে না-পারলেও ছন্দের বোধ বা তালজ্ঞানে বধিরেরা পিছিয়ে নেই। গানের মানে সাইন ল্যাঙ্গোয়েজে বোঝানোর পরে কয়েক বার মহড়ায় ওঁরা নাচটা রপ্ত করে নেন।’’ হাতের মধ্যে ভালবাসার যত-কিছু আদর, সেবা, হৃদয়ের দরদ, অনির্বচনীয় ভাষার কথা ‘শেষের কবিতা’-য় অমিত রায়কে দিয়ে বলিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এ বার হাতের ভাষাতেও বিশ্বকবির ব্যাপ্তি ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে।