২৮ অক্টোবর, ২০১৯। ছেদ পড়েছিল শেষ ২৬ বছরের ওঠা-বসার রুটিনে। সারা জীবনের স্মৃতি হাতড়ে এখন জেগে সেই নাড়ি ছেঁড়ার টান। সদ্য প্রয়াত নবতিপর মা, চিকিৎসক যোগমায়া সেনের কথাই ঘুরেফিরে বলছিলেন এ শহরের অসংখ্য ‘কেয়ারগিভার’-এর ভিড়ে আড়াল হয়ে যাওয়া মেয়ে মিত্রা সেন মজুমদার। “ভিতরে, বাইরে বিরাট শূন্যতা। এতটা সময় কাটাব কী করে?” উত্তর খুঁজছেন অধ্যাপিকা মিত্রাদেবী।

দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ কোনও আপনজনের সেবা-শুশ্রূষা করতে করতে সঙ্গের মানুষটিকে অনেক সময়েই অবসন্নতা গ্রাস করে। অথচ, সেই প্রিয়জন চলে যাওয়ার পরে যে অখণ্ড অবসর, তা-ও যন্ত্রণাদায়ক। তাই প্রিয় মানুষটির শুশ্রূষা করার পাশাপাশি নিজেকেও ভাল রাখার কথা বলছেন ভারতী পাল, ঋতুপর্ণা ঘোষ গুপ্তেরা। গত ২৫ বছর ধরে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত স্বামী নন্দদুলাল পালের দেখভাল করেন ভারতীদেবী। ৭২ বছরের নন্দদুলালবাবুর দেখাশোনা, সংসার সামলেও সেলাই করে উপার্জন করেন তিনি। গত বছর তাঁর স্তনের ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসার পরে আপাতত সুস্থ ভারতীদেবী। তাঁর কথায়, “আমার উপরে এক জন নির্ভরশীল। তিনি ভাল থাকলেই আমিও ভাল থাকব, এই ভাবনাই কাজ করে। ওঁর সামনে বসেই নিজের ভাল লাগা (সেলাই) নিয়ে সময় কাটাই। সেই কারণেই হয়তো এখনও ক্লান্তি আসেনি।”

২০১৪ সালে মায়ের স্তন ক্যানসার শুনে আড়ালে কেঁদে নিজেকে সামলেছিলেন তিনি। গত পাঁচ বছরে অনেক পরিণত এই ‘কেয়ারগিভার’। হার মানার পাত্রী নন ঋতুপর্ণা। চিকিৎসার পাশাপাশি মা জয়শ্রী ঘোষের মানসিক শক্তি জুগিয়ে চলেছেন। তাঁর পরামর্শ, “সুস্থ করতেই হবে, আমাকে পারতেই হবে— এই মনোভাব রোগীর পাশাপাশি নিজেকেও লড়াইয়ের শক্তি দেবে।”

বাবা ও বোনের সঙ্গে অসুস্থ মায়ের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া প্রিয়জিৎ বিশ্বাসকে মূলত সামলাতে হয়েছিল অত্যুৎসাহী ও নেতিবাচক চিন্তার প্রতিবেশী-আত্মীয়দের। মায়ের উপরে বড্ড নির্ভরশীল ছিলেন কলেজছাত্রী স্নেহা মজুমদার। ধীরে ধীরে মাকে দেখভালের দায়িত্ব নিতে নিতে পরিণত হন তিনিও। মা ও পারকিনসন্সে আক্রান্ত ভাইকে সামলানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে মিত্রাদেবী অধ্যাপনার পাশাপাশি পারকিনসন্স আক্রান্তদের জন্য একটি সংগঠনও চালান। তাঁর মতে, দিনের অনেকটা সময় রোগ নিয়ে আলোচনা আর রোগীর সঙ্গে ওঠাবসা করায় কেয়ারগিভারদের উপরে প্রবল মানসিক চাপ তৈরি হয়। অনেক সময়ে না চাইলেও তাঁরা অসুস্থ মানুষটির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফেলেন। পরে যা নিয়ে আফশোস হয়। এর অন্যতম কারণ, এ শহরে টাকা দিলেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আয়া মেলে না। ফলে সবটাই ভাবতে হয় তাঁদের।

তথ্য বলছে, ৩০ বছর পরে সারা বিশ্বে মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ মানুষেরই বয়স ৬৫ বছরের বেশি হবে। অতএব পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বাধিক জনসংখ্যার এই রাষ্ট্রকে এখন থেকেই তাঁদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব নিয়ে সামগ্রিক ভাবনাচিন্তা করতে হবে। এমনটাই বলছেন চিকিৎসকেরা। ক্যানসার রোগীদের নিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা চালান শিশুরোগ চিকিৎসক অগ্নিমিতা গিরি সরকার। তাঁর কথায়, “কেয়ারগিভারদের সমস্যা এবং তার সমাধান নিয়ে সে ভাবে ভাবাই হয়নি। ওঁদের নিয়ে আগামী ১২ তারিখ একটি অনুষ্ঠান করছি।’’ মনোরোগ চিকিৎসক জয়রঞ্জন রামের মতে, “বিদেশে কেয়ারগিভিং একটি পেশা। পরিবার ছাড়াও টাকার বিনিময়ে তা মেলে। ওখানে সরকারও সেই পরিষেবা দেয়। আমাদের দেশে সেটা এখনও দূর।” তাঁর মতে, এ দেশে কেয়ারগিভারদের সমস্যা মেটাতে পরিবারের সকলকে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।

একা কেয়ারগিভারদের জন্য মনোরোগ চিকিৎসক অনিরুদ্ধ দেবের পরামর্শ, ‘‘নিজেকে সময় দিতে হবে। মাঝেমধ্যে সিনেমা দেখুন, পছন্দের লোকজনের সঙ্গে সময় কাটান। কখনও আবার অসুস্থ মানুষটিকে নিয়েও সিনেমা দেখুন, আড্ডা মেরে আসুন, কয়েক দিনের জন্য হাওয়া বদল করুন। একঘেয়ে জীবন থেকে দু’জনেরই মুক্তি মিলবে।’’ তাঁর মতে, “থাকার জায়গা যতটুকুই হোক, সাজিয়ে রাখুন। খাবার যতটুকুই খান, যেন পরিপাটি হয়। ছোট ছোট এই সমস্ত জিনিস মন ভাল করে দেয়। কোনও বিষয়ে উৎসাহ থাকলে তা নিয়েও খানিকটা সময় কাটান।”

মোট কথা, নিজের যত্ন নিতে হবে। তবেই অসুস্থ মানুষটির উপযুক্ত সঙ্গী হওয়া যাবে।