সংঘর্ষের আশঙ্কা ছিল। বাস্তবে সেটাই ঘটল।

তবে সিন্ডিকেটের ময়দানে নয়, এই লড়াইয়ের প্রথম সাক্ষী থাকল রাজারহাটের ডিরোজিও মেমোরিয়াল কলেজ।

যুযুধান দু’পক্ষ হল: সদ্য তৃণমূলে যোগ দেওয়া রাজারহাটের প্রাক্তন সিপিএম নেতা তাপস চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর দলবল এবং তৃণমূল বিধায়ক সব্যসাচী দত্তের অনুগামী বলে পরিচিত তৃণমূল ছাত্র পরিষদের কর্মী।

দু’পক্ষের এই লড়াইয়ে প্রথমে হাতাহাতি, ইটবৃষ্টি কিছুই বাদ গেল না। লন্ডভণ্ড হল কলেজ ক্যাম্পাস। ভাঙা হল অসংখ্য চেয়ার। দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে ঘণ্টা দেড়েক কার্যত রণক্ষেত্র হয়ে থাকল কলেজ চত্বর। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। 

কলেজে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের অভিযোগ, এই সংঘর্ষে কয়েকজন ছাত্র আহত হয়েছেন। তাপস চট্টোপাধ্যায়ের অনুগামীদের কলেজের বাইরে এবং সব্যসাচী দত্তের গোষ্ঠীকে কলেজের মধ্যে রেখে গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয় পুলিশ।

কলেজ কর্তৃপক্ষও এই ঘটনার কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, ছাত্ররা অভিযোগ জানিয়েছে।  সেই অভিযোগ স্থানীয় থানায় পাঠানো হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কেও ঘটনাটি জানানো হয়েছে।

সিন্ডিকেট নিয়ে সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার এবং রাজারহাট-নিউটাউনের বিধায়ক সব্যসাচী দত্তের দ্বৈরথে এর আগেও এলাকায় অনেক বার রক্তারক্তি হয়েছে। পরিস্থিতি লাগাম ছাড়া হয়ে যাওয়ায় দলের শীর্ষস্তর থেকে এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। সম্প্রতি সাংসদের হাত ধরে বাম শিবির ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন তাপসবাবু। এই দলবদলের সময়েই সব্যসাচী দত্তের অনুগামী তৃণমূল কর্মীদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। এই তৃণমূল কর্মীদের অভিযোগ ছিল, সব্যসাচীবাবুর গোষ্ঠীকে বিপাকে ফেলতেই কাকলিদেবী তৃণমূলে ঢুকিয়েছেন তাপসবাবুকে। এ দিনের ঘটনার পরে সেই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। মঙ্গলবার কলেজ ময়দানে কার্যত এই লড়াইয়ের প্রাথমিক মহড়া হল বলে মনে করছেন এলাকার বাসিন্দারা।কাকলিদেবী অবশ্য প্রথম থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। 

এ দিন ঠিক কী ঘটেছিল ওই কলেজে?

কলেজ সূত্রে খবর, ২১ জুলাইয়ের তৃণমূলের সমাবেশের প্রচারের জন্য সম্প্রতি কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে একটি আবেদন জমা পড়ে। পঠনপাঠন এবং ভর্তির প্রক্রিয়া ব্যাহত না করার শর্তে গতকাল, সোমবার কলেজের গেটের বাইরে এ নিয়ে একটি সভা করার অনুমতি দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সোমবারের বদলে সেই সভা হয় মঙ্গলবার। এই সভায় ছিলেন তাপসবাবু, আফতাবউদ্দিন সহ কাকলিদেবীর অনুগামীরা। সেই সভায় তাপসবাবুকে সম্বর্ধনাও দেওয়া হয়। এই সভাকে ঘিরেই উত্তেজনা ছড়ায় কলেজ চত্বরে। ডিরোজিও কলেজে টিএমসিপি পরিচালিত ছাত্রসংসদ নেতাদের অভিযোগ, ২১ জুলাইয়ের সমাবেশের প্রচারের নামে আসলে ‘কলেজ-দখল’ করার চেষ্টা করছিলেন তাপসবাবু ও তাঁর দলবল। ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক অরিন্দম ঘোষ বলেন, ‘‘ওঁরা কলেজের ভিতরে ঢুকতে চেয়েছিল। আমরা তাতে বাধা দিই। এর পরে ওরা আমাদের শাসানি দিয়ে বলে, তাপসবাবুর দলে নাম না লেখালে কলেজে থাকা যাবে না।’’ এই নিয়ে গোলমাল শুরু হয়ে যায়।

কলেজের অধ্যক্ষ দিব্যেন্দু তলাপাত্র এ দিন বলেন, ‘‘কলেজে ঢুকে দেখি চারদিক লন্ডভণ্ড। চেয়ারগুলি ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। ছাত্ররা জানান, তাঁরা প্রহৃত হয়েছেন। তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রীকে জানানো হয়েছে।’’

এ দিন দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, কলেজ চত্বরে ভাঙা চেয়ারের টুকরো পড়ে রয়েছে। কলেজের ছাত্র সংসদের সদস্যরা তাপস চট্টোপাধ্যায় ও কাকলি ঘোষদস্তিদারের বিরুদ্ধে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দিচ্ছেন। কলেজ সূত্রের খবর, ডিরোজিও কলেজের পরিচালন কমিটির সভাপতি হলেন বিধায়ক সব্যসাচী দত্ত। তাপসবাবুকে ভোটে হারিয়েই বিধায়ক হয়েছিলেন সব্যসাচী। আবার রাজারহাট-গোপালপুর পুরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন তাপসবাবুও ছিলেন ওই কলেজ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, এত দিন সিপিএমে থাকায় নিজের খাসতালুক ওই কলেজে ঢুকতে পারছিলেন না তাপসবাবু। এ বার তিনি সেই কলেজ দখলের কাজ শুরু করে দিলেন। 

যদিও তাপসবাবু এই অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘কীসের দখল! আমি তো এখন তৃণমূলেরই সদস্য। কলেজে তৃণমূলেরই ছাত্র সংসদ।’’ এর পরেই তীর্যক ভাবে তিনি বলেন,  ‘‘আর এখানে কোনও দখলদারি চলবে না।’’ কিন্তু তিনি কেন বহিরাগত হয়েও কলেজে গিয়েছিলেন?

জবাবে তাপসবাবুর দাবি, ‘‘আমি কলেজে ঢুকিনি। ছাত্ররাই আমাকে সম্বর্ধনা দিয়েছে। তাই ওই সভায় যোগ দিয়েছিলাম। ২১ জুলাইয়ের মাহাত্ম্য প্রচারের জন্যই ওই সভা হয়েছিল।’’

যদিও বিধায়ক সব্যসাচী দত্ত এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘আমি অসুস্থ। শুনেছি গোলমাল হয়েছে। শান্তি বজায় রাখার বিষয়টি পুলিশ দেখছে। বাকি বিষয়টি  বাকি বিষয়টি অধ্যক্ষ দেখছেন।’’

কলেজে গোলমালের ব্যাপারে  শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এই ঘটনা কারা করেছে তা জানা যায়নি। কারও অভিযোগ, তাপস চট্টোপাধ্যায়ের অনুগামীরা করেছে, কেউ আবার  সব্যসাচীর অনুগামীদের নামে দোষারোপ করেছেন।’’ তৃণমূলের মহাসচিব হিসাবে তিনি বলেন, ‘‘যদি তাপসবাবুর অনুগামীরা এই ঘটনার জন্য দায়ী হন, তবে তাঁদের বলব, অনেকে আমাদের দলে নতুন ঢুকেছেন। তাঁদের দলের সমস্ত রীতিনীতি ও অনুশাসন মেনে চলতে হবে। দলের নীতির বিরুদ্ধে যায় এমন কোনও কিছুই দল মেনে নেবে না। আর সব্যসাচীর অনুগামীদের প্রতি তাঁর বার্তা: ‘‘বহিরাগতরা কোনও ভাবেই কলেজে ঢুকে কলেজের সম্পত্তি নষ্ট করলে তা কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। দল পুরো ব্যাপারটি খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ করবে।’’