ছ’দিন পরে, সোমবার সকালে রিয়া ফের খুলেছেন চায়ের দোকান। এমনকি, রবিবার রাতে ঘুমিয়েছিলেন পুরনো জায়গাতেই।

মাঝেরহাট সেতুর তলায়, ধসে পড়া অংশের পরেই রয়েছে রিয়া সিংহের চায়ের দোকান। সেতুর তলার অন্য দোকানের মালিকেরা দুর্ঘটনার দিন সেই যে চলে গিয়েছেন, আর দোকান খোলেননি। রিয়া বলেন, ‘‘আমরা আর কত দিন এ দিক-ও দিক ঘুরে বেড়াব? পেটটাও তো চালাতে হবে। তাই ফের এখানেই ফিরে এলাম।’’

বছর তিরিশ আগে উত্তরপ্রদেশ থেকে স্বামী যোগেন্দ্র সিংহের সঙ্গে কলকাতায় এসেছিলেন রিয়া। প্রথম থেকেই মাঝেরহাট এলাকায় থাকতে শুরু করেন। তবে মাঝেরহাট সেতুর তলায় চায়ের দোকান খোলেন বছর চারেক আগে। রিয়া জানান, ভালই চলছিল তাঁর দোকান। ওই এলাকায় মেট্রোর কাজ চলায় সুবিধেই হয়েছিল তাঁর। মেট্রোর ঠিকা শ্রমিকেরা আসতেন চা-বিস্কুট খেতে। রিয়া বলেন, ‘‘দোকানটা চলছিল বলে চায়ের সঙ্গে কিছু শুকনো মিষ্টিও রাখতে শুরু করেছিলাম। সেতু ভেঙে পড়ার পরে এ দিন ফের দোকান খুললাম। কিন্তু চারদিক তো ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। মেট্রোর শ্রমিকেরা নেই। দোকান কি আর আগের 

মতো চলবে?’’ রিয়ার দোকানের বাঁ পাশে ছিল পান-বিড়ির একটি গুমটি। ডান দিকেও কয়েকটি দোকান ছিল। রিয়া বলেন, ‘‘ওঁদের অনুরোধ করেছি, যেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসেন এখানে।’’

রিয়া জানান, দুর্ঘটনার দিন তিনি দোকানেই ছিলেন। সেতু পড়ে যাওয়ার পরে প্রথমে ভেবেছিলেন, ভূমিকম্প হচ্ছে। পরে বুঝতে পারেন, তাঁর দোকানের ঠিক সামনের অংশটাই ভেঙে পড়েছে। ভয়ে স্বামীকে নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যান তিনি। তাঁর আক্ষেপ, ‘‘মেট্রোর অনেক শ্রমিক রোজ চা খেতে আসতেন। কত রকম সুখ-দুঃখের গল্প হতো। ওঁদের কয়েক জনের ঝুপড়ি আমাদের দোকানের সামনেই ছিল। ওঁরাই তো আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন।’’

রিয়া জানান, আগেও দোকান বন্ধ করে রাতে সেতুর তলায় ঘুমোতেন। বুঝতে পারতেন, গাড়ি গেলে সেতু কাঁপে। তিনি বলেন, ‘‘মাস দু’য়েক আগে কয়েক জন বাবু দোকানে চা খেতে এসেছিলেন। কথায় কথায় বুঝতে পারি, সেতু পরীক্ষা করতে এসেছেন ওঁরা। আমি সেতু কাঁপার ব্যাপারটা বলেছিলাম। কিন্তু ওঁরা আমার কথায় পাত্তা দেননি। বলেছিলেন, সেতু পরীক্ষা করে দেখেছেন। সেতু ঠিকই আছে।’’ রিয়ার আফশোস, তখন যদি ওই বাবুরা তাঁর কথা একটু শুনতেন!

দোকান আগের মতোই চলবে সেই আশা নিয়ে রিয়া আর যোগেন্দ্র রবিবার ফিরে আসেন সেতুর তলায়। দোকানের আশপাশ সাফ করে ছোট সংসারটা ফের গুছিয়ে নিয়েছেন। চায়ের দোকানের পিছনে আগের জায়গাতেই আবার পেতেছেন ছোট তক্তপোশটা। 

যে সেতুতে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটল, সেই সেতুর তলায় রাতে শুতে ভয় করেনি? রিয়ার উত্তর, ‘‘অত ভয় পেলে চলবে কী করে? আমাদের থাকার  তো আর কোনও জায়গা নেই।’’ 

সেতুর গায়ে টাঙানো দুর্গার ছবি দেখিয়ে রিয়া বলেন, ‘‘মা দুর্গাই আমাদের সহায়।’’