কফি হাউসের চেয়ার টেনে বসে গল্পটা শুরু করলেন বছর আঠাশের সৌম্য বাগচী। জানালেন, তখন তিনি কলেজ স্ট্রিটেরই একটি স্কুলে একাদশ শ্রেণির ছাত্র। রোজকার মতো সে দিনও স্কুল ছুটির পরে সিগারেট কিনে কফি হাউসের নীচে প্রিয় গলিটায় গিয়ে ঢুকেছেন তাঁরা। এখনকার মতো তখনও সেখানে বিভিন্ন দোকানের বইপত্র ডাঁই করা থাকত। সরু গলিপথ সোজা বেরিয়ে যেত কফি হাউস ভবনের পিছনের মহাত্মা গাঁধী রোডের দিকে। আলমারিগুলোর ফাঁকে দাঁড়িয়ে চলত সিগারেট খাওয়া!

সে দিন কয়েক মিনিটের মধ্যেই অবশ্য সেই সুখ-স্মৃতি তাঁদের কাছে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। সৌম্য বলেন, ‘‘হঠাৎ দেখি, গলির এক দিক দিয়ে লাঠি হাতে ঢুকছেন আমাদের স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক। গলির অন্য দিক দিয়ে আসছেন অঙ্কের স্যর! খুব মার খেয়ে পরের দিন বাবাকে নিয়ে স্কুলে গিয়ে দেখা করতে হয়েছিল।’’

সৌম্যের কথা শেষ না হতেই সঙ্গী সৃজা সরকার বললেন, ‘‘সিগারেট খাওয়া, না খাওয়া নিয়ে এত বিতর্ক হয়। কফি হাউসেই দু’দিন আগে মারামারি হয়ে গেল! কিন্তু সিগারেট বন্ধ হল কই? ওই রকম শিক্ষকেরাও এখন আর নেই। ফলে কিছুই আটকাচ্ছে না। স্কুলের সামনেই দেদার সিগারেট বিক্রি হচ্ছে!’’ আজ, শুক্রবার, আরও একটি বিশ্ব তামাক-বিরোধী দিবসের আগে শহরের অন্যান্য আড্ডাস্থল ঘুরেও শোনা গেল একই আক্ষেপ। প্রায় সকলেই বলছেন, ‘‘দেশে তামাক-বিরোধী আইন আছে। কিন্তু সেই আইন পালন করানোর লোক নেই।’’

দীর্ঘদিন ধরেই তামাক-বিরোধী কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলি জানাচ্ছে, ২০০৩ সালেই দেশে ‘সিগারেটস অ্যান্ড আদার টোবাকো প্রোডাক্টস অ্যাক্ট’ (সিওটিপিএ) পাশ হলেও তা ফলিত স্তরে কার্যকর করা যায়নি এখনও। আইনের বিভিন্ন ধারা সম্পর্কে সচেতনতা নেই কলকাতার বড় অংশেরই। এ নিয়ে পুলিশ-প্রশাসনও উদাসীন থাকে বলে অভিযোগ। ফলে ২০১৬-’১৭ সালের ‘গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোবাকো সার্ভে’র রিপোর্ট অনুযায়ী, তামাক সেবনকারী দেশের তালিকায় ভারত বিশ্বে দ্বিতীয়। তামাক-বিরোধী এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তরফে ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত জানান, ২০১৭ সাল থেকে রাজ্যের ৩২টি সরকারি স্কুলে তামাক-বিরোধী প্রচার চালিয়েছেন তাঁরা। কথা বলেছেন ৬৬৩৮ জন পড়ুয়ার সঙ্গে। তবে বেআইনি হওয়া সত্ত্বেও স্কুলের ১০০ মিটারের মধ্যে কেন তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি হয়, ছাত্রদের সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি তাঁরা।

সিওটিপিএ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলা আরও একটি সংগঠনের তরফে স্নেহাংশু হাজরা জানাচ্ছেন, আইনের চার নম্বর ধারায় জনসমক্ষে ধূমপান বা তামাকের ব্যবহার নিষিদ্ধ। তেমনই পাঁচ নম্বর ধারায় তামাকের বিজ্ঞাপন দেওয়া এবং ৬এ ধারায় ১৮ বছরের নীচের কাউকে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করাও বেআইনি ঘোষিত হয়েছে। আর ৬বি ধারায় স্কুল, কলেজের একশো মিটারের মধ্যেই তামাকজাত দ্রব্য বিক্রির উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। তবু এর প্রায় কিছুই বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ।

অথচ, আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে মনে করলে পুলিশকেও স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে সিওটিপিএ। পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর বা আরও উচ্চ পদমর্যাদার আধিকারিকেরা এ নিয়ে মামলা রুজু করে তদন্ত করতে পারেন। বেআইনি ভাবে তামাক-দ্রব্য তৈরি বা বিক্রি করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে দু’বছর হাজতবাস বা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। একই অপরাধে ফের দোষী সাব্যস্ত হলে পাঁচ বছরের হাজতবাস বা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। কিন্তু স্নেহাংশুবাবুর মতে, ‘‘স্কুল-কলেজের কাছে তামাক-দ্রব্য বিক্রি বা প্রকাশ্যে ধূমপান করলে এখনও জরিমানা স্রেফ ২০০ টাকাই। জরিমানার অঙ্ক এত কম হওয়াতেই কারও হুঁশ ফিরছে না।’’

হুঁশ ফেরাতে বিশ্ব তামাক-বিরোধী দিবসের আগে কলকাতা পুলিশ কি নতুন কিছু করার কথা ভাবছে? লালবাজারের এক কর্তা শুধু বললেন, ‘‘সচেতনতামূলক প্রচার আগের মতোই থাকছে।’’

সেই সচেতনতায় কাজ না হলে? এ প্রশ্নের অবশ্য উত্তর নেই পুলিশ-প্রশাসনের কারও কাছেই।