দীর্ঘদিন ধরে চলা অভ্যন্তরীণ অশান্তি থেমে যাওয়ার পরে গত কয়েক বছর ধরেই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছিল শ্রীলঙ্কায়। বাঙালিও বেড়ানোর ঠিকানা হিসেবে নতুন ভাবে খুঁজে পেয়েছিল ছোট্ট ওই দ্বীপরাষ্ট্রকে। কিন্তু রবিবারের পরে কিছুই বোধহয় আর আগের মতো থাকবে না! আটটি বিস্ফোরণ এবং কয়েকশো মানুষের মৃত্যুর জেরে ভ্রমণের তালিকা থেকে শ্রীলঙ্কা আপাতত বাদ পড়তে চলেছে বলেই মনে করছে শহরের ভ্রমণ সংস্থাগুলি। পর্যটকদেরও অধিকাংশেরই তেমনটাই মত।

কলকাতার বিভিন্ন ভ্রমণ সংস্থার কর্তারা জানাচ্ছেন, অতীতে শ্রীলঙ্কার নিজস্ব গন্ডগোলের কারণে পর্যটকেরা সেখানে তেমন যেতেন না। তবে গত দু’বছর ধরে পর্যটনের বিকাশে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে সাফল্য পেয়েছিল শ্রীলঙ্কা। সরকারি ছাড়াও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে যুক্ত করা হয়েছিল শ্রীলঙ্কার পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে। গত বছর প্রায় সাড়ে চার লক্ষ ভারতীয় ওই দেশে গিয়েছিলেন। এ বছর সেই সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষে পৌঁছবে বলেই আশা করেছিলেন সে দেশের পর্যটন দফতরের কর্তারা। কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছনোর আগেই যেন ‘ছন্দপতন’ হল। এমনটাই মনে করছে রাজ্যের ভ্রমণ সংস্থাগুলি।

‘ট্র্যাভেল এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল’-এর প্রবীণ সদস্য বাচ্চু চৌধুরী বলেন, ‘‘শ্রীলঙ্কায় পর্যটক বৃদ্ধির যে সম্ভাবনা ছিল, তা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ল। নিজের দেশে সন্ত্রাসবাদী হামলা হলে সেটা এক রকম। কিন্তু বিদেশে ওই অবস্থায় পড়লে মারাত্মক সমস্যা হয়। তাই আমরা জেনেশুনে কোনও পর্যটককে সেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে পারি না।’’ গত দু’বছর ধরে শ্রীলঙ্কায় পর্যটক নিয়ে যাচ্ছে বাচ্চুবাবুর ভ্রমণ সংস্থা। এ বারও পুজোর সময়ে সেখানে যাওয়ার জন্য অনেকেই খোঁজখবর নিয়েছেন। কিন্তু কলম্বোয় বিস্ফোরণের পরে আর কেউ সেখানে যেতে চাইবেন কি না, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন ওই ভ্রমণকর্তা।

‘লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম’ (এলটিটিই)-এর সঙ্গে শ্রীলঙ্কা সরকারের গৃহযুদ্ধ থেমেছে বছর দশেক আগে। তার পর থেকেই দেশের পর্যটনে জোর দিতে শুরু করেন সেখানকার প্রশাসনিক কর্তারা। জোরদার প্রচার চালানো হয় বিভিন্ন দেশে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের পাশাপাশি এ রাজ্য, বিশেষ করে কলকাতা থেকেও বিভিন্ন ভ্রমণ সংস্থা পর্যটকদের শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যেতে শুরু করে। ভ্রমণ সংস্থার কর্তাদের দাবি, সবুজ গালিচা বিছানো পাহাড় ও জঙ্গলের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সমুদ্র বা রামায়ণের ‘অশোক বন’ থেকে শুরু করে ইতিহাসের বিভিন্ন স্মৃতি জড়ানো দেশটার আতিথেয়তায় বারবারই মুগ্ধ হয়েছেন পর্যটকেরা। ভ্রমণের খরচও মধ্যবিত্তের আয়ত্তের মধ্যে। বৌবাজার এলাকার একটি ভ্রমণ সংস্থার তরফে রক্তিম রায় বলেন, ‘‘এত সুন্দর জায়গা যে, গরমেও পর্যটকদের নিয়ে যাচ্ছিলাম। সেই শ্রীলঙ্কায় যে এমন ঘটতে পারে, কল্পনাও করতে পারছি না। এই ঘটনা অবশ্যই পর্যটন ব্যবসায় বড়সড় ধাক্কা দিল। সন্ত্রাসের কারণে অন্যান্য জায়গার মতো মনে হচ্ছে এ বার শ্রীলঙ্কাটাও গেল!’’ 

আগামী ২২ মে ২০ জনের দল নিয়ে শ্রীলঙ্কায় যাওয়ার কথা রক্তিমবাবুর সংস্থার। তিনি জানান, সেই ভ্রমণ আপাতত বাতিল করার চিন্তাভাবনাই করছেন তাঁরা। কলকাতার আর এক ভ্রমণ সংস্থার তরফে ৩০ জনের একটি দল এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কায় রয়েছে। ওই সংস্থার তরফে সুদীপ সাহা বলেন, ‘‘রবিবার সকালেই আমাদের 

পর্যটকেরা কলম্বো ছেড়ে বেনটোটা গিয়েছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই নিরাপদে রয়েছেন। তবে ঘটনার পরে সমস্ত রকমের সোশ্যাল মিডিয়া ও ফোনে নিয়ন্ত্রণ জারি থাকায় তেমন ভাবে যোগাযোগ করতে পারছি না।’’ আজ, মঙ্গলবার ওই পর্যটকদের কলকাতায় ফেরার কথা। তবে পরবর্তী ট্যুর পরিকল্পনা এখনও তাঁরা বাতিল করেননি বলেই দাবি সুদীপবাবুর।

এক দিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অন্য দিকে কম খরচ এবং সহজেই ভিসা পাওয়ার সুবিধা। যাতায়াতও করা যায় সহজে। এ সমস্ত কারণেই শ্রীলঙ্কায় পর্যটকের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছিল বলে জানান ‘ট্র্যাভেল এজেন্ট ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া’র পূর্বাঞ্চলের চেয়ারম্যান অনিল পঞ্জাবি। তবে রবিবার সকালের ঘটনার পর থেকে অনেক পর্যটকই তাঁর কাছে ফোন করে জানতে চেয়েছেন, কী করা উচিত? অনিলের কথায়, ‘‘অনেকেই দো-টানায় পড়েছেন। সপ্তাহে তিন দিন কলকাতা থেকে শ্রীলঙ্কা এয়ারলাইন্সের বিমান ছাড়ে। অনেকে টিকিট বাতিল করে অন্যত্র যাওয়ার কথা বলছেন, কিন্তু তাতে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ বেশি ভাড়া লাগছে টিকিটে। তবে অনেকে এখনও শ্রীলঙ্কা যেতেই রাজি।’’