একেই বয়সের ভারে অশক্ত। তার উপরে দীর্ঘ কয়েক বছর ঠিক মতো চিকিৎসা হয়নি। যার সামগ্রিক ফল, বর্তমানে মৃতপ্রায় হাওড়ার পদ্মপুকুর জল প্রকল্প। যা গোটা শহরে পানীয় জল সরবরাহের একমাত্র মাধ্যম। প্রকল্পটির অবস্থা এতটাই খারাপ যে, জল শোধন ঠিক মতো হচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন সেখানকার কর্মীরাই। তাঁদের দাবি, প্রকল্পে চলা ঠিকাদার-রাজ অবিলম্বে বন্ধ না হলে যে কোনও দিন গোটা প্রকল্প আচমকা বসে যাবে। ফলে জলশূন্য অবস্থায় কাটাতে হতে পারে গোটা হাওড়া শহরকে।

বাম আমলে আশির দশকের গোড়ায় হাওড়া পুরসভার উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল এই পদ্মপুকুর জল প্রকল্প। প্রকল্পের ভিতরে পুরসভা ছাড়াও কেএমডিএ পরিচালিত আর একটি প্রকল্প রয়েছে। দুইয়ে মিলে প্রতিদিন ৫ কোটি ৫০ লক্ষ গ্যালন পরিস্রুত জল উৎপাদন হওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন কোনও সংস্কার না হওয়ায় সেই উৎপাদন ক্ষমতা এখন এসে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৫০ লক্ষ গ্যালনে। শুধু তা-ই নয়, প্রকল্পের ভিতরে অব্যবহৃত জমি ভরে গিয়েছে আগাছা আর জঙ্গলে।

কেন এই অবস্থা?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকল্পের এক কর্মী বলেন, ‘‘মূল প্লান্টের ভিতরে ১৬টি বেড থাকে, যাদের কাজ খারাপ জল শোধন করে পরিস্রুত জল বার করা। সেই বেডগুলি বহু দিন ধরে বিকল। এ ছাড়া, অপরিশোধিত জল শুষে নিতে পারে এমন পাঁচটি স্বয়ংক্রিয় ভাল্‌ভ থাকে এক-একটি বেডে। সেগুলিও খারাপ কয়েক বছর। ফলে জল শোধন কার্যত হয় না।’’ কর্মীদের আরও অভিযোগ, বেডের ভিতরে থাকা নুড়িপাথর নষ্ট হয়ে গেলেও অনেক বছর পাল্টানো হয়নি। এমনকি, জল শোধনের জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচটি ক্ল্যারিফায়ারের মধ্যে চারটিই অকেজো! কর্মীদের দাবি, এই জল প্রকল্পে ঠিকাদার-রাজ চলছে। যাদের পরিবর্তন না করলে অচিরেই প্রকল্পটি ধ্বংসের মুখ দেখবে।

প্রকল্পের এক বর্ষীয়ান কর্মী বলেন, ‘‘জল শোধনের জন্য যে অ্যালাম ব্যবহার হয়, তার মানের সঙ্গে আগে ব্যবহৃত অ্যালামের আকাশপাতাল ফারাক। এত দিন অত্যন্ত নিম্ন মানের অ্যালাম দেওয়া হচ্ছিল। এখন জল শোধনের জন্য ‘ক্যানপ্যাক’ নামে একটি তরল দেওয়া হচ্ছে। যার ফলে পেট খারাপ থেকে চুল ওঠা, সবই হচ্ছে।’’

যদিও কর্মীদের এই অভিযোগ মানতে রাজি নন পুর কমিশনার বিজিন কৃষ্ণ। তিনি বলেন, ‘‘রোজ দু’-তিন বার প্রকল্পের নিজস্ব পরীক্ষাগারে জলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তার রিপোর্ট ঠিক আছে। তবে আমি প্লান্ট পরিদর্শন করে দেখেছি, দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের কাজকর্ম সন্তোষজনক নয়।’’ পুর কমিশনার জানান, আগামী আর্থিক বছরে প্লান্টের মোটর, পাম্প সব পাল্টে সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার হাতে দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে রাজ্য সরকার। পাশাপাশি পদ্মপুকুর জল প্রকল্পের ভিতরে কত জন থাকছেন, কারা কখন ঢুকছেন তা দেখার জন্য লগ বুক বা কার্ড পাঞ্চ করার ব্যবস্থা করা হবে। উল্লেখ্য, বছর আটেক আগে এই জল প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে উদ্ধার হয়েছিল পচাগলা দেহ। এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নিরাপত্তার ঢিলেঢালা ব্যাপারটা তখন থেকেই যে চলে আসছে, তা স্পষ্ট পুর কমিশনারের কথা থেকেই।