Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৩ অগস্ট ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

পুস্তক পরিচয় ২

মেলে ধরে নতুন বোধোদয়ের জগৎ

একসঙ্গে পঁয়ত্রিশটি গল্প নাগালের মধ্যে পেলে, সে-সব গল্পের লেখককে বেশ খানিকটা চেনা যায়। কুমার রাণা অবশ্য বাঙালি পাঠকের অচেনা নন। সমাজ-অর্থনীতি

রুশতী সেন
২১ জুন ২০১৪ ০০:০৫
Save
Something isn't right! Please refresh.
গল্পসংগ্রহ, কুমার রাণা। গাঙচিল, ৪০০.০০

গল্পসংগ্রহ, কুমার রাণা। গাঙচিল, ৪০০.০০

Popup Close

একসঙ্গে পঁয়ত্রিশটি গল্প নাগালের মধ্যে পেলে, সে-সব গল্পের লেখককে বেশ খানিকটা চেনা যায়। কুমার রাণা অবশ্য বাঙালি পাঠকের অচেনা নন। সমাজ-অর্থনীতির সাম্প্রতিক প্রসঙ্গে তাঁর বিশিষ্ট অভিজ্ঞতালব্ধ প্রবন্ধ-নিবন্ধে পাঠক অভ্যস্ত। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও হতাশাটাই যে শেষ কথা নয়, এমন ইঙ্গিতই সচরাচর এই লেখকের পর্যবেক্ষণের বার্তাবহ। এমন বার্তার বাস্তবসম্মত বহন, আবার সেই বহনকে নিছক ইচ্ছাপূরণের চৌহদ্দির তফাতে রাখা এ বড় সহজ কাজ নয়। কাজটা দুরূহতর হয়, যখন নিবন্ধের বার্তা ছড়িয়ে যায় গল্পে। বাস্তবসংগতির পাশাপাশি এসে জোটে শিল্পসম্মতির বালাই।

কুমার রাণার গল্পের ক্ষেত্রে অবশ্য তেমন সমস্যা বড় একটা নেই। কারণ গল্প বানানোর কোনও দায় নেই তাঁর। অভিজ্ঞতার জমি থেকেই সটান উঠে আসে তাঁর গল্প। তেমন আবাহনে সমাজকল্যাণের ধ্বজাকে পুরোপুরি অপাপবিদ্ধ প্রমাণ করবার কোনও মিথ্যে তৎপরতাও নেই। বরং অনগ্রসর জনজীবনের জন্য শিক্ষিত সম্পন্নের হিতাকাঙ্ক্ষার ভিতরে ভিতরে, শাসনের স্তরে স্তরান্তরে, এমনকী গবেষণার পরতে পরতে কতখানি অসংগতি মিশে আছে, তার একটা নির্মোহ চিত্ররূপ খুঁজতে খুঁজতেই যেন গল্পগুলোকে নাগালে পাওয়া। ঠাকুরদের দখল করা জমির ধান কেটে আধাআধি দেওয়া হবে ভাগচাষিদের, বাকি অর্ধেক জমা রেখে চালানো হবে কেসের খরচ। মাঝি হাড়ামের এই পরিকল্পনা শুনে কথক বলে, এমন প্রকল্প একটি গ্রামে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে দিতে পারলেই আদত সার্থকতা। উত্তরে মাঝি হাড়াম বলে, কাজ শুরু করাটাই বড় কথা, অন্য গ্রামের মানুষ নিজের তাগিদেই যোগ দেবে। কথক লেখেন, ‘আমার সাবধানী পরিকল্পনাবাদী সুবিধাবাদী কেটে পড়ার ধান্দাযুক্ত মধ্যবিত্ত মনে... এক প্রহার।... বিছানায় শুয়ে... অবিশ্রাম প্রয়াস চালিয়ে যাই পা দিয়ে নিজের মুখে লাথি মারার। পারি না।’ (৯১)

‘অন্নদাস’ যে সংকলনের নামগল্প, সেখানেই আছে ‘বাজার’ কাহিনিটি। খোলা মনে, খোলা চোখে জীবনের দিকে তাকালেই সেখানে দৃশ্যমান হয় বাজারের বাইরের পৃথিবী, খোঁজ মেলে এমন কত মানুষের, যাদের অবস্থান সর্বাধিক উপযোগ অথবা মুনাফা অর্জনের বোধবুদ্ধি সম্পন্ন অর্থনৈতিক ব্যক্তির ঘেরাটোপের বাইরে। অন্নদাস সংকলনের শেষ গল্প ‘বাঁচি রহিতে হিবে’তে গবেষকের অর্থনীতি ভেঙে হাহাকার করে ওঠে নিতান্তই ভগ্নদেহ কিন্তু বড় বেশি রকম জ্যান্ত এক মানুষের দিনযাপনের অর্থনীতি। শাসন-শোষণ, প্রতিরোধ-আপসের পাকেচক্রে চাষির ছেলের রাজনীতিমনস্কতা জীবনযাত্রাকে করে তোলে দুরূহ। অথচ মানুষটা তো বিশ্বাস করে, সে বহুজনের স্বার্থে এ সমস্যা কাঁধে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।’ (পৃ ১৬৪)। তার বেঁচে থাকার অঙ্গীকারে ভিতু অথবা বশ্য মানুষের সহযোগিতা বা আশ্বাস নিষ্প্রয়োজন। উন্নয়ন অর্থনীতির ভাষায় যারা অনগ্রসর জীবনের শরিক, কুমার রাণার গল্পে তারা প্রদর্শকের, শিক্ষকের, এমনকী গবেষকের সামনে মেলে ধরে নতুন বোধোদয়ের জগৎ।

Advertisement

তেমন বোধোদয়ে সম্পন্ন লেখক মানবসভ্যতার আধুনিক অগ্রগমনব্যাপী মর্মান্তিক সব অপচয় অসংগতির কাহিনি লেখেন, প্রথাগত বাস্তববাদকে প্রায় যেন তুড়ি মেরে। তাঁর দ্বিতীয় গল্পসংকলন মানবাশ্ম-তে থাকে ‘জলছবি’ বা নামগল্পটির মতো কাহিনি। গল্প হিসেবে তারা কতখানি উত্তীর্ণ, সে প্রশ্ন মুখ্য নয়। গ্রন্থনার এই ধরনটিকে যে সম্ভাষণ করা গেল মুনাফাপ্রবণ এই দুনিয়ার চৌহদ্দির মধ্যে থেকেই, সেটাই বড় কথা। রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং সংলগ্ন সাংগঠনিক উদ্যোগ আয়োজনের চাপান-উতোর কুমার রাণার গল্পে ফিরে ফিরে আসে। ‘উত্তর প্রবাহ’ (অন্নদাস) থেকে ‘জন হেনরির অর্ধেক উপাখ্যান’ (মানবাশ্ম) কিংবা ‘প্রশ্নবাচী’ বা ‘উজালি’-র মতো সাম্প্রতিকতর এবং ইতিপূর্বে অগ্রন্থিত গল্পে মুক্তিকামী রাজনৈতিক আদর্শ আর সেই রাজনীতির নির্দেশ-প্রতাপ-সমঝোতাপ্রবণ সংগঠনের বন্ধন পাশাপাশি বিরাজ করে। সত্য থেকে সঙ্ঘে পৌঁছনর সম্ভাবনা আর সঙ্ঘের সত্য-অর্জনের অসম্ভাব্যতা ছড়িয়ে পড়ে সমাজের স্তর-স্তরান্তরে।

‘ভ্যান গগের প্রেমিকা’, ‘ছটরায়’, ‘আরোগ্য’ অথবা ‘আগুনের মা’-র প্রবক্তারা যখন যথেষ্ট প্রতিকূল পথ কেটে শেষ পর্যন্ত স্পর্শ করে সফলতা, তখনও নিছক ইচ্ছাপূরণের কোনও বাতাবরণ গড়ে ওঠে না। এমনকী ‘নিশিকথা’র মতো আপাত অরাজনৈতিক কাহিনির আনাচে-কানাচে গড়ে তোলা যায় রাজনীতি-অর্থনীতির পাঠ। সে পাঠ সহজ নয়, কুমার রাণার মতে, নির্বিকল্পও নয়। তিনি জানেন, প্রায়শই তাঁর গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রদের যাপন, মনন এমনকী মরণের বিন্যাস পুরোপুরি সত্যি হয়ে ওঠে না শিক্ষিতের অক্ষরজ্ঞান, সমাজবীক্ষা আর রাজনীতিমনস্কতার সম্মেলনে। তাই অনেক ক্ষেত্রে কুমারের গল্পে নিহিত থাকে সেই গল্পের সমালোচনাও। আরও নিরাবরণ সত্যির সন্ধানেই হয়তো গল্পকথনের সাবেকি চলনকে ভাঙতে চান লেখক ‘নতুন গল্পের খোঁজে’, ‘অ-কষ্টকল্পিত’ কিংবা ‘একটা না লিখতে পারা গল্প’র গ্রন্থনায়। লেখক-নিরপেক্ষ বাস্তববাদের আধার নয় এ-সব কাহিনি। এমনকী গল্প সেখানে নিজেই হয়ে ওঠে কাহিনির পাত্র-পাত্রীদের এক জন। বিন্যাসের এই নতুন ধরতাই কতটা সফল, ছকভাঙা গল্পেরা সবাই উতরেছে কি না, সে প্রশ্ন গৌণ। গল্পসংগ্রহে-ই পেয়ে গেছেন পাঠক সাবেকি গ্রন্থনার চলনকে প্রত্যাখ্যান করবার কারণ। মঁগলু ভাতুয়ার গল্প ‘বে-দখল’ লিখতে লিখতে লেখক জানান, ‘লেখক নিজেকে যতই কুশলী দেখানোর চেষ্টা করুক... এবং অক্ষর জগৎ যতই তার অন্তর্দৃষ্টির প্রশংসামুখর হয়ে উঠুক... মঁগলুর মনের কথা সে আমাদের জানাতে পারে না সে মন কোনও ভাবেই তার মুখের রেখা, বা গোড়ালির ফাট, বা ঝুল চামড়ার মধ্য দিয়ে... লেখকের সামনে উজাগর হয় না... (মঁগলুর) মনকে মন দিয়ে অনুভব করার মতো সহমনও লেখক কখনওই অর্জন করে উঠতে পারে না।’ (পৃ ৩৪১)

ভগ্নতর আর নগ্নতর ভাষার মগ্ন অন্বেষণ, কিংবা গল্পকথনের সাবেকি বাস্তববাদী ভাষায় প্রত্যাবর্তন, গল্পের উত্তীর্ণতা অথবা অনুত্তীর্ণতা, যা-ই ঘটুক না কেন, না-পারার ওই বেদনা যেন ‘বে-দখল’-এর লেখককে কোনও দিন ছেড়ে না যায়। তবেই পাঠকের আদত লাভ। লেখকেরও।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement