Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০২ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

পুস্তক পরিচয় ১

বাস্তবের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার দায় নেই

অমিতাভ গুপ্ত
০৫ এপ্রিল ২০১৪ ০০:২০

কোনও বইয়ের মলাট দেখে তার সম্বন্ধে ধারণা করা খুব সু-অভ্যাস নয়। কিন্তু, নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক জীবনীকার যদি বইয়ের ব্লার্বে দাবি করেন যে মোদীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পাওয়া দুষ্কর, এবং এই বইয়ের একটি প্রধান উপকরণ মোদীর সঙ্গে দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাৎকার, তা হলে খটকা থেকেই যায়। কেন খটকা, খুলে বলা যাক। সাংবাদিক করন থাপার প্রায় দেড় বছরের চেষ্টায় মোদীর একটি সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন। এই টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের প্রথম প্রশ্নটিই ছিল, আপনার এত সাফল্যের পরেও যখন লোকে আপনাকে মুখের ওপর গণহত্যাকারী বলে, মুসলমান-বিদ্বেষী বলে, তখন কি আপনার মনে হয় না যে আপনার ভাবমূর্তির ঘোরতর সমস্যা আছে? এই প্রশ্নের পর সাক্ষাৎকারটি আর বেশিক্ষণ চলেনি। অনুষ্ঠান থামিয়ে চলে যান মোদী। এবং, তার পরের ছ’বছরে প্রতি দেড় মাসে এক বার চিঠি লিখেও আর দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করতে পারেননি থাপার। এই অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর নয়। বিরোধিতার সম্ভাবনামাত্র আছে, এমন কোনও সাংবাদিককে কখনও সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি মোদী। তাঁর ঘনিষ্ঠ হতে গেলে কিছু শর্ত পালন করতে হয়।

Advertisement



মুখ ও মুখোশ। নরেন্দ্র মোদীর জনসভায় তাঁর সমর্থক।

নরেন্দ্র মোদী: আ পলিটিকাল বায়োগ্রাফি-র লেখক অ্যান্ডি মারিনো সেই শর্তগুলো চমৎকার পালন করেছেন। সাম্প্রতিক কালে মোদীর বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক জীবনী লেখা হয়েছে। তার সবক’টির তুলনায় আলোচ্য বইটি আলাদা— মোদীর ভ্রান্তি (বা অপরাধ, যে দিক থেকেই দেখুন না কেন) আড়াল করার এমন প্রচেষ্টা আর কোনও বইয়েই নেই। কয়েকটা উদাহরণ দিই। নারোদা পাটিয়ার গণহত্যায় মায়া কোদনানির ভূমিকার কথা উল্লেখ করেই লেখক জানিয়েছেন, বিজেপি-এর এই বিধায়ক মোদীর অভ্যন্তরীণ প্রতিপক্ষ কেশুভাই পটেলের লোক। কিন্তু, এটা বললেন না যে এই মায়া কোদনানিই মোদীর জমানায় নারী ও শিশুকল্যাণ দফতরের মন্ত্রী হয়েছিলেন, ২০০৭ সালে। নারোদা পাটিয়ার ঘটনায় তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকার সমস্ত প্রমাণ জনসমক্ষে আসার পর। নানাবতী কমিশন মোদীকে অপরাধী বলেনি, এই কথাটি কয়েক পাতার ব্যবধানে বার তিনেক লিখেছেন লেখক— কিন্তু এই কমিশনের তদন্ত নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে যে তীব্র আপত্তি উঠেছিল, সে কথা জানাননি। একাধিক বার লিখেছেন, গোধরায় সবরমতী এক্সপ্রেসে আগুন লাগল যে দিন, তার মাত্র দু’দিন আগে মোদী প্রথম বার বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন— অস্যার্থ, মাত্র দু’দিনের মধ্যে তিনি এত বড় একটা ঘটনা সামলানোর মতো শক্তি অর্জন করতে পারেননি। কিন্তু, ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সাড়ে চার মাস নরেন্দ্র মোদী বিধায়ক হওয়ার অপেক্ষায় হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন কি না, এই বইয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। দরকারও নেই— ‘লেখক কী বলিতে চাহিয়াছেন’, সেটা নিতান্ত নাবালকও বুঝবে।



অ্যান্ডি ম্যারিনো, হার্পার কলিন্স, ৫৯৯.০০

২০০২-এর গণহত্যায় নরেন্দ্র মোদীর যে কোনও দায় ছিল না, গুলবার্গ সোসাইটি থেকে কংগ্রেসের প্রাক্তন সাংসদ এহসান জাফরির বারে বারে ফোন করার খবর যে নিতান্তই গুজব, সমস্ত নিয়ম ভেঙে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের হাতে দগ্ধ করসেবকদের মৃতদেহ তুলে দেওয়া ছাড়া যে আর কোনও উপায় ছিল না, এই সব ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ করার পর লেখক দাঙ্গা-পরবর্তী ত্রাণ শিবিরের দিকে নজর দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন রিপোর্ট, সংখ্যালঘু কমিশনের সরিতা জে দাশ-এর রিপোর্ট ইত্যাদির কথা না হয় বাদই দিলাম, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী যে তাঁকে চিঠি লিখে রাজধর্মের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, লেখক সে সব কথা মনে করতে চাননি। অবশ্য, অন্য দিকে, গুজরাত দাঙ্গার পক্ষে যুক্তির সন্ধানে তাঁকে যে ১৯৮৪-র দিল্লিতে কংগ্রেসের শিখনিধন থেকে ১৯৮৯-র ভাগলপুর, অনেক কথাই মনে করতে হয়েছে, সেটাও অস্বীকার করলে চলবে না। নির্বাচনী ইস্তেহার নয়, কোনও নেতার বক্তৃতাও নয়, ‘নিরপেক্ষ’ একটি বইয়ের লেখক যে এক দাঙ্গার যুক্তি খুঁজতে অন্য দাঙ্গাকে টেনে আনতে পারেন, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল।

তবে দাঙ্গা যদি মোদীর ‘অ্যাকিলিসের গোড়ালি’ হয়, তবে গুজরাতের উন্নয়ন তাঁর অদম্য জয়পতাকা, অন্তত মোদীভক্তদের তেমনই দৃঢ় বিশ্বাস। মারিনো ভাইব্রান্ট গুজরাতের কথা বলেছেন, কিন্তু সেই সম্মেলনে যত বিনিয়োগের প্রস্তাব শোনা যায়, তার কত শতাংশ বাস্তবায়িত হয়, সে হিসেবটি দেননি। গুগ্ল করলেই অবশ্য পেয়ে যেতেন— প্রথম চারটি ‘ভাইব্রান্ট গুজরাত’ সম্মেলনে যত মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার মাত্র ১৫ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। লেখক গুজরাতে শিল্পের জন্য অতি সহজে জমি পাওয়ার কথা বলেছেন, কিন্তু কৃষকদের অসন্তোষের কথা বলেননি, পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতির কথা বলেননি, এমনকী কানু কালসারিয়ার কথাও বলেননি। মোদীর প্রচারসংস্থা অ্যাপকো ইন্টারন্যাশনাল যে কথা বলে, মোদী যা শুনতে চান, লেখক শুধু সেটুকুই বলেছেন। একটু খাটলে জানতে পারতেন, মোদীর আমলে গুজরাতে আর্থিক বৃদ্ধির হারে কোনও তাৎপর্যপূর্ণ বৃদ্ধি নেই— ১৯৯০-এর দশক থেকে যেমন চলেছিল, মোদীর আমলেও গুজরাত ঠিক তেমনটাই চলেছে। অবশ্য তভলীন সিংহ, মধু কিশওয়ার আর অরবিন্দ পানাগড়িয়ার লেখা থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে এর চেয়ে বেশি দূর যাওয়া মুশকিল।

আলোচ্য দ্বিতীয় বইটিতেও (ইমপ্লোশন: ইন্ডিয়াজ ট্রিস্ট উইথ রিয়ালিটি) তথ্যসূত্রের সমস্যা মারাত্মক। লেখক পেশায় সাংবাদিক। এক কালে নাকি সাংবাদিকরা ‘বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেল’ মর্মে প্রচুর খবর লিখতেন। এই বিশ্বস্ত সূত্র কে বা কারা, সেই তথ্যটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের সঙ্গেই স্বর্গারোহণ করত। জন এলিয়ট অন্তত আংশিক ভাবে সেই স্বর্ণযুগের অভ্যাসটি ফিরিয়ে এনেছেন। যেমন, তিনি লিখেছেন, ‘লন্ডনে শুনলাম রাহুল গাঁধী তাঁর এক বন্ধুকে বলেছেন, ইউপিএ-কে ক্ষমতায় থাকতে হলে খয়রাতির মাধ্যমেই থাকতে হবে, আর্থিক সংস্কার দিয়ে হবে না।’ কোনও বইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিবিন্যাসের গোড়ায় যদি এমন তথ্যসূত্র থাকে, তবে সেই বইকে একটু সন্দেহের চোখে দেখা ভাল।



জন এলিয়ট। হার্পার কলিন্স, ৬৯৯.০০

এ রকম উদাহরণ আরও অনেক। ভারতে অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল কৃতিত্ব কার, ১৯৯১ সাল থেকেই ভারতীয় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে আরম্ভ করেছিল কি না, এই প্রশ্নগুলো নিঃসন্দেহে অতি জরুরি। ইলিয়ট এই সব প্রশ্ন তুলেছেন, কিন্তু তার পরেই মনমোহন সিংহের কৃতিত্ব খাটো করতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছেন। মন্টেক সিংহ অহলুওয়ালিয়ার সঙ্গে তাঁর টেলিফোনে কী কথা হল, সেটা কি যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ? অথচ, ঠিক এই সময়কার অর্থনীতির চালচলন নিয়ে অন্তত দুটো সর্বজনমান্য গবেষণাপত্র গুগ্ল স্কলার থেকে সহজে ডাউনলোড করা সম্ভব। রডরিক-সুব্রহ্মণ্যমের ‘ফ্রম হিন্দু গ্রোথ টু প্রডাক্টিভিটি সার্জ: দ্য মিস্ট্রি অব দি ইন্ডিয়ান গ্রোথ ট্রানজিশন’ এবং কোটওয়াল-রামস্বামী-ওয়াধওয়ার ‘ইকনমিক লিবারালাইজেশন অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ইকনমিক গ্রোথ: হোয়াটস দি এভিডেন্স?’ এই দুটো লেখা পড়ে নিতে খুব বেশি সময় লাগত কি?

তাঁর বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য— ইউপিএ-র আমলে ভারতের অর্থনীতির সার্বিক সর্বনাশ হয়েছে। কিন্তু একেবারে প্রথম পাতা থেকেই লেখক যে ভাবে বিনা প্রশ্নে কিছু প্রচলিত ধারণাকে মেনে নিয়েছেন, তাতে নৈর্ব্যক্তিকতা বজায় থাকে না। তিনি গ্রামীণ কর্মসংস্থান যোজনাকে একেবারে নস্যাৎ করে দিয়েছেন। লেখক যদি যথেষ্ট তথ্য দিয়ে, উদাহরণ দিয়ে তাঁর বক্তব্য দাঁড় করাতে পারতেন, অবশ্যই গুরুত্ব পেতেন। কিন্তু, সে পথে না হেঁটে রঘুরাম রাজনের একটি বিচ্ছিন্ন উদ্ধৃতি দিয়েই দায় সেরেছেন তিনি। পরের অনুচ্ছেদেই খাদ্যের অধিকার আইনের কথা বলতে গিয়ে সেই আইনে পরিবারপিছু মাসে কত কেজি খাদ্য বরাদ্দ হয়েছে, সেই হিসেবে বিচ্ছিরি ভুল করেছেন। বারে বারেই স্পষ্ট, বিশ্লেষণ তাঁর উদ্দেশ্য নয়, তিনি গোড়া থেকেই বক্তব্য স্থির করে রেখেছেন এবং সেই লক্ষ্যে অবিচলিতই থাকবেন। নচেৎ তাঁর নজরে পড়া উচিত ছিল যে তাঁরই ভাষায় ‘দৃঢ় নেতৃত্বের অভাবে যে সরকার সম্পূর্ণ পথভ্রষ্ট’, সেই সরকারের আমলেই ভারতে আর্থিক বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংকট সত্ত্বেও।

আরও পড়ুন

Advertisement