Advertisement
০৬ ডিসেম্বর ২০২২
পুস্তক পরিচয় ১

ব্যাপ্তিতে ব্যতিক্রমী ভ্রমণ-রচনা

অবলা বসুর জন্মের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে দময়ন্তী দাশগুপ্ত তাঁর এই রচনাগুলি সংকলিত করে তৎকালীন বাঙালি মহিলার ভ্রমণ রচনার খুব সীমিত তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন করলেন।

অবলা বসু

অবলা বসু

সীমন্তী সেন
শেষ আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:০১
Share: Save:

সাহেবি শাসকদের সংস্পর্শে বাঙালির ‘আধুনিক’ হয়ে ওঠার অন্যতম সূচক ছিল ভ্রমণকারী এবং ভ্রমণবৃত্তান্ত রচয়িতা হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে পশ্চিমি শিক্ষা এবং জাতি-চেতনার উন্মেষ— এই দ্বিবিধ যুগ-অভিজ্ঞতার ফলে ভারতীয় তথা বাঙালি নব্য শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মনে ভ্রমণ শুধু বিলাসই নয়, প্রায় এক অবশ্যপালনীয় কর্তব্য ধার্য হয়। স্বাভাবিক কারণেই, এই নবলব্ধ ভ্রমণের সংস্কৃতি ছিল মূলত পুরুষকেন্দ্রিক। সে কালে খুব বেশি মহিলা ভ্রমণের সুযোগ পাননি, আর পেলেও নিজেদের দৃষ্টি এবং স্বরকে পাঠককুলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয় বা প্রেরণা, কোনওটাই তেমন ছিল না। এ দিক থেকে অবলা বসুর ভ্রমণ-সংক্রান্ত রচনা বিশেষ উল্লেখের দাবিদার।

Advertisement

১৩০২-১৩৩২ কালপর্বে অবলা বসুর ভ্রমণের বিবিধ রচনা প্রকাশিত হয় মূলত ছোটদের পত্রিকা মুকুল-এ এবং দু-একটা প্রবাসী-তে। অবলা বসুর জন্মের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে দময়ন্তী দাশগুপ্ত তাঁর এই রচনাগুলি সংকলিত করে তৎকালীন বাঙালি মহিলার ভ্রমণ রচনার খুব সীমিত তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন করলেন। সমসাময়িক কালে স্বদেশ ভ্রমণ বিষয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী, প্রসন্নময়ী দেবী বা প্রিয়ম্বদা দেবীর বেশ কিছু রচনা পাওয়া গেলেও, ইউরোপ ভ্রমণের বৃত্তান্ত কৃষ্ণভাবিনী বা জগৎমোহিনী চৌধুরীর বাইরে বিশেষ একটা চোখে পড়েনি। অবশ্য কাছাকাছি সময়ে, হরিপ্রভা তাকেদা বা সরোজনলিনীর রচনায় জাপান ধরা পড়েছে। তবে এঁরা কেউ-ই জীবনে অবলার মতো এত বিস্তৃত ভ্রমণের সুযোগ পাননি। জগদীশচন্দ্র বসু বিদেশ থেকে বার বার ডাক পেয়েছেন এবং এ রকম বহু জায়গায় স্বামীর সহযাত্রী হয়েছেন অবলা। জাতীয়তাবাদের স্বপরিচিতি নির্মাণের কালে অবলা-ই বাঙালি মহিলাদের মধ্যে প্রথম, যিনি পুব এবং পশ্চিম— দুই পৃথিবী সম্পর্কেই তাঁর ‘দেখা’ পাঠকের দরবারে হাজির করতে পেরেছেন।

• অবলা বসুর ভ্রমণকথা, সংকলন ও সম্পা: দময়ন্তী দাশগুপ্ত। পরশপাথর, ১৭৫.০০

• জলপথে মুর্শিদাবাদ, মনোমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, সম্পা: গৌতমকুমার দে। পরশপাথর, ১৭৫.০০

Advertisement

• ভ্রমণকারীর ভ্রমণ বৃত্তান্ত, রসিককৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সম্পা: সমীর পাত্র ও শেখর ভৌমিক। মহিষাদল রাজ কলেজ, পরি: আশাদীপ, ১৫০.০০

অবলার কাশ্মীর, লখনউ, মাদ্রাজ কিংবা চিতোরের বিবরণ একই ধাঁচের— যাত্রাপথ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থাপত্য, লোককথা, লোক-বিশ্বাস, অঞ্চলের ইতিহাস। লেখার ধরনে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, উদ্দিষ্ট পাঠক হল কিশোর-কিশোরী। তবু এরই মধ্যে টুকরো মন্তব্য ধরা পড়ে সমসাময়িক বাঙালি বুদ্ধিজীবী শ্রেণির রাজনৈতিক বোধ বিশ্বাসে লেখিকার অংশীদারিত্ব। যেমন, লখনউতে পুরনো রেসিডেন্সি অঞ্চলে সিপাহি বিদ্রোহে নিহত ইংরেজ সেনানায়কদের স্মৃতিসৌধ দেখে তাঁদের বীরত্ব সম্পর্কে তাঁর মন শুধু শ্রদ্ধায় ভরে আসে না, ‘মনে গভীর বিষাদের(ও) আবির্ভাব’ হয়। আবার চিতোর কিংবা কাশীতে হিন্দু স্থাপত্য, মন্দিরের ভগ্নদশা দেখে লেখেন ‘...সর্ব্বত্রই হিন্দু কীর্ত্তির ভগ্নাবশেষ দেখিয়া প্রাণে এক প্রকার ক্লেশ হয়। বর্ত্তমান রাজারা যে কত ভাল তাহা বারবার মনে হয়। তাঁহারা কেমন যত্ন করিয়া হিন্দু ও মুসলমানদিগের প্রাচীন কীর্ত্তি সকল রক্ষা করিতেছেন।’

অবলার বিলেতের বিবরণ তৎকালীন অন্যান্য বিলেতের বিবরণের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। বিলিতি জাহাজেই প্রথম ইংরেজদের ‘নিয়মানুবর্তিতা’ এবং ‘শৃঙ্খলাবোধ’-এর সঙ্গে পরিচয়, এরপর এর দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে রাস্তাঘাটে, পার্ক, মিউজিয়মে— প্রায় সমস্ত প্রতিষ্ঠানে বা লোক সমাগমে। ছোটদের জন্য লন্ডনের গল্প লিখতে বসেও কিন্তু অবলা পার্লামেন্টের দীর্ঘ বিবরণ দেন, জানান ফ্যাক্টরি বিল নিয়ে আলোচনা, ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা বা লর্ড এবং ‘কমন’-দের বসার আলাদা বন্দোবস্তের কথা। উপনিবেশাশ্রিত শিক্ষিত বাঙালির শাসকের সংস্কৃতির সঙ্গে নৈকট্যবোধের পরিচয় মেলে যখন ওয়েস্টমিন্‌স্টার অ্যাবিতে কবিদের সমাধি দেখে ‘মনে হয় যে...অনেক দিনের পরিচিত বন্ধুদিগের সহিত সাক্ষাৎ হইয়াছে’। রোম বা ভেনিসের বিবৃতিতেও বাজে এ রকমই পূর্ব-পরিচিতির সুর।

উন্নতি, সমাজ সংগঠনে আমেরিকা যেন ইউরোপীয় সংস্কৃতিরই বিস্তৃত রূপ। তৎকালীন অন্যান্য ভ্রমণকারীর মতোই অবলা পশ্চিমি সমাজ সভ্যতার অনেক কিছু দেখেই মুগ্ধ হন। তবে মুগ্ধতায় জাতীয়তাবোধকে হারাতে দেওয়া যায় না, তাই তিনি কিশোরদেরও বলতে ভোলেন না যে ‘আমাদের জাতীয় চরিত্রে ভাব ও আকাঙ্খার এমন সরল ও উচ্চমান বিদ্যমান, যাহার পরিবর্ত্তে বিদেশের সভ্যতা সম্পূর্ণ গ্রহণ করিবার ইচ্ছা আমার মনে কখনই উদয় হয় নাই’।

লেখিকা যখন জাপানে যাচ্ছেন ১৯১৫ নাগাদ, তখন জাপানকে ঘিরেই গড়ে উঠতে শুরু করেছে পুবের আত্মবিশ্বাস, আত্মাভিমান। তার উন্নত সভ্যতা, আধুনিকতার পরিচয় লেখিকা পেতে শুরু করেন জাপানি জাহাজ থেকেই। এর পর বাড়িঘর, যানবাহন, শিশু প্রতিপালন, উৎসব, অনুষ্ঠান, গৃহসজ্জা— প্রায় সব কিছুই যেন এরই অভিজ্ঞান। তবে এই রকম ‘আধুনিকতা’ এবং ‘উন্নতি’ সত্ত্বেও জাপান কিন্তু স্বাতন্ত্র্য হারায়নি। নারী স্বাধীনতা থেকে চা-পান অনুষ্ঠান পর্যন্ত জাপান নিজস্বতায় সমুজ্জ্বল। তবে ভুললে চলে না যে, এই উন্নতির পাশাপাশি প্রকটিত হচ্ছে জাপানের আগ্রাসী রূপ। অতএব, আমরা এরকম মন্তব্য পাই যে অত্যন্ত কম সময়ে এই অত্যাশ্চর্য উন্নতি জাপানিদের আত্মম্ভরী করে তুলেছে। সে কালে কোনও মহিলার তো নয়ই, সচরাচর কোনও পুরুষের রচনাতেও এত দেশ, সংস্কৃতির বয়ান মেলে না। অতএব, বক্তব্যে না হলেও ব্যাপ্তিতে অবলার ভ্রমণরচনা ব্যতিক্রমী।

বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে মনোমোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের খড়দহ থেকে জলপথে মুর্শিদাবাদ যাওয়ার রোজনামচা স্বাদে উদ্দেশ্যে অবলার রচনা থেকে খুব ভিন্ন কিন্তু একই ভাবে ভ্রমণের গুরুত্বের ধারণা ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় ঋদ্ধ। স্বদেশি আদর্শ দিয়ে শুরু করে মনোমোহন অত্যন্ত অল্প বয়সেই পুরোপুরি গ্রহণ করেন সাধনমার্গ। ১৯১২-তে মূলত শ্রীঠাকুরের অনুপ্রেরণাতেই খড়দহ থেকে দুই বন্ধুর সঙ্গে নৌকো করে তিনি কাশীধাম যাওয়া স্থির করেন। বিশেষ কারণে, মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত গিয়ে তাঁদের ফিরে আসতে হয়। কিন্তু শ্রীঠাকুর-অনুপ্রাণিত এই যাত্রার পেছনে পশ্চিমি ভ্রমণ-ভাবনার সচেতন উপস্থিতিও তাঁর মোট ৩৩ দিনের জলপথের রোজনামচায় স্পষ্ট। লিখেছেন, রেলগাড়ির যুগে নৌকাভ্রমণ আজকের দেশের মানুষের কাছে আশ্চর্য ঠেকতে পারে, কিন্তু ‘ইউরোপে এসব কিছুই নয়’ কারণ ‘দেশ-ভ্রমণ তাদের শিক্ষার অঙ্গ স্বরূপ’। পুরো রচনাটিতে ভক্তিভাব ও স্বদেশপ্রীতি নির্বিশেষে মিশে রয়েছে। ভাব প্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে যেমন আছেন মাইকেল, তেমনই রামপ্রসাদ। যথার্থ আধুনিক অভিযাত্রীর মতো ঠিক যে-ভাবে লিখেছেন বাংলার ভূগোল, ইতিহাস, সমাজজীবন এবং প্রকৃতির কথা— সে ভাবেই তীর্থযাত্রীর ভক্তিপ্রাবল্যে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন নবদ্বীপধাম সম্পর্কে। সব থেকে আকর্ষণীয় নৌকা চালনার খুঁটিনাটি বিবরণ— কখনও দাঁড় বেয়ে, কখনও গুন টেনে বা নোঙর ফেলে চলা। বিশেষ প্রাপ্তি, প্রকাশক জানকীনাথ ঘোষালের সাইকেলে দেওঘর থেকে মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ বৃত্তান্তের সংযোজন। গৌতম কুমার দে-র তন্নিষ্ঠ সম্পাদনায় দু’টি গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যতিক্রমী ভ্রমণ দলিল পাঠকের হাতে এল।

রসিককৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভ্রমণকারীর ভ্রমণ বৃত্তান্ত বইটির উপ-শিরোনাম ‘বাঙ্গালা, বেহার, ঊড়িষ্যা, আসাম প্রভৃতি প্রত্যেক জেলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ’ হলেও ‘ঊড়িষ্যা’ ছাড়া অন্যান্য জায়গার কথা লেখক লিখে উঠতে পারেননি। লেখক সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না এবং বইটির সম্পাদকেরাও এ বিষয়ে কোনও আলোকপাত করতে পারেননি। রচনাটিকে লেখক যেহেতু ভ্রমণবৃত্তান্ত বলেছেন, সেহেতু সম্পাদকেরাও তা মেনে নিয়ে তৎকালীন গড়ে ওঠা ভ্রমণ রচনার ট্র্যাডিশনে তাকে বসানোর এবং আলোচনার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এটিকে ঠিক ভ্রমণবৃত্তান্ত বলা যায় কি না, সে সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। পুরো রচনাটি পড়ে মনে হয়, লেখক যেন লিখতে চেয়েছিলেন একটি গেজেটিয়র-জাতীয় গ্রন্থ, যাতে অঞ্চলটি সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য ঠাসা থাকবে এবং এর বলে তৎকালীন সারস্বত সমাজে লেখকের একটি স্থান তৈরি হবে। নানা তথ্য তিনি কী ভাবে আহরণ করেছিলেন বা তা কতটা নির্ভরযোগ্য, সে সম্পর্কে কিছুই নিশ্চিত ভাবে বোঝা যায় না।

তবে ভ্রমণবৃত্তান্ত যদি না-ও ভাবি, এই বই থেকে উনিশ শতকের শেষদিকে বাঙালিদের পড়শি অঞ্চল সম্পর্কে মনোভঙ্গির কিছু স্টিরিওটাইপ ও বাঙালি জাত্যভিমানের আভাস পাওয়া যায়। তাই, গুণমান যেমনই হোক, উনিশ শতক নিয়ে গবেষণারত কারও কাছে রচনাটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.