Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০১ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

পুস্তক পরিচয় ১

নিরুপায় শিকার? মানতে পারলাম না

বিবেক দেবরায়
১৯ এপ্রিল ২০১৪ ০০:০৫

শুরুতেই চেনাজানার ব্যাপারটা বলে নিই। সঞ্জয় বারুকে আমি ভাল চিনি। তিনি আমার বন্ধু। আমি মনমোহন সিংহকেও ভাল চিনি। মনমোহন সিংহ সম্পর্কে কতকগুলো কথা পরিষ্কার করা দরকার।
এক, তিনি ‘ভারতের আর্থিক সংস্কারের স্থপতি’ নন। সংস্কারের একটা নীল নকশা আগে থেকেই ছিল। তবে তার চেয়েও বড় কথা, স্থপতি যদি কেউ থেকে থাকেন, তবে তিনি নরসিংহ রাও। বস্তুত, প্রধানমন্ত্রী রাও প্রথমে আই জি পটেলকে অর্থমন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন। পটেল রাজি হননি। তার পরে, হরকিষেন সিংহ সুরজিতের পরামর্শে মনমোহন সিংহকে ডাকা হয়।
দুই, আর্থিক সংস্কারের প্রতি মনমোহন সিংহের বিরাট শ্রদ্ধাভক্তির বিশেষ কোনও প্রমাণ ছিল, তাও বলা যাবে না। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬— ইন্দিরা গাঁধীর বিলক্ষণ রাষ্ট্রনির্ভর আর্থিক নীতির জমানায় তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। সাউথ কমিশনের রিপোর্ট (১৯৯০) তাঁরই তৈরি করা, সে রিপোর্ট উদার আর্থিক নীতির রীতিমত বিরোধী। মনমোহন সিংহের ঝোঁকটা ছিল সমাজতন্ত্রের দিকে।
তিন, আর পাঁচটা সরকারি আধিকারিকের মতো তিনিও যখন যাঁর নেতৃত্বে কাজ করেছেন তখন তাঁর কথা মতো চলেছেন, তিনি ইন্দিরা গাঁধীই হোন, নরসিংহ রাওই হোন বা সনিয়া গাঁধীই হোন।
চার, যখন কিছুটা স্বাধীন ভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন, তখনও মনমোহন সিংহ সাধারণত খুব বড় কিছু করে দেখাতে পারেননি। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর (১৯৮২-৮৫) বা যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান (১৯৮৫-৮৭) হিসেবে তাঁর নিজস্ব অবদান কতটুকু?
পাঁচ, ‘সততা’ কথাটা বড় বেশি কপচানো হয়। টাকাপয়সার ব্যাপারে মনমোহন সিংহের ব্যক্তিগত সততা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। কিন্তু সততা কি শুধু এইটুকুই? ১৯৯১ সালে অসম থেকে রাজ্যসভায় যাওয়ার জন্য তিনি নিজের বাসস্থান সম্পর্কে যে তথ্য দাখিল করেছিলেন, তা কি প্রকৃত সত্য ছিল? ওই বছরেই ইউ জি সি’র চেয়ারম্যান পদে তাঁর নিয়োগের ফাইলে চন্দ্রশেখর পুরনো তারিখ (ব্যাকডেট) দিয়ে সই করেছিলেন, কারণ তত দিনে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়েছেন।

Advertisement



দি অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার,
দ্য মেকিং অ্যান্ড আনমেকিং অব মনমোহন সিং,
সঞ্জয় বারু। পেঙ্গুইন, ৫৯৯.০০

মনমোহন সিংহের নিন্দা করা আমার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু তাঁর আচরণের ত্রুটিগুলো চেপে যাওয়া হবে কেন? দিল্লি দরবারের বাইরে এগুলো নিয়ে আলোচনা বিশেষ হয়নি। তার একটা বড় কারণ হয়তো এই যে, দেশভাগের সময় ছিন্নমূল হয়ে আসা সাধারণ ঘরের এক জন মানুষ লেখাপড়া শিখে পরিশ্রম করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেছেন, তাঁর প্রতি নাগরিক সমাজের ইংরেজি-জানা মানুষের একটা সহানুভূতি ছিল। তিনি রাজনীতির দুনিয়ার বাইরের মানুষ— এই ধারণার ফলেও শিক্ষিত শহুরে মানুষ তাঁর প্রতি অনুকূল মনোভাব পোষণ করেছেন। এই ধারণাটিতেও কিন্তু বিস্তর খাদ আছে। ভূতপূর্ব অর্থমন্ত্রী, বিজেপি’র যশবন্ত সিনহা তাঁর বইয়ে লিখেছিলেন, মনমোহন সিংহকে অর্থনীতিবিদ হিসেবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং রাজনীতিক হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কথাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একটা অর্থে তিনি রাজনীতিক নন ঠিকই— তৃণমূল স্তর থেকে রাজনীতি করে (সাফল্যের সঙ্গে) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি উঠে আসেননি। কিন্তু দরবারি রাজনীতির আলো-আঁধারি পথে আনুগত্যের সোপান বেয়ে উঠে আসার যে রাজনীতি, সেটা তাঁর অচেনা নয়। তিনি কখনও আত্মসম্মানের প্রশ্নে আপস করেননি, এটাও বলা কঠিন। দ্বিতীয় ইউ পি এ’র স্মৃতি এখনও তাজা। আর, পুরনো কথাও মনে করিয়ে দেওয়া যায়: প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধী যোজনা কমিশনকে ‘ভাঁড়ের দল’ বলার পরেও কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান মনমোহন সিংহ পদত্যাগ করেননি। তাঁর যে পবিত্র শুচিশুভ্র ভাবমূর্তি গড়ে তোলার একটা চেষ্টা হয়েছে, যেন তিনি অতি সরল প্রকৃতির মানুষ, ক্ষমতার রাজনীতির প্যাঁচপয়জার কিছুই বোঝেন না, সেটা একটা কল্পকথামাত্র।

সঞ্জয় বারু বইটা লিখছেন, জানতাম। আমি ভেবেছিলাম, বইটা ১৬ মে’র পরে প্রকাশিত হবে। আমি হলে এ বই এখন লিখতাম না। আইনত লিখতে বাধা আছে কি না, সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্নটা নৈতিকতার। প্রথম ইউ পি এ জমানায় প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা হিসেবে সঞ্জয় অনেক ভেতরের খবর জানার সুযোগ পেয়েছিলেন। ইউ পি এ’র দ্বিতীয় পর্ব সম্পর্কে তিনি যা কিছু লিখেছেন, সেটা সরাসরি ভেতরের খবর নয়। আমরা জানি, প্রথম ইউ পি এ সরকারের শেষের দিকে কয়েক জন ব্যক্তির জন্য সঞ্জয়ের পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। আমরা এটাও জানি, দ্বিতীয় পর্বে তিনি যে কাজ চেয়েছিলেন, তা পাননি। তিনি যে বইই লিখুন, লোকে তাঁকে ‘আঙুরফল টক’ বলে কটাক্ষ করবেই, বিশেষত যেহেতু তিনি তাঁর বইয়ে সোজাসুজি ওই ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের বই লিখতে চাইলে হয়তো বেশ কিছু বছর অপেক্ষা করাই বিধেয়, যাতে সাম্প্রতিক অতীত সুদূর অতীতে পরিণত হতে পারে, হুলের ধার কমে যায়। বস্তুত, এ বইয়ের কাল তো এখনও অতীতই নয়, রীতিমত ঘটমান বর্তমান। একেবারে নির্বাচনের মধ্যে এই বই প্রকাশের উদ্দেশ্য কী হতে পারে? তবে আবারও বলি, এটা আইনের প্রশ্ন নয়। সুতরাং কখন বই লিখবেন বা প্রকাশ করবেন, সেটা লেখকের নিজের ব্যাপার।



বইয়ের মোদ্দা কথাটা কী? ইউ পি এ’র প্রথম পর্বটা দিব্যি চলেছিল। দ্বিতীয় পর্বে এক দল অপদার্থ লোক প্রধানমন্ত্রীর দফতরকে (পি এম ও) ডুবিয়েছে। মন্ত্রীরা তাঁর কথা শোনেননি, দশ নম্বর জনপথ-এর হাই কমান্ড তাঁর কাজে ক্রমাগত হস্তক্ষেপ করেছে। মনমোহন সিংহ উৎসাহ হারিয়েছেন, মেরুদণ্ডও। ঠিকই, পি এম ও’তে ভাল লোক দরকার। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর প্রধান সচিব (প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি) দু’জনেই দুর্বল হলে খুবই মুশকিল। কিন্তু পি এম ও বা প্রধান সচিবকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া বোধহয় ঠিক নয়। মনমোহন সিংহের ব্যক্তিত্ব বা আচরণ সম্পর্কে শুরুতেই কিছু কথা বলেছি। একে প্রধানমন্ত্রীর আসনে এমন এক জন মানুষ, তার ওপর দশ নম্বর জনপথ— সমস্যা অবশ্যম্ভাবী ছিল। ওঁদের বরাতজোরে আর এন ডি এ’র সুকৃতির কল্যাণে বেশ কিছু দিন অর্থনীতি ভাল চলেছিল বলে গোড়ার দিকটায় সব ঠিকঠাক মনে হয়েছে। কিন্তু বরাতের জোর চিরকাল থাকে না।

দ্বিতীয় ইউ পি এ’র সময় প্রশাসন যে পঙ্গু হয়ে পড়ল, তার জন্য কে দায়ী— দশ নম্বর জনপথ, ক্যাবিনেট পর্যায়ের মন্ত্রীরা, না কি জাতীয় উপদেষ্টা পর্ষদ? আমলাদের নিয়োগের ব্যাপারে ক্যাবিনেটের অ্যাপয়েন্টমেন্টস কমিটির ভূমিকা ছেঁটে দেওয়ার জন্য ক্যাবিনেট সচিবকে কে নির্দেশ দিয়েছিলেন? প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগের অধিকার ইউ পি এস সি’র হাত থেকে একটি অ্যাড হক কমিটির হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তই বা কে নিয়েছিলেন? সমস্ত অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পদে কেবল ইন্ডিয়ান ইকনমিক সার্ভিসের আধিকারিকদের বসানোর নীতি চালু হল কার হুকুমে? এ-রকম আরও নানা দৃষ্টান্ত দিতে পারি, এবং প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে দায়টা মনমোহন সিংহের ওপরেই বর্তায়। তিনি হয়তো সত্যিই পরিস্থিতির শিকার, কিন্তু নির্দোষ, নিরুপায় শিকার? মানতে পারলাম না।

বইটিতে বিস্তর মুখরোচক খবর আছে। দিল্লি দরবারের সঙ্গে যাঁদের যোগাযোগ আছে, তাঁদের নিজস্ব জগতে এ-সব কথার অনেক কিছুই জানা ছিল। এখন তাঁদের এক জন খবরগুলো রাষ্ট্র করে দিয়েছেন, এই যা।

দিল্লিতে সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ-এ অর্থনীতিবিদ

আরও পড়ুন

Advertisement